আজ তাঁকে অল্প বয়স্ক মনে হচ্ছে কারণ চুলে কলপও দিয়েছেন। চুলে কলপ দেয়া স্টেজে যারা চলে যান তাদের দেখতে খুব মজা লাগে। বুড়োটে ধরনের মানুষ হঠাৎ একদিন দেখা যায় কুচকুচে কালো চুলের একজন মানুষ। হাব ভাব যুবকের মত। এরা আবার রঙ চঙে সার্ট পরতেও ভালবাসে। চুলে যেমন কলপ লাগায়— মনেও খানিকটা লাগায়।
বকুল এবং বকুল মাতা গেট সীটেড। বসে পড়ুন।
আমরা সামনের খাটে বসলাম। মা বললেন, ভাই সাহেব কেমন আছেন? ইস্ আপনার উপর খুব কাজের চাপ যাচ্ছে। আপনাকে দেখি আর অবাক হই। একটা মানুষ এত কাজ কীভাবে করে। আমি বকুলকে বলছিলাম–তোর চাচাকে দেখে শেখ, কর্মযোগী কাকে বলে। সকাল বিকাল দুবেলা উনার পায়ের ধুলা নিয়ে কপালে ঘষবি এতে যদি কপালের উনিশ বিশ হয়। যে কপাল নিয়ে জন্মেছিস সে কপালে কিছু হবে না। তোর বাবা থেকেও নেই। এখন ওর মুরুব্বী বলতেও আপনি, বাবা বলতেও আপনি।
ডিরেক্টর সাহেব শান্ত ভঙ্গিতে শুনে যাচ্ছেন। উনি রাগ করছেন কি-না বুঝতে পারছি না। মনে হয় রাগ করছেন না। মার স্বভাব তিনি জেনে গেছেন। এই স্বভাবের মানুষের উপর রাগ করা যায় না। আমি ডিরেক্টর সাহেব হলে রাগ করতাম না। বরং মনে মনে হাসতাম।
মা কথা বলেই যাচ্ছেন। থামছেন না। মা চুপ করতো–বলে মাকে আমি থামাতে পারি। ইচ্ছে করছে না। যার থামাবার সে থামাবে— আমার কী?
মঈন ভাই আমার মেয়ের গলায় একটা গান কিন্তু আপনার ছবিতে রাখতে হবে। আপনার কাছে আমার রিকোয়েস্ট। দুই লাইনের একটা গান হলেও তার গলায় রাখবেন। সবচে ভাল হয় নিজের গান সে যদি নিজে গায়। আপনি ওর গান শুনে দেখুন। যদি পছন্দ না হয় তখন প্লে ব্যাক সিঙ্গার নেবেন। ভাই আমার মেয়ের একটা গান আপনি শুনে দেখুন। পথহারা পাখি গানটা সে কী সুন্দর যে গায়। বকু, চাচাকে গানটা গেয়ে শোনা।
ডিরেক্টর সাহেব হাসলেন। আমি ভদ্রলোকের ধৈর্য দেখে অবাক হলাম। ভদ্রলোকের হাসি দেখে মনে হতে পারে উনি এখনই বলবেন— বকুল শোনাও তোমার পথ হারা পাখি গান। আমি জানি তিনি তা করবেন না। আমার গানের প্রতি তার আগ্রহ নেই। আমার গান এই ছবির জন্যে প্রয়োজন নেই। চিত্রনাট্যে কোথাও নেই দিলু গান করছে।
মঈন ভাই— পান খাবেন?
জ্বি না, পান খাব না। আপনার কন্যার গানও আজ শুনব না। অন্য একসময় শুনব।
কতক্ষণ আর লাগবে। ছোট গান, একটা মাত্র অন্তরা।
গান হচ্ছে মুডের ব্যাপার। আজ মুড নেই। কাল সকাল থেকে শুটিং হবে–আমি আপনার মেয়ের সঙ্গে সেই বিষয়ে কিছু কথা বলি।
মা হতাশ গলায় বললেন, জি আচ্ছা বলুন। কিন্তু মঈন ভাই ওর গান কিন্তু আপনাকে শুনতে হবে। মশলা খাবেন? পানের মশলা?
না মশলাও খাব না। আপনি এক কাজ করুন–নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন, কিংবা রান্না বান্না কেমন এগুচ্ছে একটু দেখুন। আমি একা আপনার কন্যার সঙ্গে কথা বলব।
মার মুখ শুকিয়ে গেল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি অতি দ্রুত কিছু যুক্তি দাঁড়া করাবার চেষ্টা করছেন যে যুক্তিতে মেয়ের সঙ্গে থাকতে পারেন কোন যুক্তি তার মাথায় আসছে না। মা নিষ্প্রাণ গলায় বললেন, আচ্ছা। মা বের হয়ে যাচ্ছেন–তাঁর হতাশ ভঙ্গিতে চলে যেতে দেখে আমার খারাপ লাগছে। ডিরেক্টর সাহেব নিশ্চয়ই এমন কোন কথা বলবেন না যা আমার মায়ের সামনে বলা যায় না। তিনি থাকলে কোন ক্ষতি ছিল না। মা বেশি কথা বলেন তা ঠিক— মাকে চুপ করে থাকতে বললেই তিনি চুপ করে যেতেন।
বকুল।
জ্বি।
কেমন আছ তুমি বল।
ভাল আছি।
গ্রাম কেমন লাগছে?
ভাল লাগছে।
চিত্রনাট্যটা কি মন দিয়ে পড়েছ?
জি।
চিত্রনাট্য তোমার কাছে কেমন লেগেছে?
ভাল।
এই ছবি কি বাংলাদেশের মানুষ দেখবে?
না।
না কেন? ছবিতে নাচ-গান নেই এই জন্যে?
ছবির গল্পটা খুব জটিল।
ছবির গল্প তোমার কাছে জটিল মনে হয়েছে?
জ্বি।
তোমার নিজের চরিত্রটা কি তোমার পছন্দ হয়েছে?
জ্বি।
দিলুকে তোমার পছন্দ হয়েছে?
জি হয়েছে।
তুমি কি দিলুর মত?
না আমি দিলুর মত না।
এখন তুমি বল— দিলু কেমন?
দিলু খুব নিঃসঙ্গ একটা মেয়ে। একা একা থাকে। তার কিছুই ভাল লাগে–খুব দুঃখী মেয়ে।
না ঠিক হল না। আর দশটা পনেরো-ষোল বছরের মেয়ে যেমন দিলুও তেমন। দিলু আলাদা কেউ না। দিলুর শেষ পরিণতিটা খুব দুঃখময় বলে তুমি তাকে দুঃখী মেয়ে ভাবছ! সে সবার সঙ্গে হাসছে, খেলছে, গল্প করছে–ছুটি কাটাতে এসে মজা করছে। তারপর এক সময় তার জীবনে ভয়াবহ একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এমন একজনের প্রেমে পড়ে গেল যে বয়সে তারচে অনেক অনেক বড়। যাকে তার প্রেমের কথাটা সে বলতেও পারছে না। এইটাই তার সমস্যা। এর বাইরে তার কোন সমস্যা নেই। ঠিক বলছি?
জি।
দিলু মেয়েটার যে সহজ স্বাভাবিক জগৎ ছিল, প্রেমে পড়ার পর তার সেই জগৎ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। সে পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। তাই না?
জ্বি।
বকুল তুমি কি কখনো প্রেমে পড়েছ?
জ্বি না।
প্রেমে পড়লে আমাদের জন্যে সুবিধা হত। তোমার জন্যেও অভিনয় করতে সুবিধা হত।
ডিরেক্টর সাহেব মিটিমিটি হাসছেন। কেন হাসছেন আমি বুঝতে পারছি না। তিনি সিগারেট ধরালেন। কয়েকটা টান দিয়ে সিগারেট ছুঁড়ে ফেলবেন, আমি তার জন্যে অপেক্ষা করছি। তিনি সিগারেট ফেললেন না। সহজ ভঙ্গিতে টেনে যেতে লাগলেন। সম্ভবত আজ তিনি আর সিগারেট ফেলবেন না। মনে হচ্ছে পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর তার কর্মকান্ড নির্ভর করে। তাকে এখন কেউ দেখছে না— তাকে ঘিরে ভিড় জমে নেই কাজেই তিনি সিগারেট ফেলছেন না।
