বসুন। আসুন আমরা গল্প করতে করতে খাই।
সেলিম ভাই অসহায় ভাবে চারদিকে একবার দেখলেন। আমার পাশে বসে খাওয়াটা ঠিক হবে কি-না বুঝতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে বসলেন আমার পাশে। সব দ্বিধা অবশ্যি ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না। তার চোখে খানিকটা মুখে লেগে রইল।
সেলিম ভাই কেমন আছেন?
ভাল।
কী রকম ভাল? অল্প ভাল না অনেক খানি ভাল?
অল্প ভাল।
এক বস্ত্রে এসেছিলেন–আজ দেখি গায়ে পাঞ্জাবি।
সার্ট প্যান্ট ধুয়ে দিয়েছি।
ভাল করেছেন। ডিরেক্টর সাহেব কী জানেন যে আপনি তাঁর কথামত তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছেন?
জ্বি। আগে মনে করেছিলাম কিছু জানেন না। এখন বুঝেছি জানেন।
কথা হয়েছে তার সঙ্গে?
জ্বি।
কখন কথা হল?
আজ সন্ধ্যায়।
কী কথা হল?
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সেলিম ভাই বিব্রত স্বরে বললেন, আমি একটা বিরাট ঝামেলায় পড়েছি।
কী ঝামেলা?
আপনাকে আমি বলব।
বলুন শুনি।
এখন বলব না। এখানে অনেক লোকজন।
কখন বলবেন?
আজই বলব। আমি মস্তবড় একটা ঝামেলায় পড়েছি। জীবনে এতবড় ঝামেলায় পড়ি নি।
খুব চিন্তিত?
জ্বি।
আচ্ছা ঠিক আছে–আপনার ঝামেলার কথা শুনব— এখন চুপচাপ খেয়ে যান। খাবারটা ভাল হয়েছে না!
জ্বি হয়েছে।
রেসিপি লাগবে? লাগলে বলুন।
আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
আমি হেসে ফেললাম— আর তখনি মা ঢুকলেন। তিনি আমাকে খেতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন। আমার পাশে সেলিম ভাইকে দেখে তাঁর মাথায় প্রায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত অবস্থা হল। তিনি নিশ্চয়ই এর মধ্যেই আমার ডাইরি পড়ে ফেলেছেন। দুইয়ে দুইয়ে চার বানিয়ে বসে আছেন। মা খাবার নিয়ে আমার দিকে আসছেন। আমার কাছে তিনি বসতে পারবেন না, কোন চেয়ার খালি নেই। তাকে অনেকটা দূরে বসতে হবে। তবে তিনি অন্য একটা কাজও করতে পারেন— হয়ত সেলিম ভাই এর কাছে এসে বলবেন, এই শোন তোমার নাম যেন কী? তুমি ঐ চেয়ারটায় গিয়ে বোস।
মা সামাজিক অবস্থান মাথায় রেখে তুমি আপনি বলেন। তিনি তাঁর রাডারের মত চোখ দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে ফেলেন মানুষটার সামাজিক অবস্থান কী। তখন তুমি আপনি নির্ধারিত হয়ে যায়। সেলিম ভাইকে তিনি শুরু থেকেই তুমি বলছেন। শুধু যে তুমি বলছেন তাই না— ছোট খাট কাজকর্মও তাকে দিয়ে করাচ্ছেন। গতকাল সকালেই তিনি সেলিম ভাইকে ডেকে বললেন— এই যে ছেলে শোন, আমার জন্যে একটা হাত পাখা নিয়ে এসো। প্রোডাকশনের কাউকে বললেই হাত পাখা দিয়ে দেবে।
মা আমার পাশে এসে দাঁড়াতেই সেলিম ভাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি বসুন।
মা বিনাবাক্যব্যয়ে বসে পড়লেন। সেলিম ভাই প্লেট হাতে আগের জায়গায় চলে গেলেন। মনে হল তিনি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন।
মা রাগে কাঁপছেন। আমি তার রাগ টের পাচ্ছি। রাগের প্রকাশ কীভাবে হবে বুঝতে পারছি না। ঘটনাটা বাসায় ঘটলে প্লেট ছুঁড়ে মারতেন আমার দিকে। আমার শরীর রেজালার ঝোলে মাখামাখি হয়ে যেত। প্লেটের কোণা লেগে কপাল কেটে রক্ত পড়ত। এখানে এ জাতীয় কিছু করা সম্ভব না। মা কাঁপা গলায় প্রায় ফিস ফিস করে বললেন—মঈন ভাইয়ের সঙ্গে কথা শেষ হয়েছে?
হ্যাঁ।
কী বললেন?
প্রেম কত প্রকার ও কী কী উদাহারণ সহ ব্যাখ্যা করলেন।
মা কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন। আমি সহজ ভঙ্গিতে ভাত মাখতে মাখতে বললাম––উনিতো প্রেম বিশারদ। প্রেমের সব কিছু তিনি জানেন।
ফাজলামি করছিস কেন?
ফাজলামি করছি না, যা সত্যি তাই বললাম।
আমি তোর জন্যে বসে আছি–তুই আমাকে না নিয়ে একা একা খেতে চলে এলি কী মনে করে?
ক্ষিধে লেগেছিল চলে এসেছি।
তোর হয়েছে কী?
কিছু হয় নি। এই গাধাটা তোর সঙ্গে খাচ্ছে কেন?
আমি ডেকে এনেছি বলে আমার সঙ্গে বসে খাচ্ছিলেন। কারো সঙ্গে গল্প না করে আমি খেতে পারি না।
গাধাটার সঙ্গে কী গল্প করছিলি?
বার বার উনাকে গাধা বলছ কেন?
যে গাধা আমি তাকে কী বলব? হাতি বলব?
মা তুমি খাচ্ছ না। খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলে তুমি খেয়ে মজা পাবে না। খাসির রেজালাটা খুব ভাল হয়েছে। খাঁটি সরিষার তেলে রান্না হয়েছেতো এই জন্যে। খেয়ে তোমার যদি ভাল লাগে আমাকে বলবে আমি রেসিপি দিয়ে দেব।
মা আগুন চোখে তাকাচ্ছেন। আমি তাকিয়ে আছি হাসি মুখে। আমার খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছে। মা কিছুক্ষণ থাকুক একা একা। রেগে অস্থির হোক। রেগে অস্থির হয়ে এক সময় মা ড্রাগনের মত হয়ে যাবে তার নাক মুখ দিয়ে আগুনের হলকা বের হতে থাকবে। সেই পর্যায়ে আসুক তখন ঠান্ডা পানি ঢেলে মার রাগ কমানোর ব্যবস্থা করা যাবে।
বকুল!
হুঁ।
মঈন ভাইয়ের সঙ্গে তোর কী কী কথা হয়েছে বল। কোন কিছু বাদ দিবি না।
হাতি এবং পিঁপড়া সম্পর্কে অনেক কথা বললেন।
হাতি এবং পিঁপড়া মানে?
একটা হাতি এবং পিঁপড়া ছিল— তাদের হচ্ছে একই ব্লাড গ্রুপ, ও পজিটিভ।
তোকে এখন আমি সবার সামনে চড় মারব।
হাত ধুয়ে তারপর চড় মার মা। নয়ত গালে ঝোল লেগে যাবে।
মা তাকিয়ে আছেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবং মার চোখের সামনেই সেলিম ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মাকে দেখিয়ে দেখিয়ে সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করব। মাকে আমি আজ ড্রাগন বানিয়ে ফেলব।
সেলিম ভাই আমাকে দেখে বিব্রত ভঙ্গিতে তাকালেন। মা যেমন আমার কান্ডকারখানা বুঝতে পারছেন না, মনে হয় তিনিও পারছেন না।
সেলিম ভাই!
জি।
আপনি বলেছেন–আপনি ভয়ংকর বিপদে পড়েছেন। আমার ধারণা আমি বুঝতে পারছি আপনার বিপদটা কী?
