জানি না।
পিঁপড়া শুয়ে আছে কারণ পিপাড়াটা হাতিকে রক্ত দিচ্ছিল। তাদের দুজনের একই গ্রুপের রক্ত ও পজিটিভ।
তিনি এবারে গলা খুলে হাসছেন। আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁর ছেলেমানুষি হাসি দেখছি। আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে–তার হাসি আমার শরীরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। আমার শরীর ঝমঝম করছে। শরীরের ভেতরটা কাঁপছে। আমার ইচ্ছা করছে ছুটে চলে যাই। কিন্তু উঠতে পারছি না। এমন সময় সোহরাব চাচা ঢুকলেন। ডিরেক্টর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন–আমি নেত্রকোনা যাচ্ছি। আপনার কিছু লাগবে?
ডিরেক্টর সাহেব বললেন, নেত্রকোনায় এক ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায় নাম হচ্ছে বালিস। মিষ্টিটার শুধু নাম শুনেছি কখনো খেয়ে দেখি নি। যদি পাও নিয়ে এসো।
রান্নাও হয়েছে, খাবার দিতে বলি?
ডিরেক্টর সাহেব বললেন–দিতে বল। পাপিয়াকে জিজ্ঞেস কর–সে কি সবার সঙ্গে খাবে, না তার খাবার আলাদা দেয়া হবে?
ম্যাডাম বলেছেন উনি রাতে কিছু খাবেন না।
সেকী?
ম্যাডাম খেতে চেয়েছেন বলেই খাসি কিনে এনে রেজালা করা হয়েছে। পোলাও এর চালের ভাত করা হয়েছে। স্যার আপনি একটু বলে দেখবেন?
খাবে না কেন কিছু বলেছে?
উনার নাকি শরীর ভাল না। উনি দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছেন।
ভাল যন্ত্রণা হল দেখি।
ফরহাদ সাহেবও এখনো এসে পৌছালেন না। উনাকে ছাড়া শুটিং শুরু হবে কীভাবে? কাউকে কি পাঠিয়ে দেব? রাতে খেয়ে গাড়ি নিয়ে ঢাকা চলে যাবে— উনাকে নিয়ে চলে আসবে।
না।
ডিরেক্টর সাহেব চিন্তিত মুখে বের হয়ে গেলেন। কিছু না বললেও বোঝা যাচ্ছে তিনি পাপিয়া ম্যাডামের ঘরের দিকে যাচ্ছেন। আমার কেন জানি খুব ইচ্ছা করছে পাপিয়া ম্যাডামের রাগ কীভাবে ভাঙ্গানো হয় সেই দৃশ্য দেখি। ডিরেক্টর সাহেবের পেছনে পেছনে যাই।
সোহরাব চাচা বললেন, মিস রুমাল চল খেতে চল। আমি বললাম, চলুন।
মা নিশ্চয়ই মুখ গম্ভীর করে তাঁর ঘরে আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আমি যাওয়া মাত্র ডিরেক্টর সাহেবের সঙ্গে আমার কী কী কথা হল সব শুনবেন। কোন কিছুই বাদ দেয়া যাবে না। কোন কোন জায়গা দুবার তিনবার করেও শুনাতে হবে। মার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। আমি সোহরাব চাচার সঙ্গে সরাসরি ডাইনিং রুমে চলে গেলাম।
খাওয়া শুরু হয়ে গেছে। গণ খাবারের কায়দা কানুন অন্য রকম প্লেট হাতে যেতে হয় বাবুর্চির কাছে। বাবুর্চি তার লোকজন নিয়ে বসে থাকেন। তার সামনে বিরাট বিরাট ডেকচিতে ভাত, তরকারি, ভাজি, সালাদ। বড় বড় চামুচে প্রেটের উপর খাবার তুলে দেয়া হয়। থালা উপচে আগুন গরম খাবার পড়ে যেতে থাকে। সেই খাবার গবাগব করে খাওয়া হয়। পুরো ব্যাপারটায় পিকনিক পিকনিক ভাব থাকে। আমার খুব ভাল লাগে।
ডাইনিং রুমে সবাই আছেন শুধু মা আর জালালের মা নেই। মা নিশ্চয়ই আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন—–আর জালালের মা, মাকে এই ফাঁকে কয়েকটা ভয়ংকর টাইপ গল্প শুনিয়ে ফেলছে। আমাদের এই ডিরেক্টর সাহেবকে নিয়েও অনেক গল্প নিশ্চয়ই জালালের মা জানেন। তার কাছ থেকে কিছু গল্প শুনতে হবে। মাকে না জানিয়ে শুনতে হবে।
তরকারির রঙ খুব সুন্দর হয়েছে। আমি প্লেট হাতে খাবার নিয়ে নিলাম। ধোঁয়া ওঠা পোলাওয়ের চালের ভাত— সুন্দর গন্ধ আসছে ভাত থেকে। খাসির গোসতের রেজালা। রেজালা দেখেই বোঝা যাচ্ছে— খেতে খুব ভাল হবে। পাপিয়া ম্যাডাম যদি খেতেন, রেজালার রেসিপি চাইতেন।
কেয়ামত ভাই হাসি মুখে বললেন— আপা, মা কই?
আমি বললাম, মা আসবে। আমার খুব ক্ষিধে লেগেছে আমি আগে খেয়ে নেব!
আজ এক তরকারির খানা। সালাদ নেন।
না সালাদ নেব না।
ডাইনিং রুমে চেয়ার টেবিল আছে। চেয়ার টেবিলে সবার জায়গা হয় না। অলিখিত নিয়ম হচ্ছে শিল্পীরা চেয়ার টেবিলে বসবেন— বাকিরা প্লেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে খাবেন–বুফে সিস্টেম। তবে আমাদের ডিরেক্টর সাহেবের কোন ঠিক ঠিকানা নেই। এই দেখা যায় তিনি চেয়ার টেবিলে বসেছেন— আবার দেখা যায় দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন। একবার দেখি ফকিরদের মত মাটিতে ল্যাপচা মেরে বসে খাচ্ছেন। সোহরাব চাচা কোখেকে পুরানো খবরের কাগজ এনে বললেন— স্যার এর উপর বসুন। তিনি বললেন—— লাগবে না। লাগবে না। সোনার বাংলার স্বর্ণ ধুলি গায়ে মেখে নিচ্ছি। তার এই কথায় আসে পাশের সবাই হাসল। ডিরেক্টর সাহেব যাই বলেন তাতেই মজা পেয়ে সবাই হাসে। তিনি রসিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। আমার নিজের ধারণা তিনি পদাধিকার বলে রসিক। ডিরেক্টর না হয়ে তিনি যদি ক্যামেরা ম্যানের এসিসটেন্ট হতেন তাহলে তাঁর রসিকতায় কেউ হাসত না। বরং তার কাজ কর্মে সবাই বিরক্ত হত।
আমি প্লেট নিয়ে খাবার টেবিলের দিকে যাচ্ছি হঠাৎ দেখি ঘরের এক কোণায় সেলিম ভাই দাঁড়িয়ে। তার হাতে খাবারের প্লেট। তিনি মাথা নিচু করে খাচ্ছেন। আজ তার গায়ে পাঞ্জাবি। তিনি একটামাত্র সার্ট প্যান্ট নিয়ে এসেছিলেন আজ পাঞ্জাবি পেলেন কোথায়? আমি হাসিমুখে ডাকলাম সেলিম ভাই।
তিনি এমন ভাবে চমকে উঠলেন যে আরেকটু হলে হাত থেকে প্লেট পড়ে গিয়ে বিশ্রী কান্ড হত। নায়িকার হাত থেকে প্লেট পড়ে ভেঙ্গে যাওয়া মজার ব্যাপার। সবাই তাতে মজা পায়। প্রোডাকশন ম্যানেজার আনন্দে হেসে ফেলেন। এক্সট্রা মেয়ের হাত থেকে প্লেট পড়ে গেলে সবাই কটমট করে তাকায়। প্রোডাকশন ম্যানেজার চাপা গলায় ধমক দেন। ধমক চাপা গলায় হলেও সবার কানে যায়। আমি হাসি মুখে ডাকলাম, সেলিম ভাই এদিকে আসুন। প্লেট হাতে সেলিম ভাই বিব্রত ভঙ্গিতে আসছেন। তাঁর অস্বস্তি দেখে মনে হচ্ছে–বেচারাকে না ডাকলেই হত। নিজের মনে আরাম করে খেতে পারতেন।
