খুকুকে
শুভ বিবাহ বার্ষিকী
মা প্যাকেট দেখে খুব বিরক্ত হলেন। আঁঝাল গলায় বললেন, কী এনেছ তুমি বলতো? উপহার তোমাকে কে আনতে বলেছে? আমাদের বিয়েটা এমন কিছু না যে উৎসব করে পোলাও-কোরমা খেতে হবে, উপহার টুপহার দিতে হবে, আমি খুবই রাগ করছি। কী আছে এর মধ্যে?
বাবা হাসিমুখে বললেন, খুলে দেখ।
মা বললেন, আমি খুলতে পারব না। বকু, খুলে দেখতো।
আমি বললাম, মা তুমিই খোল। তোমার জিনিস।
মা বললেন, হ্যাঁ আমার জিনিস। আমার জিনিস নিয়ে আমি স্বর্গে যাব।
বলতে বলতে উপহারের প্যাকেট খোলা হল এবং মা যে কী খুশি হলেন! দেখতে দেখতে মার চোখে পানি এস গেল। তিনি এই হাসেন, এই কাদেন। সামান্য একটা কম্বলে মানুষ এত খুশি হয়। মে মাসের তীব্র গরমে মা সেই কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমুলেন।
মার সঙ্গে এইখানেই আমার তফাৎ। আমি হলে বাবা যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন সেদিনই কম্বল ছিড়ে কুটি কুটি করে — আগুন জ্বালিয়ে ছাই করে দিতাম। সিন্দাবাদের ভূতের মত ঘাড়ে চাপিয়ে রাখতাম না। মাকে সেই কথা বলেছিলাম–মা অবাক হয়ে বললেন, তোর বাবার সঙ্গে এই কম্বলের সম্পর্ক কী? সে যেখানে গেছে যাক। ধুমসীকে নিয়ে নাচাকুদা যা ইচ্ছা করুক আমার তাতে কী? যখন সে কম্বলটা দিয়েছিল ভালবেসে দিয়েছিল। মানুষটা নষ্ট হয়ে গেছে, তার ভালবাসা নষ্ট হবে কেন?
আমি রাগি গলায় বললাম, মা তোমার ধারণা ভালবাসা নষ্ট হয় না?
ভালবাসা কি কোন খাবার যে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে?
ভালবাসাটা তাহলে কী মা?
এক সময় নিজেই জানতে পারবি—আমাকে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে না।
সময় হোক, সময় হলে জানবি।
ভালবাসা কি চার হাজার টাকা দামের কম্বল?
ফাজলামি করবি না। চুপ কর।
আমি চুপ করে গেলাম। তবে চুপ করে গেলেও আমি এইসব নিয়ে ভাবি। খুব ভাবি। অন্য মেয়েরা এত ভাবে কি-না জানি না। হয়ত ভাবে না। তাদের এত সময় কোথায়? তাদের খেলাধুলা আছে, বন্ধু বান্ধব আছে। পিকনিক আছে, জন্মদিন আছে। আমার কী আছে? কিছুই নেই। শুধু মা আছেন। বাসায় আমরা দুজন যতক্ষণ থাকি——ম অনবরত কথা বলেন। আমি বেশির ভাগ সময়ই কিছু শুনি না। মার দিকে তাকিয়ে থাকি তবে মা কী বলছেন তা আমার কানে ঢোকে না। মা মাঝে মাঝে বলেন— কী-রে তুই এমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছিস কেন? আমি বলি মা আমার চোখ দুটাতো অদ্ভুত কাজেই অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছি।
আমার সঙ্গে ফাজিলের মত কথা বলবি না বকু।
ফাজিলের কী হল–আমার চোখ অদ্ভুত না?
বকু তুই দিন দিন অসহ্য হচ্ছিস।
মা তুমিও দিন দিন অসহ্য হচ্ছ।
আমি অসহ্য হচ্ছি?
হুঁ। এবং যতই দিন যাচ্ছে ততই আমার বাবার জন্যে সহানুভূতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাবা তোমাকে ছেড়ে গিয়ে খুব ভুল করে নি। আমি বাবা হলে অনেক আগেই তোমাকে ছেড়ে চলে যেতাম।
কথাবার্তা এই পর্যায়ে চলে এলে যা করেন তাকে পুরোপুরি কিশোরী সুলভ আচরণ বলা যেতে পারে। তিনি শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। খাওয়া বন্ধ। ভাত-রাগ। ভাত খাবেন না। মাঝে মাঝে শোনা যায় বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে তিনি কাঁদছেন–ও বাবু। বাবু। তুমি কই বাবু। বাবু তুমি আমাকে একটু আদর করে দিয়ে যাও।
বাবু হলেন আমাদের নানাজান। মার বয়স যখন সাত তখন তিনি মারা যান। মা তার বাবাকে বাবা বা আল্লু ডাকতেন না। ডাকতেন— বাবু।
আমার পানির পিপাসা হচ্ছে। পানি খাবার জন্যে উঠে বসলে সর্বনাশ হয়ে যাবে, মা আমাকে ধরে বসবেন। বাকি রাত মার বক্তৃতা শুনে কাটাতে হবে। সকালে আমার শুটিং। রাত জাগলে তার ছাপ পড়বে চেহারায়। সিনেমার শক্তিশালী ক্যামেরাকে ফাঁকি দেয়া যাবে না। ক্যামেরা সব ধরে ফেলবে।
কাল সকালের সিকোয়েন্সটা খুব সুন্দর। আমি পানির তৃষ্ণা ভুলে থাকার জন্যে আমার সিকোয়েন্স নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলাম। দৃশ্যটা এ রকম—
দিলু শখ করে শাড়ি পরেছে। কপালে টিপ দিয়ে নিজের মত করে সেজেছে। দিলুর বাবা ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে গল্পের বই পড়ছিলেন। দিলু তাঁকে বলল, বাবা আমাকে কেমন দেখাচ্ছে? তিনি বই থেকে চোখ না তুলেই বললেন—খুব সুন্দর লাগছেরে মা। বিউটিফুল। তোর মাকে বলতো চা দিতে। দিলুর মনটা খারাপ হল। বাবা একবার তাকিয়ে তার রূপবতী কন্যাকে দেখলেনও না? সে তার মাকে চা দেবার কথা না বলে ডাকবাংলো থেকে বের হল। তার দেখা হল জামিলের সঙ্গে। জামিল বলল, পরী সেজে কোথায় যাচ্ছিস? দিলু লজ্জিত গলায় বলল-জামিল ভাই আমাকে সত্যি সুন্দর লাগছে?
জামিল বললেন, সুন্দর লাগছে মানে–তোকেতো কুইন অব শেবার মত লাগছে। কপালের টিপটা ঠিকমত দিতে পারিস নি। একপেশে হয়ে গেছে। যা কলম নিয়ে আয় আমি টিপ একে দিচ্ছি।
এই কথায় দিলু খুব লজ্জা পেয়ে গেল। সে চোখ মুখ লাল করে বলল—থাক আপনাকে টিপ আঁকতে হবে না। এই বলেই সে ছুটে বের হয়ে গেল। সে থামল পুকুরের কাছে গিয়ে। পুকুরের জলে নিজের ছায়া দেখল। সেই ছায়া দেখে তার লজ্জা আরো যেন বেড়ে গেল। একটা ঢিল ছুঁড়ে পুকুরের ছায়াটা ভেঙ্গে দিল। তারপর লজ্জায় শাড়ির আঁচলে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। এইখানেই প্রথম প্রকাশ পেল মেয়েটি জামিল নামের মানুষটিকে পাগলের মত ভালবাসে।
কাল কোন অংশটি হবে ডিরেক্টর সাহেব আমাকে বলেন নি। আমার ধারণা পুকুরের অংশটা হবে। কোন শাড়ি পরব—তাও ঠিক হয় নি। তবে শাড়ি নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হবে না! এই সব ব্যবস্থা ডিরেক্টর সাহেব করে রেখেছেন। প্রতিটি পোষাক দুসেট করে কেনা আছে। একটা সেট আলাদা করা। ছবি রিলিজ না হওয়া পর্যন্ত সেই সেটে হাত দেয়া হবে না। যদি হঠাৎ কোন প্যাচ ওয়ার্কের প্রয়োজন হয়। এইসব ব্যাপারে ডিরেক্টর সাহেবের কাজ কর্ম নিখুঁত।
