বকুল।
জ্বি স্যার।
মেয়েটা এমন বয়স্ক একজন মানুষের প্রেমে কেন পড়ল?
জানি না। চিত্রনাট্যে সেটা উল্লেখ করা হয় নি।
তোমার কী ধারণা সেটা বল?
আমার কোন ধারণা নেই।
বয়োসন্ধির পর মেয়েরা হঠাৎ খানিকটা অসহায় বোধ করতে থাকে। তাদের মধ্যে লতা ধর্ম প্রবল হয়ে ওঠে ….
লতা ধর্মটা কী?
লতা ধর্ম হচ্ছে–লতানো গাছের ধর্ম। লতানো গাছ কী করে? আশে পাশে শক্ত কোন গাছের খোজ করে। পনেরো-ষোল বছরের মেয়েদের মধ্যে লতা ধর্ম যখন প্রবল হয়ে দেখা দেয়, প্রেমটা তখনি আসে। কার প্রেমে পড়ল, তখন সে আর ভেবে দেখে না।
আমি হেসে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেলাম। প্রেম সম্পর্কে এমন সহজ ব্যাখ্যা এর আগে কেউ বোধ হয় দেয় নি।
হাসছ কেন?
এম্নি হাসছি।
আমার ব্যাখ্যা খুব বেশি সরল বলে হাসছ? যে ব্যাপারটা বাইরে থেকে যত জটিল মনে হয় তার ব্যাখ্যা কিন্তু তত সহজ! পনেরো ষোল বছরের মেয়েরা কাদের প্রেমে পড়ছে সেই স্ট্যাটিসটিকস যদি নাও তাহলে অনেক মজার ব্যাপার দেখবে। এই সময়ে তারা যাদের সংস্পর্শে আসছে তাদেরই প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। প্রাইভেট মাস্টারের সঙ্গে প্রেম হচ্ছে কারণ সে তাকে পড়াতে আসছে। গানের মাস্টারের সঙ্গে প্রেম হচ্ছে, তার সঙ্গে তার যোগাযোগ হচ্ছে। বড় ভাইয়ের বন্ধুর সঙ্গে প্রেম হচ্ছে। এমন কি বাবার বন্ধুর সঙ্গেও প্রেম হচ্ছে। কারণ বাবার বন্ধু মাঝে মাঝে বাসায় আসেন। তার সঙ্গে কথা হয়। সেই সময়কার প্রেমটা অন্য রকম। হিসাব নিকাশের বাইরের প্রেম।
আমি কিছু বলব না, বলব না করেও বলে ফেললাম— হিসাব নিকাশের বাইরের প্রেম মানে কী?
প্রেমের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা মানেই হিসাব নিকাশ। পরিণতি নিয়ে চিন্তা ভাবনা ছাড়া প্রেম মানে হিসাব নিকাশহীন প্রেম। বুঝতে পারছ?
না।
না বোঝার মত কিছু না। আমাদের ছবির মেয়ে দিলুর প্রেম হিসাব নিকাশ হীন প্রেম। প্রেমের পরিণতি নিয়ে সে কখনো ভাবে নি। সে অন্ধের মত প্রেমে পড়েছে।
পরিণতি নিয়ে না ভাবলে সে আত্মহত্যা করে কেন?
আত্মহত্যাটাও তার প্রেমেরই একটা অংশ। সে তার আবেগের তীব্রতাটা সবাইকে দেখাতে গিয়ে এই কান্ডটা করেছে। এই বয়সের প্রেমে একটা দেখানোর ব্যাপারও থাকে। দেখ আমি কী করে ফেললাম এই ভাব।
আমি বললাম, স্যার আমার সে রকম মনে হচ্ছে না।
তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, তোমার কী মনে হচ্ছে?
আমার মনে হয় মেয়েটা হঠাৎ তার নিজের ভেতরের প্রেম ভাল মত লক্ষ্য করে। তার তীব্রতা দেখে সে হকচকিয়ে যায়। সে সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে।
তিনি একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে একটু হাসলেন। প্রশ্রয়ের হাসি। ছোট বাচ্চারা হঠাৎ জ্ঞানীর মত কথা বলে উঠলে বড়রা যেমন হাসে তেমন হাসি। তবে আমার কথার তেমন গুরুত্ব দিলেন না।
বকুল!
জ্বি স্যার।
চিত্রনাট্যর কোন অংশটা তোমার কাছে খুব সুন্দর মনে হয়েছে?
দিলু যে মাঝে মাঝে খুব সুন্দর করে সাজে তারপর পুকুরের কাছে যায়। পুকুরের জলে নিজেকে দেখে এবং নিজের সঙ্গে কথা বলে এই দৃশ্যটা।
সেই দৃশ্যটা আমরা কাল করব। এই দৃশ্য দিয়ে শুরু। তুমি দৃশ্যগুলি আজ রাতে খুব ভাল মত পড়বে। শোবার আগে ভাববে। আমি দৃশ্যগুলি কী ভাবে নেব ভেবে রেখেছি–তোমার মাথায় যদি কিছু থাকে তাও আমাকে বলবে।
জি আচ্ছা।
এই ছবির আসল নায়িকা কে তুমি কি জান?
জানি, দিলু।
হ্যাঁ এই কিশোরী মেয়েটিই ছবির নায়িকা। পাপিয়া ব্যাপারটা জানে না। তার ধারণা সেই ছবির নায়িকা। তাকে সে রকম বলাও হয়েছে। চিত্রনাট্য সে পড়ে নি। তাকে চিত্রনাট্য পড়তেও দেই নি। চিত্রনাট্য পড়লে সে খুব হৈ চৈ করত। আচ্ছা তুমি যাও —
তিনি যা বললেন কিন্তু আমি আগের জায়গাতেই বসে রইলাম। আমার কেন জানি উঠতে ইচ্ছা করছে না। তিনি বললেন–কিছু বলবে?
জ্বি না।
তিনি আরেকটা সিগারেট ধরালেন। তাঁকে হঠাৎ খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে তিনি অন্য কিছু ভাবছেন। আমি যে তাঁর সামনে বসে আছি তা আর
তার মনে নেই। ঘরে মসকুইটো কয়েল জ্বলছে। ধোয়ায় নাক জ্বালা করছে।
বকুল! জ্বি। আচ্ছা দেখি তোমার বুদ্ধি।
তিনি নড়েচড়ে বসলেন এবং হাসি মুখে তাকালেন। তাঁর চোখে চাপা আনন্দ। ম্যাজিশিয়ান মজাদার কিছু করার আগে মনে হয় এই ভাবেই দর্শকদের দিকে তাকায়।
গল্পটা মন দিয়ে শোন—একটা হাতি এবং একটা পিঁপড়ার গল্প। একটা পিঁপড়া মোটর সাইকেলে করে যাচ্ছিল। একটা হাতি আসছিল উল্টা দিক থেকে। পিঁপড়া ব্যালেন্স হারিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে হাতির গায়ে পড়ল। বিরাট এ্যাকসিডেন্ট। মজার ব্যাপার হচ্ছে একসিডেন্টে পিঁপড়ার কিছু হল না—শুধু হাতিটা আহত হল। এখন বল কেন এ্যাকসিডেন্টে পিঁপড়ার কিছু হল না?
আমি বললাম, জানি না।
খুব সহজ উত্তর। পিঁপড়াটার মাথায় হেলমেট পরা ছিল। পিঁপড়া ছোট প্রাণী হলেও, ট্রাফিক রুল মেনে চলে। হেলমেট ছাড়া মোটর সাইকেল নিয়ে বের হয় না।
আমি ভেবেছিলাম জবাবটা দিয়ে তিনি তার স্বভাব মত হো হো করে হাসবেন। তিনি হাসলেন না বরং খানিকটা গম্ভীর হয়ে গেলেন। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন–
আহত হাতিকে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। দেখা গেল আহত হাতি এবং পিঁপড়া পাশাপাশি বেড়ে শুয়ে আছে।
এখন তুমি বল–পিঁপড়াটারতো কিছু হয় নি। সে কেন হাতির বেডের পাশে শুয়ে আছে?
