সেলিম দৃশ্যটা তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি— তুমি মন দিয়ে শোন। তুমি কে তা-কি তুমি জান?
সেলিম ভাই প্রায় বিড় বিড় করে বললেন, আমি একজন ফটোগ্রাফার। দেশের বাইরেই জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে। এখন কিছুদিনের জন্যে দেশে এসেছি। আবার চলে যাব।
দ্যাটস রাইট। তুমি দিলু-নিশাতের ফ্যামিলির সঙ্গে সুসং দুর্গাপুরে বেড়াতে এসেছ। এই পরিবারটির সঙ্গে তোমার তেমন কোন পরিচয় নেই। তারাই তোমাকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছে। কেন বলতো? না লজ্জার কিছু নেই বল।
তারা চাচ্ছে এই পরিবারের বড় মেয়েটিকে আমি যেন পছন্দ করি।
ভেরী গুড। বড় মেয়েটি কে? আমাদের পাপিয়া ম্যাডাম।
দ্যাটস রাইট। পছন্দ করলে তারা মেয়েটিকে বিয়ে দিতে পারেন। নিশাতের স্বামী রোড একসিডেন্টে মারা গেছে। তাদের ছোট্ট একটা বাচ্চা আছে। নিশাত যদি অতীত ভুলে গিয়ে আবার বিয়ে করে তাহলে তার জীবন আবার নতুন করে শুরু হতে পারে। সেই শুরুটা আমেরিকার মত বিশাল দেশে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। বুঝতে পারছ?
জ্বি স্যার?
তুমি একজন ফটোগ্রাফার। সামান্য কোন ফটোগ্রাফার না। তুমি আমেরিকার মত দেশে নামকরা ফটোগ্রাফার। তোমার তোলা ছবি দিয়ে দুটা ফটোগ্রাফীর বই প্রকাশিত হয়েছে, একজন লেখক এবং একজন ফটোগ্রাফারের মধ্যে পার্থক্য কী জান?
জ্বি না।
একজন লেখক সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন এবং সেই সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করেন। একজন ফটোগ্রাফারও সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন কিন্তু ব্যাখ্যা করেন না। ক্যামেরায় বন্দি করে ফেলার চেষ্টা করেন। বেশির ভাগ সময়ই তারা তা পারেন না। কারণ সৌন্দর্য কখনো বন্দি করা যায় না। ফটোগ্রাফাররা এই তথ্য জানেন না বলে ক্রমাগত ছবি তুলে তুলে এক সময় হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। একজন লেখক বা একজন কবি কখনো হতাশাগ্রস্থ হন না, কারণ তাঁরা কখনো সৌন্দর্য বন্দি করতে চান না। তাদের আগ্রহ ব্যাখ্যায়। আমার বক্তৃতা কেমন লাগছে সেলিম?
সেলিম ভাই কিছু বলার আগেই পাপিয়া ম্যাডাম বললেন, তোমার বক্তৃতা খুব ভাল হচ্ছে। I am impressed.
ডিরেক্টর সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, শোন পাপিয়া, ইচ্ছা করলেই আমি যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নন্দন তত্ত্বের শিক্ষক হতে পারতাম। পৃথিবীর সেরা পাঁচজন ডিরেক্টরের একজন হতে পারতাম, ঔপন্যাসিক হতে পরতাম। কবি হতে পারতাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হয়েছি— হাতির লাদ। হাতির বিশাল বড় বিষ্ঠা। সাইজে যত বড়ই হোক— শিট ইজ শিট! আচ্ছা ঠিক আছে–সেলিম এসো, মূল দৃশ্যটি তোমাকে বুঝিয়ে দি। কাছে আস।
সেলিম ভাই কাছে এগিয়ে গেলেন। ডিরেক্টর সাহেব তাঁর বাঁ হাতটা তুলে দিলেন সেলিম ভাইয়ের কাঁধে হাত কাঁধে তুলে দিয়ে তিনি আসলে নিঃশব্দে বলার চেষ্টা করছেন— ভয় পেও না, আমি আছি তোমার সঙ্গে। আমি তোমাকে যেভাবে খেলাব— তুমি সেই ভাবে খেলবে। আর কিছু লাগবে না। সেলিম ভাই কি না বলা কথাগুলি বুঝতে পারছেন?
সেলিম!
জ্বি স্যার।
তুমি ক্যামেরা হাতে ঘুরতে বের হয়েছ। হঠাৎ তোমার চোখে পড়ল বটগাছটা। বিশাল গাছ ঝুড়ি নামিয়ে দিয়েছে। দেখে তোমার ভাল লাগল। একবার ভাবলে দৃশ্যটার ছবি তুলবে, তারপর ঠিক করলে–না। ছবি তোলার দরকার নেই। আবার মত পরিবর্তন করলে–ছবি তোলার জন্যে এগুলে। কোন এংগেলে ছবিটা তুলবে, একটু ভাবলে। সূর্যের দিকে তাকিয়ে সূর্যের পজিশন চট করে দেখে নিলে। তারপর ছবিটা তুললে। ছবি তোলার আগমুহূর্ত পর্যন্ত দৃশ্যটির প্রতি তোমার ছিল সীমাহীন মমতা। যেই ছবিটা তোলা হয়ে গেল, ওমি তোমার সমস্ত আগ্রহের অবসান হল। তুমি চলে যাচ্ছ। যে অপূর্ব দৃশ্যটির ছবি তুমি তুললে তার প্রতি এখন তোমার আর কোন মমতা নেই। বুঝতে পারছ?
জ্বি।
তোমাকে আরো সহজ ব্যাখ্যা করি–মনে কর যে দৃশ্যটি তুমি দেখছিলে সেটা আসলে কোন দৃশ্য না। রক্ত মাংসের একজন মানুষ। ধরা যাক অপূর্ব রূপবতী কোন তরুণী। মেয়েটি তোমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। তোমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সে আছে আপন মনে। তুমি প্রচন্ড অস্থিরতায় ভুগছ। তুমি ভেবে পাচ্ছ না, কেন সে তোমার দিকে তাকাচ্ছে না। দুঃখে কষ্টে তোমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। এমন সময় ম্যাজিক্যাল একটা ব্যাপার ঘটল। মেয়েটি গভীর আবেগ এবং গভীর ভালবাসায় তোমার দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে তোমার সব আগ্রহ শেষ হয়ে গেল। তুমি হেঁটে চলে এলে। মেয়েটির দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকানোর ইচ্ছা পর্যন্ত হল না।
সেলিম ভাই কিছু বলছেন না, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি তাকালাম পাপিয়া ম্যাডামের দিকে। তিনি চাপা গলায় বললেন, রুমালী, তুমি আমাদের ডিরেক্টর সাহেবের সব কথা বিশ্বাস করবে না। ভালবাসার দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যাবার ক্ষমতা কোন পুরুষকে দেয়া হয় নি। সে তখনি যেতে পারে যখন তাকে যেতে দেয়া হয়। মেয়েরা তাদের চলে যেতে দেয় বলেই তারা যেতে পারে অথচ পুরুষরা ভাবে নিজের ইচ্ছায় চলে এসেছি। এতে তারা এক ধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ করে। আমরা তাদের সেই আত্মপ্রসাদ লাভ করতে দেই।
ডিরেক্টর সাহেব সেলিম ভাইকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। তার একটা হাত এখনো সেলিম ভাইয়ের কাঁধে। তিনি কী বলছেন— আমি শুনতে পাচ্ছি, আমার কান খুব তীক্ষ।
সেলিম শোন–তুমি কোথায় দাঁড়াবে, কোন জায়গা থেকে কোন জায়গায় যাবে সব মার্ক করা আছে। কখন তুমি সূর্যের দিকে তাকিয়ে সূর্যের পজিশন দেখবে–সব বলে দেয়া হবে। একটা ফুল রিহার্সেল হবে। তারপর হবে ক্যামেরা রিহার্সেল। আমরা ট্ৰলী এবং জুম লেন্স ব্যবহার করছি। শট কাটব না। নার্ভাস বোধ করছ নাতো? নার্ভাস বোধ করার কিছু নেই।
