বুঝতে পারছেন?
হ্যাঁ। আমার ধারণা ডিরেক্টর সাহেব আপনাকে ডেকে বলেছেন–সেলিম তুমি মন দিয়ে আমার কথা শোন, ফরহাদ সাহেবের যে চরিত্রটি করার কথা ছিল— সেই চরিত্রটা তুমি করবে। কাল তোমার শুটিং।
সেলিম ভাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখ বড় করা দেখেই বুঝতে পারছি আমার অনুমান সত্যি। তবে এই অনুমান করার জন্যে শার্লক হোমস বা মিসির আলি হবার দরকার নেই। সাধারণ বুদ্ধি যার আছে সেই এই অনুমান করবে। আগামীকাল শুটিং শুরু হচ্ছে অথচ ফরহাদ সাহেব আসেন নি। সেলিম নামের এই মানুষটিকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। ডিরেক্টর সাহেবের মাথায় কোন একটা উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল। উদ্দেশ্য ছাড়া তিনি কিছু করেন না। সাব্বিরের চরিত্রে সেলিম ভাইকে খুব মানাবে। ডিরেক্টর সাহেব স্ট্যান্ডবাই হিসেবেই সেলিম ভাইকে নিয়ে এসেছেন।
আমি বললাম, আমার কথা কি ঠিক হয়েছে সেলিম ভাই?
হুঁ।
খুব ভয় লাগছে?
হুঁ।
ভয় লাগছে কেন?
আমি আমার জীবনে কখনো অভিনয় করি নি। স্কুলে কলেজে কোথাও না।
আপনি কখনো অভিনয় করেন নি?
জ্বি না।
কথাটাতো সেলিম ভাই ঠিক বলেন নি। মানুষ হয়ে জন্ম নিলেই অভিনয় করতে হয়। সংসারে অভিনয়। কখনো খুশি হবার অভিনয় করতে হয়, কখনো দুঃখিত হবার অভিনয় করতে হয়। প্রেমে না পড়েও প্রেমে পড়ার অভিনয় করতে হয়। আবার প্রেম লুকিয়ে রাখার অভিনয় করতে হয়। আসলে প্রতিটি মানুষই জন্মসূত্রে পাকা অভিনেতা।
আপনি খুব গুছিয়ে কথা বলেন।
শুনুন সেলিম ভাই আপনার মুখ থেকে আপনি আপনি শুনতে আমার ভাল লাগছে না। আপনি দয়া করে আমাকে তুমি তুমি করে বলবেন। পারবেন না?
সেলিম ভাই চুপ করে আছেন। আমি মাথা ঘুরিয়ে মার দিকে তাকালাম। মা কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন। কিছু খাচ্ছেন না। আমার মনে হয় তিনি পুরোপুরি ড্রাগন হয়ে গেছেন। মার জন্যে আমার এখন মায়া লাগছে। আমি তার রাতের খাবার নষ্ট করলাম। ইউনিটের খাওয়া মার খুব পছন্দের জিনিস। ইউনিটের ফ্রি খাওয়া যত তুচ্ছই হোক মা সোনামুখ করে খান।
রাত কত হয়েছে কে জানে
রাত কত হয়েছে কে জানে?
শোবার সময় হাতে ঘড়ি পরে শুই নি বলে বলতে পারছি না। অবশ্যি ঘড়ি থাকলেও ঘড়ি দেখা যেত না। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে আছি। ঘুমের ভান যে করছে সে নিশ্চয়ই চট করে এক ফাঁকে ঘড়ি দেখবে না।
মা আমার গা ঘেষে শুয়েছেন। জালালের মার খাটটা ফাকা। তাকে আলাদা ঘর দেয়া হয়েছে। ব্যবস্থাটা সোহরাব চাচার করা। তিনি সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন। জালালের মাকে এই ঘরে রাখা ঠিক হচ্ছে না। আমি মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিয়েছি। এই ঘরের দুটা খাট এখন আমার জন্যে আর মার জন্যে। মা কখনো আমাকে একা রেখে শোবেন না। দুজন চাপাচাপি করে শুয়ে আছি। তার ঘুম আসছে না। ঘুম আসছে না বলেই ঘরে বাতি জ্বলছে। মার অভ্যাস হচ্ছে ঘুমে যখন তার চোখ বন্ধ হয়ে আসবে তখন তিনি বাতি নিভিয়ে এলোমেলো করে পা ফেলে বিছানায় আসবেন। তিনি খুব নড়াচড়া করছেন। এরমধ্যে দুবার পানি খেলেন। একবার গেলেন বাথরুমে। ডাকবাংলোয় আমাদের ঘরের বাথরুমটার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ হয় না। যে ভেতরে যায় সে খুব অস্বস্তি বোধ করে। সারাক্ষণই খুট খাট শব্দ করে তার উপস্থিতি জানান দেয়। সোহরাব চাচাকে বললেই তিনি ঠিক করে দেবেন। তাঁকে বলা হচ্ছে না। বাথরুম থেকে একবার বের হলে দরজা বন্ধের সমস্যা কারোর মনে থাকছে না। আমরা বোধ হয় সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেয়ে সাময়িক সমাধানকেই বেশি গুরুত্ব দি। একটা। সমস্যা হয়েছে সমস্যাকে পাশ কাটাতে পারলেই হল। আর কিচ্ছু লাগবে না।
শুয়ে শুয়ে শিয়ালের ডাক শুনছি। শিয়ালের ডাকে ভয় ধরানো ভাব থাকে–মনে হয় এই শিয়ালের পালে একবার পড়লে এরা ছিড়ে খুঁড়ে খেয়ে নেবে। আমরা যখন আজিমপুরের নয়া পল্টনে থাকতাম তখনো গভীর রাতে শিয়ালের ডাক শুনতাম। আজিমপুর কবরস্থানে শিয়াল থাকতো। শিয়াল প্রহর গুনে ডাকে—আজিমপুর কবরস্থানের শিয়াল যখন তখন ডেকে উঠত। শহরে থেকে থেকে এরা বোধ হয় শহুরে হয়ে গেছে। পুরানো নিয়ম কানুন ভুলে গেছে।
আমি কুন্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে আছি। আমার গায়ে ভারী কম্বল। তারপরেও শীত মানছে না। দিনে এমন গরম পড়েছিল, রাতে ঝপ করে শীত নেমে গেল। পাহাড়ী অঞ্চলের এই নাকি নিয়ম। রোদ উঠলে প্রচন্ড গরম। বোদ নিভে গেলেই হাড় কাঁপুনি শীত। মোটা কম্বলটাতেও শীত মানছে না। এই কম্বলটা মার খুব প্রিয়। তিনি যেখানে যাবেন কম্বলটা সঙ্গে থাকবে। চৈত্র মাসের প্রচন্ড গরমের সময়ও দেখা যাবে তিনি কোথাও যাবার আগে কম্বল প্যাক করছেন। সেই প্যাকিংএরও অনেক কায়দা। প্রথমে কলটা ভরা হবে পলিথিনের একটা ব্যাগে। তারপর সেই পলিথিনের ব্যাগ ঢুকানো হবে মার নিজের বানানো মার্কিন কাপড়ের থলিতে। কম্বলের মাপে মাপে এই থলি বানানো। সেই থলি ঢুকানো হবে হবে স্যুটকেসে।
মার এই প্রিয় কম্বলের একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে। তিনি একবার বাবার সঙ্গে নিউমার্কেটে গিয়েছিলেন বিছানার চাদর কিনতে। চাদর কিনতে গিয়ে কোন চাদরই তার পছন্দ হল না, এই কম্বলটা তার খুব পছন্দ হল। দাম চার হাজার টাকা। দাম শুনে বাবা-মা দুজনেরই আক্কেল গুড়ুম। মা চাদর না কিনে ফিরে এলেন। তার মন পরে রইল কম্বলে। কথায় কথায় বলেন-কী মোলায়েম কম্বল। কী সুন্দর ডিজাইন—হালকা সবুজ রঙ। দেখেই মনে হয় ওম ওম গরম। তার মাস চারেক পরের কথা। মার বিবাহ বার্ষিকীতে বাবা বিরাট একটা প্যাকেট এনে মার হাতে দিলেন। প্যাকেটের গায়ে লেখা
