আমার সুন্দর শান্তির সংসার হোক এটা তুমি চাও না মা?
চাব না কেন? অবশ্যই চাই। আমার সংসার হলো না বলে তোরও হবে, এটা কেমন কথা! তোর বাবুগুলিকে কে মানুষ করবে? আমিই করব। তুই তোর মত অভিনয় করে যাবি আমি দেখব তোর সংসার…।
আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ও আচ্ছা।
সুবীরদা মেকাপের প্রাথমিক কাজ শেষ করে ফেলেছেন। এখন যে কাজটা তিনি করবেন সেটা আমার খুব পছন্দের। একটা ভেজা টাওয়েল আমার মুখের উপর দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলবেন। ফাউন্ডেশন বসার ব্যবস্থা। আমাকে ভেজা টাওয়েলের আড়ালে রেখে সুবীরদ এক কাপ চা খাবেন। সিগারেট খাবেন। দশ মিনিট এই ভাবে যাবে তারপর শুরু হবে ফিনিশিং কাজ। সুবীরদার মেকাপের হাত অসাধারণ। তিনি যখন কাজ শেষ করে আমার হাতে আয়না ধরিয়ে দিয়ে বলবেন মা দেখতো। তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠব। কারণ, আয়নাতে যে বসে আছে তাকে আমি চিনি না। সে অন্য কোন মেয়ে। পৃথিবীর সব রূপ নিয়ে সে রাঙ্গা রাজকন্যাদের মত বসে আছে।
বকুল।
জ্বি সুবীরদা।
আমি তোমাকে মা ডাকি আর তুমি আমাকে সুবীরদা ডাক এটা কেমন কথা মা?
আর ডাকব না। এখন থেকে আপনাকে চাচা ডাকব।
মা তোমার যা ইচ্ছা ডাকবে। আমার তোমাকে মা ডাকতে ইচ্ছে করে আমি মাই ডাকব।
আমি আকাশের দিকে মুখ করে বসে আছি। আমার মুখের উপর ভেজা টাওয়েল। মুখটা ঠান্ডা হয়ে আছে। সুবীরদা শব্দ করে চা খাচ্ছেন। শব্দ শুনে মনে হচ্ছে চা-টা খুব মজা হয়েছে। আমার নিজেরো চা খেতে ইচ্ছে করছে। যদিও আমার এত চায়ের তৃষ্ণা নেই। কাউকে মজা করে কিছু খেতে দেখলে আমারো খেতে ইচ্ছে করে। কাউকে পান খেতে দেখলে আমার পান খেতে ইচ্ছে করে।
চোখ বন্ধ করেই টের পেলাম পাপিয়া ম্যাডাম এসেছেন। সুবীরদা চা খাওয়া বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আমি মিষ্টি সুবাস পাচ্ছি। পাপিয়া ম্যাডামের গা থেকে এই সুগন্ধ আসছে। তিনি নিশ্চয়ই খুব দামী কোন পারফিউম ব্যবহার করেন।
বকুল!
জ্বি।
তুমি কি ঘটনা শুনেছ?
আমি শংকিত গলায় বললাম, কোন ঘটনার কথা বলছেন?
আমাদের ডিরেক্টর সাহেব রাস্তার একটা ছেলেকে এত বড় রোলে দাঁড়া করিয়ে দিচ্ছেন।
উনি যা করছেন–নিশ্চয়ই ভেবে চিন্তে করছেন।
না। ও সব কিছু ভেবে চিন্তে করে না। ঝোঁকের মাথায় হুট-হাট করে করে। ও এখন যা করছে রাগের মাথায় করছে। ফরহাদ আসেনি রাগে ডিরেক্টর সাহেবের ব্রহ্মতালু জ্বলে যাচ্ছে। কাজেই হাতের পাশে রাম-শ্যাম-যদু-মধু-কদু যা পেয়েছে পঁাড়া করিয়ে দিয়েছে। সবাই অভিনয় জানলেতো কাজই হত!
উনি নিশ্চয়ই অভিনয় আদায় করে নেবেন।
কাচকলা আদায় করে নেবে।
সুবীরদা আমার মুখের উপর থেকে ভেজা তোয়ালে সরিয়ে দিলেন। পাপিয়া ম্যাডাম সুবীরদার দিকে তাকিয়ে বললেন—সুবীরদা আপনি একটু যানতো আমি বকুলের সঙ্গে দুটা কথা বলব। সুবীরদা সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলেন। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনি বসুন।
পাপিয়া ম্যাডাম বিরক্ত গলায় বললেন, আমি বসব না। যা বলার বলে যাচ্ছি। তুমি মন দিয়ে শোন।
আমি ভীত গলায় বললাম, বলুন। পাপিয়া ম্যাডামের ভাব ভঙ্গি দেখে আমার কেন জানি ভয় ভয় লাগছে। রাগে উনার শরীর কাঁপছে। উনাকে এত রাগতে আমি কখনো দেখি নি।
শোন বকুল–রাস্তার একজন মানুষের সঙ্গে আমি অভিনয় করব না। আমার বাছ বিচার আছে। ও ক্যামেরা ওপেন করছে করুক। আমি কিছু বলছি না। আজ বিকেলে নাকি ঐ গাধাটার সঙ্গে আমার কাজ হবে। সেই কাজ আমি করব না। আমি বিকেলে চলে যাব। আমার গাড়ির চাকা লিক হয়েছে। ড্রাইভারকে চাকা সারিয়ে আনতে বলেছি।
ডিরেক্টর সাহেবকে বলেছেন?
না বলি নি। বলার দরকার দেখছি না।
আগে থেকে উনাকে বলে রাখলে উনি হয়ত শুটিং বন্ধ রেখে বিকল্প ব্যবস্থা করবেন। নয়ত শুধু শুধু ফিল্ম নষ্ট হবে।
হোক ফিল্ম নষ্ট।
আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমিও উনাকে বলতে পারি। তোমাকে বলতে হবে কেন? কথা বলার জন্যে আমার পীর ধরার দরকার নেই।
পাপিয়া ম্যাডাম হনহন করে চলে গেলেন। এবং সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এলেন। তাঁর রাগ কমে নি। তিনি আমার কাছে এসেছিলেন রাগ কমানোর জন্যে রাগ না কমিয়েই চলে যাচ্ছিলেন— আবার এসেছেন। আমি কি তার রাগ কমানোর চেষ্টা করব না আরো রাগ বাড়িয়ে দেব? দুটা কাজই আমি পারি। ভালভাবেই পারি। মার সঙ্গে থেকে শিখেছি— কী করে কত দ্রুত কাউকে রাগানো যায়। কিংবা রাগ কমানো যায়। আমি ঠিক করলাম পাপিয়া ম্যাডামের রাগ বাড়িয়ে দেব।
বকুল!
জ্বি।
ইডিওটিক কাজ আমার পছন্দ না। একটা কাজ হবে তার পেছনে কোন প্ল্যানিং থাকবে না, হোয়াট ইজ দিস?
আমি কি উনার পক্ষ হয়ে একটা কথা বলব?
পাপিয়া ম্যাডাম তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি বুঝতে পারছি তার চোখে দপ করে আগুন জ্বলে উঠেছে। মনে মনে খানিকটা ভয়ও পাচ্ছি। আমি যার পক্ষ হয়ে কথা বলব তার উপরের রাগের ভাগটা আমাকেই নিতে হবে।
মঈনের পক্ষ হয়ে তুমি কথা বলবে?
জ্বি।
কী কথা?
নতুনদের যদি ছবিতে না নেয়া হয় তাহলে তারা সুযোগ পাবে কীভাবে? এখন যারা অভিনয় করছেন তারা সবাইতো এক সময় নতুন ছিলেন।
নতুনদের নেয়ার ব্যাপারে আমার কোন আপত্তি নেই। তাই বলে তুমি একটা প্রোডাকশান বয়কে ছবির নায়ক বানিয়ে দেবে? হাউ কাম! সেলিম বলে যে ছেলেটাকে নেয়া হয়েছে— তুমি কি জান সে একজন প্রোডাকশান বয়।
ও।
সে সেদিন পর্যন্ত ফুট ফরমাশ খেটেছে— আমাকে চা এনে দিয়েছে তার সঙ্গে হঠাৎ করে প্রেমের ডায়ালগ আমি বলব কী করে? আমরা কেউ রোবট না যে ডিরেক্টর সাহেব যা বলবেন তাই করে যাব। অভিনয় পেশা হিসেবে নিয়েছি বলেই অভিনয়ের স্বার্থে আমার বাসার কাজের ছেলেটিকে আমি জড়িয়ে ধরে চুমু খাব না-কি?
