আমি অবাক হয়ে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম— পাপিয়া ম্যাডামকে আমি রাগাতে চাচ্ছিলাম— এখন দেখি উল্টোটা হচ্ছে, তার রাগ পড়ে যাচ্ছে। মাকে দিয়ে সবাইকে বিচার করলে হবে না, একেকজন মানুষ একেক রকম।
বকুল!
জ্বি।
সরি তোমার অনেক সময় নষ্ট করলাম। তুমি মেকাপ শেষ কর। আমি যাচ্ছি।
আপনার মেয়েকে লেখা চিঠি কি পোস্ট করা হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে।
ওর নাম কী?
ওর ডাক নাম খুব ইন্টারেস্টিং এক অক্ষরের নাম–নি। আমি ইচ্ছা করে রেখেছি যেন আর কেউ এই নাম রাখতে না পারে। আমি চাচ্ছি যেন পৃথিবীর কেউ আমার মেয়ের নামে তার নাম না রাখে।
নি নাম আর কেউ রাখবে বলে মনে হয় না।
পাপিয়া ম্যাডাম শান্ত গলায় বললেন, এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যেমন আলাদা, তাদের নামও সে রকম আলাদা হওয়া উচিত।
এত নাম পাওয়াওতো মুশকিল।
কোন মুশকিল না, ইচ্ছা থাকলেই হয়। কম্পিউটারে সব নাম ঢুকানো থাকবে। কেউ তার ছেলেমেয়ের নাম রাখার আগে কম্পিউটার সার্চের ব্যবস্থা করবে।
আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, পাপিয়া ম্যাডামের চোখে মুখে রাগ, বিরক্তি কিছুই নেই। শান্ত মা মা একটা ভাব। মেয়ের প্রসঙ্গ আসতেই তাঁর মুখ বদলে গেছে। একজন মায়ের কাছে তার মেয়ে কি এত প্রিয়?
বকুল, আমি যাচ্ছি। ডিরেক্টর সাহেবের নতুন অভিনেতার শর্ট নেবার সময় আমি উপস্থিত থাকব। দেখব নতুন অভিনেতার কাণ্ড কারখানা।
ম্যাডাম চলে গেলেন। সুবীরদা আবার মেকাপ শুরু করেছেন। আর কতক্ষণ লাগবে কে জানে। আমি চাচ্ছিদ্রুত শেষ হোক। সেলিম ভাইয়ের প্রথম শটের সময় আমি উপস্থিত থাকতে চাই।
সেলিম ভাইয়ের শট নেয়া হচ্ছে। তার জীবনের প্রথম শট। কে জানে হয়তোবা শেষ শটও। তিনি যেমন নার্ভাস, ডিরেক্টর সাহেবও নার্ভাস। আমি পাপিয়া ম্যাডামের সঙ্গে ঝাকড়া পাতাওয়ালা একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছি। গাছটা হল কাঠবাদামের গাছ। আমি একজনকে নাম জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি। এই কাঠবাদাম কিন্তু খাওয়া যায় না।
পাপিয়া ম্যাডাম মাথায় স্কার্ফ বেঁধে নিয়েছেন যেন মাথায় পাখি গু করতে না পারে। ডিরেক্টর সাহেবও গাছের নীচেই আছেন। এতক্ষণ ছিলেন না, এই মাত্র এসেছেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, কী খবর? কাকে বললেন, আমাকে না পাপিয়া ম্যাডামকে বোঝা যাচ্ছে না। মনে হয় কাউকেই না। জিজ্ঞেস করার জন্যে জিজ্ঞেস করা। প্রচন্ড টেনশনে তাঁর ভুবন ছোট হয়ে গেছে। তিনি হাত ইশারা করে সেলিম ভাইকে ডাকলেন।
সেলিম ভাইকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে হবে। কাঠবাদামের বাদাম খাওয়া যায় না কেন? এই বাদাম গাছটার পাতা এমন ঘন যে সূর্যের আলোর ছিটেফোঁটাও নীচে আসছে না। পিন পিন শব্দে মশা উড়ছে। খুব ছোট মশ—চোখে দেখা যায় না এমন। ছোট হলেও এরা কামড়াতে ওস্তাদ। কামড় দেবার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা ফুলে যায়। আমি একটু শংকিত বোধ করছি। মশার কামড়ের ভয়ে শংকিত না। মশা যদি মুখে কামড়ায়— মুখ ফুলে উঠবে। ক্যামেরায় তা ধরা পড়বে। ডিসকনটিনিউটি হয়ে যাবে। দেখা যাবে একই দৃশ্যে একবার থুতনির কাছটা মশার কামড়ে ফুলে আছে—আরেকবার ফুলে নেই।
সেলিম ভাইকে দেখে মায়া লাগছে। মনে হচ্ছে উনি পুরোপুরি দিশা হারিয়ে ফেলছেন। নৌকায় করে শান্ত হ্রদ পার হচ্ছিলেন। হঠাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে হ্রদে ফেলে দিয়ে নৌকা উধাও হয়ে গেছে। ভদ্রলোক সাঁতার জানেন না, তারপরেও প্রাণপনে চেষ্টা করছেন ভেসে থাকতে। ভেসে থাকার চেষ্টা করছেন ঠিকই কিন্তু মনে মনে ভাবছেন— ভেসে থাকার দরকার কী ডুবে গেলেই হয়। সেলিম ভাইয়ের গেটাপ খুব ভাল হয়েছে। জিনসের প্যান্ট। প্যান্টের উপর স্ট্রাইপ দেয়া হাফ হাওয়াই সার্ট। সার্টে বেমানান সাইজের দুটা প্রকান্ড পকেট। পকেট ভর্তি জিনিস পত্র। কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ। পায়ে কাপড়ের জুতা। কোমড়ে চামড়ার বেল্টে একটা হালকা নীল রঙের ফেস টাওয়েল গুঁজে দেয়া হয়েছে। তার চুলগুলিকে কিছু একটা করা হয়েছে—ফুলে ফেঁপে আছে। প্রাম করা হয়েছে কি? সুবীরদাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। চুলের এই কায়দাটা দরকার ছিল। সুবীরদা আরেকটা খুব ভাল কাজ করেছেন— সেলিম ভাইয়ের গালে নীলচে আভা নিয়ে এসেছেন। যাদের মুখ ভর্তি ঘন দাড়ি তারা শেভ করলে মুখে নীলচে আভা দেখা যায়। পুরুষের ফরসা মুখ থেকে নীলচে জ্যোতি বের হয়ে আসছে–এই দৃশ্যটা আমার খুব ভাল লাগে।
ডিরেক্টর সাহেব সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। দৃশ্য বুঝিয়ে দেবেন। বুঝিয়ে দেবার এই কাজটি ভদ্রলোক ভাল করেন। শুধু ভাল না, খুব ভাল। মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। ডিরেক্টর সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন— কেমন আছ সেলিম?
জ্বি স্যার ভাল।
জ্বি স্যার ভাল — এমন মিন মিন করে বলছ কেন? শক্ত করে বল। এমন ভাবে বল যেন ইউনিটের সবাই শুনতে পায়।
সেলিম ভাই আবারো বললেন–জ্বি স্যার ভাল।
এবার আগের চেয়েও নিচু গলায়।
হয় নি। আরো ফোর্সফুলি বলতে হবে। তুমি এক কাজ কর নাও মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে বল—জ্বি স্যার ভাল।
তিনি সেলিম ভাইয়ের হাতে ডিরেক্টরের হ্যান্ড মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলেন।
সেলিম বটগাছটার দিকে তাকাও। বটগাছে কয়েকটা হরিয়াল পাখি বসে আছে দেখতে পাচ্ছ? তুমি হ্যান্ড মাইক্রোফোনটা পাখিদের দিকে তাক করে বলবে জ্বি স্যার ভাল। তোমার কথা শুনে যদি একটা পাখিও আকাশে ওড়ে তাহলে তুমি পাশ।
সেলিম ভাই বটগাছের দিকে হ্যান্ড মাইক্রোফোন তাক করলেন। উপস্থিত সবার মধ্যে চাপা কৌতূহল এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। সবাই আগ্রহ নিয়ে বটগাছের দিকে তাকিয়ে আছে। পাখি উড়বে কি উড়বে না? সেলিম ভাই তার বাক্য শেষ করতেই এক সঙ্গে চারটা পাখি গাছ ছেড়ে আকাশে উড়ে গেল। আমরা সবাই হাততালি দিতে শুরু করলাম। শুধু পাপিয়া ম্যাডাম হাততালি দিচ্ছেন না। তার হাতে কফির মগ। তিনি কফিতে চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বকুল একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছ। আমাদের ডিরেক্টর সাহেব মানুষ হিসেবে অসম্ভব শার্প। তিনি কী সহজ উপায়ে এই ছেলেটার ইনহিবিশন কাটিয়ে দিয়েছেন দেখলে। এখন সে পুরোপুরি ফ্রী। অভিনয় ভাল করবে। আমি কিছু বললাম না। আমি কান পেতে আছি ডিরেক্টর সাহেব দৃশ্যটা কীভাবে বুঝান তা শোনার জন্যে।
