সোহরাব চাচা ছুটতে ছুটতে আসছেন। ভদ্রলোক সাধারণ ভাবে হাঁটতে পারেন না। যেখানে যাবেন দৌড়ে যাবেন। তাঁর দৌড়ে আসার ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে ভয়ংকর কিছু ঘটেছে। আমি নিশ্চিত আসলে কিছু ঘটে নি।
মিস রুমাল।
জি চাচা।
আজ তোমার শট হবে না। স্যার তোমাকে মেকাপ তুলে ফেলতে বলেছেন।
জ্বি আচ্ছা।
পাপিয়া ম্যাডাম কঠিন গলায় বললেন, প্ল্যানিং গুলি ঠিকঠাক মত করলে হয়? দুঘন্টা নষ্ট করে মেকাপ নেবার পর বলা হল শট হবে না!
সোহরাব চাচা অমায়িক ভঙ্গিতে হাসলেন। ভাবটা এ রকম যেন মজার একটা গল্প হচ্ছে। আনন্দময় পরিবেশে আনন্দময় গল্প। গল্প শুনে তৃপ্তির হাসি হাসছেন।
ম্যাডাম তরমুজের সরবত খাবেন?
না।
একটু খেয়ে দেখুন, আমার ধারণা খুব ভাল হয়েছে। এক চুমুক খেয়ে দেখুন ভাল না লাগলে ফেলে দেবেন। আমি নিয়ে আসছি।
সোহরাব চাচা আবার ছুটতে ছুটতে চলে যাচ্ছেন। পাপিয়া ম্যাডাম এখন বটগাছটার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার ভুরু কুঁচকানো। কে জানে তিনি কী ভাবছেন। আজ বিকেলে তাঁর ঢাকা চলে যাবার কথা। সেই পরিকল্পনা কি এখনো আছে? তার গাড়ির চাকার লিক কি সারানো হয়েছে?
বকুল!
জ্বি আপা।
তোমার মাকে দেখছি না কেন? তুমি আছ অথচ তোমার মা নেই এটাতো ভাবা যায় না।
মার শরীর ভাল না। শুয়ে আছেন।
শরীর ভাল না কেন? কী হয়েছে?
কাল রাতে এক ফোঁটা ঘুমান নি–সকালে শরীর খারাপ করেছে। তাঁর হাঁপানির মত আছে। অনিয়ম করলেই হাঁপানী বাড়ে।
তুমি যাও মেকাপ তুলে মার কাছে গিয়ে বস। ও শোন, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, মেকাপম্যান সুবীর বোধহয় তোমাকে খুব পছন্দ করে তাই না?
জ্বি আমাকে মা ডাকেন।
সে যে তোমাকে খুব পছন্দ করে এটা তোমাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে। সে তোমাকে যত্ন করে মেকাপ দিয়েছে। তোমাকে সুন্দর লাগছে।
থ্যাংক য়্যু।
সব মানুষের চেহারায় লুকানো সৌন্দর্য থাকে। মেকাপ ম্যানের প্রধান দায়িত্ব সেই সৌন্দর্য বের করে আনা। সবাই তা পারে না। সুবীর পারে। তোমাকে সত্যি সত্যি অপূর্ব লাগছে।
আমার লজ্জা লাগছে। কী বলব বুঝতে পারছি না। পাপিয়া ম্যাডাম বললেন, ও আচ্ছা তোমাকে দেখানোর জন্যে আমি আমার মেয়ের ছবি এনেছি। এই দেখ ছবি। তার ফিফথ বার্থডের ছবি।
আমি আগ্রহ নিয়ে ছবিটা নিলাম। এবং ছবিটার দিকে মন খারাপ করে তাকিয়ে রইলাম। কী বিশ্রী চেহারা মেয়েটির। উঁচু কপাল, পুতিপুতি চোখ, গায়ের রঙ মিশমিশে কাল। সব বাচ্চাদের চোখে মুখে বুদ্ধির ঝঙ্ক থাকে–এই মেয়েটার চেহারার ভেতরও হাবা হাবা ভাব। মাথাভর্তি নিগ্রোদের মত কোকড়ানো চুল। মোটা মোটা ঠোঁট।
পাপিয়া ম্যাডাম ক্ষীণ গলায় বললেন, আমার মা দেখতে ভাল হয় নি কিন্তু ওর খুব বুদ্ধি। তোমাকে একদিন তার বুদ্ধির গল্প বলব।
এখনি বলুন।
না এখন না। অন্য একদিন। এখন আমি তোমাকে একটা ইন্টারেস্টিং অবজারভেশনের কথা বলি। মঈন যখন দৃশ্য বুঝাচ্ছিল তুমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলে। একবারও তুমি সেলিমের দিকে তাকাও নি। তুমি মঈনের দিকে তাকিয়ে ছিলে। আমি দেখলাম তোমার ঠোঁট এবং হাতের আঙ্গুল কাঁপছে। ব্যাপারটা কী?
আমি চুপ করে আছি। পাপিয়া ম্যাডাম বললেন, ঠিক করে বলতো তুমি কি এই মানুষটির প্রেমে পড়েছ?
আমি হকচকিয়ে বললাম, জ্বি না। জ্বি না।
মাটির দিকে তাকিয়ে জ্বি না জ্বি না করছ কেন? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে অসুবিধা কোথায়? তাকাও আমার দিকে।
আমি তাকালাম, এবং দীর্ঘ কিছু সময় দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনিও কিছু বললেন না, আমিও না।
সোহরাব চাচা জগ এবং গ্লাস নিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছেন। এই সব কাজ প্রোডাকশন বয়দের করার কথা। সোহরাব চাচার তা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই। জগে গাঢ় লাল রঙের সরবত দেখতে এত সুন্দর লাগছে।
সোহরাব চাচা একটা মাত্র গ্লাস এনেছেন। তরমুজের সরবত আমার জন্যে আসে নি শুধু ম্যাডামের জন্যে। মা থাকলে তার ভুরু কুঁচকে যেত। উনি ম্যাডামের সামনে কিছু বলতেন না, কিন্তু সোহরাব চাচাকে ঠিকই ধরতেন— আমার মেয়ে বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে আকাশ থেকে পড়ে নি। সে ফেলনা না। সে এই ছবির দুই নম্বর নায়িকা। তার জন্যেও তরমুজের সরবত লাগবে।
পাপিয়া ম্যাডাম সরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন–বাহ ভাল হয়েছেতো। লেবু লেবু গন্ধ আসছে কেন?
সামান্য লেবু দেয়া হয়েছে।
ভাল। বেশ ভাল। আমি আরেক গ্লাস খাব।
জ্বি ম্যাডাম–এই জগটা আপনার জন্যে।
থ্যাংক য়্যু।
সোহরাব চাচা নিচু গলায় বললেন, একটা প্রবলেম হয়েছে?
পাপিয়া ম্যাডাম বললেন, কী প্রবলেম? ফরহাদ সাহেব এসে পৌঁছেছেন?
সোহরাব চাচা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন। আমি পাপিয়া ম্যাডামের অনুমান শক্তি দেখে মুগ্ধ হলাম। সোহরাব চাচা যেই বললেন, একটা প্রবলেম হয়েছে উনি সঙ্গে সঙ্গে প্রবলেম ধরে ফেললেন। আমি কখনো পারতাম না।
শুটিং কি হচ্ছে না বন্ধ?
ক্যামেরা এখনো ওপেন হয় নি।
ডিরেক্টর সাহেব কী জানেন যে ফরহাদ সাহেব এসেছেন?
জ্বি জানেন। আমি আসামাত্র খবর দিয়েছি।
ডিরেক্টর সাহেব এখন কি করবেন? সেলিমকে নিয়ে কাজ করবেন, না ফরহাদ সাহেবকে নিয়ে?
আমি জানি না ম্যাডাম আমি হলাম আদার ব্যাপারি। এসব বড় বড় ব্যাপার।
পাপিয়া ম্যাডামের গ্লাস শেষ হয়ে গেছে। তিনি খালি গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দেখি আরেকটু দিন।
সোহরাব চাচা গ্লাস ভর্তি করে দিলেন।
