এইটুক লিখে আরো দুটা লাইন লিখে খুব ভালমত কালি দিয়ে কেটে দিয়েছি। পরিষ্কার বুঝতে পারছি পড়ার পর মার ঘাম দিয়ে জ্বর এসে যাবে। বুক ধড়ফড় করতে থাকবে। এমনও হতে পারে তাঁর জিবের নীচে এনজিস্টও দিতে হতে পারে। আমি চাচ্ছি আজ রাতেই মা ডাইরিটা পড়ুক। কাজেই আমি আজ যা করব তা হচ্ছে ডাইরিটা স্যুটকেসে ঢুকিয়ে তালাবন্ধ করে রাখতে ভুলে যাব।
মা এখন কফি খাচ্ছেন এবং আড়ে আড়ে আমাকে দেখছেন। কফি নিশ্চয়ই পাপিয়া ম্যাডামের জন্যে বানানো হয়েছিল। রাতের খাবারের দেরি হবে সে জন্যেই কফি। খবর পেয়ে মা নিজের কন্যার জন্যে নিয়ে এসেছেন। আমি যেহেতু কফি খাই না—তিনি নিজেই চুকচুক করে খাচ্ছেন। ইউনিটে কোন একটা খাবার রান্না হলে–মা তা খাবেন না— তা কখনো হবে না। মা কফি খেতে খেতে জালালের মার সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলছেন।
জালালের মা একজন এক্সট্রা। তিনি আমাদের ছবিতে কাজের বুয়ার চরিত্রে অভিনয় করবেন। রিটায়ার্ড পুলিশের বড় কর্তার বাসায় এই বুয়া ছোটবেলা থেকে আছে। ছুটি কাটাতে সবাই যখন এসেছে বুয়াকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছে।
জালালের মা রাতে আমাদের ঘরে থাকেন। আমরা সবাই থাকি দুর্গাপুর পি, ডাবলিউ, ডি, রেস্ট হাউসে। আমাদের ঘরে দুটা খাট। একটা খাটে আমি আর মা—আরেকটা খাটে জালালের মা। রাত্রে আমি ঘুমিয়ে পড়ি, মা এবং জালালের মা সহজে ঘুমান না, তাদের গল্প চলতেই থাকে। ফিসফিস গুজগুজ! জালালের মা ছবির জগতের সব স্ক্যান্ডালের গল্প জানেন। বলার সময় এমন ভাবে বলেন যেন ঘটনাটা তার নিজের চোখের সামনে ঘটেছে। মা প্রতিটি গল্প খুব আগ্রহের সঙ্গে শোনেন এবং প্রতিটি গল্পই বিশ্বাস করেন। অবিশ্বাস্য গল্পগুলিই বেশি বিশ্বাস করেন।
এখন যে গল্প হচ্ছে আমি তা শুনতে পাচ্ছি। যদিও গল্প ফিসফিস করে বলা হচ্ছে–আমার কান খুব পরিষ্কার। মশাৱা যদি কথা বলতে পারত তাহলে মশাদের গুনগুন কথাও শুনতে পেতাম।
বুঝছেন আপা টেকনাফে আউটডোর পড়ছে। চিত্রা প্রডাকশানের ছবি ডাকু সর্দার। নায়িকা হলেন মহুয়া ম্যাডাম। ম্যাডামের প্রথম ছবি। প্রথম ছবি যখন করে তখন ম্যাডামদের মাথার ঠিক থাকে না। কী করে না করে নিজেও বুঝে না। মাথার মধ্যে থাকে ছবির জগতে যখন আছি তখন উল্টা পাল্টা কাজ করাই লাগবে। বুঝছেন আপা মনে হলে এখনো গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়–ছিঃ ছিঃ ছিঃ।
জালালের মা গলা আরো নিচু করে ফেলল। আমি দেখি মায়ের মুখ হা হয়ে গেছে চোখ বড় বড়। যেন এমন আনন্দময় গল্প তিনি কখনো শোনেন নি। তাঁর কর্ণ আজ স্বার্থক।
সন্ধ্যাবেলা ম্যাডাম চা খেতে গিয়েছেন, ব্লাউজের দুটা হুক খোলা, ইচ্ছা করে খোলা। ব্লাউজের নীচে ইয়েও নেই। গরম বেশি বলে পরেন নি। কারণ ছাড়াই ম্যাডামের হাহা হিহি হাসি। একেকবার হাসেন আর কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচল পড়ে যায়।
গল্পে বাধা পড়ল। সোহরাব চাচা এসে বললেন, মিস রুমাল–যাও স্যার ডাকছেন।
আমি উঠে দাঁড়াবার আগেই মা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
সোহরাব চাচা বললেন, ভাবী আপনার যাবার দরকার নেই। স্যার কালকের শুটিং কী হবে বুঝিয়ে দেবেন।
মা বললেন, সর্বনাশ, আমাকে থাকতেই হবে। বকু কিছু মনে রাখতে পারে না। আমাকেই সব মনে রাখতে হবে।
আসুন তা হলে। দেরি করবেন না।
মা বললেন, দেরি হবে না। এখনই আসছি।
সোহরাব চাচা ঘর থেকে বের হতেই মা বললেন, বকু চুল আচড়ে চট করে কপালে একটা টিপ দিয়ে নে।
আমি বললাম, আমিতো শুটিং এ যাচ্ছি না মা। স্ক্রীপ্ট বুঝতে যাচ্ছি।
ফকিরনীর মত যাবি? উনি কী ভাববেন?
সেজেগুজে গেলেই তো অনেক কিছু ভাবার কথা।
তার মানে?
উনি ভাবতে পারেন আমি তার সঙ্গে প্রেম করতে চাচ্ছি। তাঁকে ভুলাতে চাচ্ছি।
মা হতভম্ব হয়ে গেলেন। চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জালালের মা যেখানে বসেছিলেন সেদিকে তাকালেন। কিছুটা স্বস্তি পেলেন। জালালের মা নেই। সোহরাব চাচাকে ঢুকতে দেখেই তিনি চলে গেছেন। এই মহিলা সোহরাব চাচাকে যমের মত ভয় করেন। মা বললেন, এ রকম কথা তুই কীভাবে বললি?
আমি বললাম, ভুলতো মা বলি নি। মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করার দিকে তোমার মঈন ভাইয়ের ঝোঁক আছে। দেখ না এখন পাপিয়া ম্যাডামের সঙ্গে প্রেম করছেন।
তুই এমন কুৎসিত কথা বলছিস কীভাবে!
প্রেম কুৎসিত হবে কেন মা?
আর একটা কথা বলবি তো টেনে জিভ ছিড়ে ফেলব। বাঁদরামী যথেষ্ট করেছিস।
আমি কথা বাড়ালাম না। চুল আঁচড়ালাম, কপালে টিপ দিলাম। মা অতি দ্রুত তার শাড়ি পাল্টালেন। মুখে পাউডার দিলেন। ঠোঁটে লিপস্টিক দিলেন।
এই বকু আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?
আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, খুব ভাল দেখাচ্ছে। উনি যদি তোমার প্রেমে পড়ে যান আমি মোটেও অবাক হব না। তোমাকে রাণীর প্রিয় সখীর মত দেখাচ্ছে।
মা আচমকা আমার গালে চড় বসালেন। তারপর বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমাকে নিয়ে রওনা হলেন যেন কিছুই হয় নি।
ডিরেক্টর সাহেব তার ঘরে একা বসে আছেন। পায়জামা পাঞ্জাবি পরেছেন বলে তাকে প্রফেসর প্রফেসর লাগছে। তাঁর চুল সুন্দর করে আঁচড়ানো মনে হয় কিছুক্ষণ আগে গোসল করে চুল টুল আঁচড়ে ভদ্র হয়েছেন। গা থেকে হালকা মিষ্টি গন্ধও আসছে। আফটার শেভ এর গন্ধ হতে পারে। মুখে মাখা ক্রীমের গন্ধ হতে পারে। আবার সাবান দিয়ে গোসল করা হলে সাবানের গন্ধ ও হতে পারে। আমার নাক কুকুরের নাকের মত–খুব তীক্ষ।
