আমি লক্ষ্মী মেয়ের মত ঘরে চলে এলাম।
এমন কোন রাত হয় নি কিন্তু চারদিক কেমন নিঝুম হয়ে গেছে। এই অঞ্চলের লোকরা মনে হয় সন্ধ্যা সাতটা বাজতেই খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কেমন অস্বস্থি লাগছে। গাড়ির হর্ণের শব্দ নেই, রিকশার শব্দ নেই। আমি বিছানায় উপুর হয়ে পড়লাম। ডাইরি লেখা যাক। পাপিয়া ম্যাডামের মত সবুজ কালির একটা বল পয়েন্ট আমার জন্যে আনতে বললে হত। ডাইরিতে ইন্টারেস্টিং কিছু কথা সবুজ কালিতে লিখতাম।
আমাদের আজ রান্না হতে দেরি হবে। রান্না কিছুক্ষণ আগে চড়ানো হয়েছে। পাপিয়া ম্যাডাম সন্ধ্যাবেলায় বলেছেন তার খাসির মাংসের রেজালা খেতে ইচ্ছে করছে। বিরিসিরি থেকে খাসি কিনে আনা হয়েছে। এই মাত্র রান্না বসানো হল। আমাদের বাবুর্চির নাম কেয়ামত মিয়া। কেয়ামত কারো নাম হতে পারে?
শুরুতেই আমার সন্দেহ হয়েছিল নামটার কোন সমস্যা আছে। একদিন জিজ্ঞেস করে দেখি আসলেই তাই। তার নাম আসলে নেয়ামত। সবাই ঠাট্টা করে কেয়ামত ডাকতে ডাকতে এখন নাম হয়ে গেছে কেয়ামত। এখন কেউ যদি . জিজ্ঞেস করে আপনার নাম কী, তিনি স্বাভাবিক গলায় বলেন— আমার নাম কেয়ামত, কেয়ামত মিয়া।
কেয়ামত মিয়া রান্না খুব ভাল করেন। অতি সামান্য জিনিস এত যত্ন করে রাঁধেন যে শুধু খেতেই ইচ্ছে করে। প্রতিদিনই একটা না একটা অদ্ভুত আইটেম থাকবে। আজ দুপুরে ছিল সজনে পাতা ভাজি। সজনে গাছের কচি পাতা প্রচুর পেয়াজ দিয়ে সামান্য টক দিয়ে এমন একটা বস্তু বানালেন যে সবাই একবার করে ফেলল—কেয়ামত মিয়া এই ভাজিটা রোজ করবে।
আমি নিজে ডাইরিতে লিখলাম, আজ আমরা নতুন একটা খাবার খেলাম সজনে পাতা ভাজি। খাবারটা এত ভাল হয়েছে যে আমার ধারণা এখন থেকে আমরা রোজই এই খাবার খাব। এবং যখন আমাদের শুটিং শেষ হবে তখন দেখা যাবে দুর্গাপুরের সব সজনে গাছ আমরা খেয়ে ফেলেছি। সজনে পাতা ভাজি রান্নার রেসিপি আমরা পেয়ে গেছি। পাপিয়া ম্যাডাম রেসিপি চেয়েছিলেন তাকে দেয়া হয়েছে, এবং ছোট ম্যাডাম হিসেবে আমাকেও দেয়া হয়েছে।
সজনে পাতা ভাজি
পেয়াজ দুই কাপ
রসুন আধা কাপ
তেতুলের রস আধা কাপ
কাচা মরিচ আধা কাপ
শুকনো মরিচ দশটা
সজনে পাতা এক গামলা
বসন্তের নতুন সজনে পাতা কুচি কুচি করে কেটে তেতুল পানিতে সারাদিন ডুবিয়ে রাখতে হবে। ভাজার আগমুহূর্তে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। লবণ পানিতে ধুয়ে কষ ফেলে দিতে হবে। এক কাপ পেয়াজ তেলে ভাঁজবে। পেয়াজ বাদামী বর্ণ হয়ে যাবার পর সজনে পাতা, এককাপ পেয়াজ কুচি এবং আধ কাপ রসুন কুচির তেলে ফেলে দিয়ে অল্প আঁচে ভাঁজতে হবে। সজনে পাতা তেল টেনে নেবার পর আরো আধ কাপ পানি দিয়ে দমে বসিয়ে দিতে হবে। পরিবেশনের আগে মুচমুচে করে ভাজা শুকনো মরিচ খাবারের উপর দিয়ে দিতে হবে। গরম ভাতের সঙ্গে সজনে পাতা ভাজি অতি উপাদেয়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে এই রেসিপিটা মিথ্যা রেসিপি। সোহরাব চাচা বিকেলে আমাকে এসে বললেন মিস রুমাল আমাকে একটু সাহায্য করতো একটা কাগজে সজনে পাতা ভাজির রেসিপি লিখে দাও। পাপিয়া ম্যাডাম বড় যন্ত্রণায় ফেললেন— কিছু একটা রান্না হলেই রেসিপি।
আমি বললাম, কীভাবে রান্না হয় আপনি বলুন, আমি লিখে দিচ্ছি।
বানিয়ে বানিয়ে একটা কিছু লিখে দাওতো। তোমার কি ধারণা রেসিপি দেখে উনি জীবনে কখনো রান্না করবেন?
রান্না না করলে চাচ্ছেন কেন?
কেন চাচ্ছেন তা একমাত্র আল্লাহ পাকই জানেন। মা লক্ষী তুমি সুন্দর করে একটা রেসিপি লিখে দাও।
যা ইচ্ছা লিখে ফেলব?
লিখে ফেল।
আমি রান্নার বইয়ের মত করে রেসিপি লিখে ফেললাম। যখন লিখছি তখন ঘাড়ের উপর মা ঝুঁকে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন— বকু কী লিখছিস। ডাইরি? আমাকে কোন কিছু লিখতে দেখলেই মা উদ্বিগ্নবোধ করেন। ভাবেন নিষিদ্ধ কিছু বোধ হয় লিখছি।
আমি দুহাতে লেখাটা ঢেকে বললাম, আমার যা মনে আসছে লিখছি তুমি পড়বে না।
উপুর হয়ে লেখালেখি করবি নাতো ফিগার খারাপ হয়ে যায়।
প্লীজ তুমি যাওতো মা।
মা মুখ কালো করে চলে গেলেন। তবে তার মন পড়ে রইল ডাইরিতে। না জানি তার কন্যা কী গোপন কথা লিখে ফেলেছে। এই গোপন কথা জানার জন্যে মা কোন না কোন সময়ে তাঁর কন্যার ডাইরি পড়বেন। আমার ধারণা আজ রাতেই এই কাজটা করবেন। আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর চাবি দিয়ে আমার স্যুটকেস খুলে অতি দ্রুত পড়ে ফেলবেন। উত্তেজনায় এই সময় তাঁর নাক ঘামতে থাকবে। কান্ডটা করে তিনি যেন একটা শক পান সেই ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। দলকলস গাছ প্রসঙ্গে লিখতে লিখতে এক ফাঁকে কিছু নিষিদ্ধ গোপন কথা জুড়ে দিয়েছি। তার একটা লাইন খুব ভাল করে কাটা যাতে মা কিছুতেই সেই লাইনের পাঠোদ্ধার করতে না পারেন। মা জানবেন না কী লেখা হয়েছিল, ছটফট করতে থাকবেন। আমি লিখেছি–
দলকলস মধু
আজ ভোমরার মত ফুল থেকে মধু খেয়েছি। দুপুরের দিকে একা একা হাঁটছিলাম তখন সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হল। খুব চমৎকার একজন মানুষ। হ্যান্ডসাম, বুদ্ধিমান। আমরা দুজন অনেক গল্প করলাম। উনিই গল্প করলেন, আমি শুধু শুনে গেলাম। উনি আবার গাছপালা খুব ভাল চেনেন। আমাকে স্বর্ণলতা চিনিয়ে দিলেন— তারপর চিনিয়ে দিলেন দলকলস গাছ। এই গাছ থেকে কীভাবে মধু পান করতে হয় তাও শেখালেন। তারপর নিজেই একগাদা ফুল এনে দিলেন। আমি ফুল থেকে মধু খাচ্ছি উনি হঠাৎ বললেন— এই রুমালী তোমাকে ঠিক ভোমরার মত লাগছে। ভোমরা যেমন ফুলের মধু খায় তুমিও খাচ্ছ—তাই। উনি আমাকে রুমালী ডাকেন। তবে সবার সামনে না, আড়ালে। সবার সামনে আমাকে বকুল বলেন এবং আপনি করে ডাকেন। আমি তাঁকে বলেছি–সবার সামনে আমাকে আপনি বলার দরকার কী? আমিতো সিনিয়ার কোন ম্যাডাম না, আমার বয়স মাত্র সতেরো। উনি বললেন, আঠারো হোক তখন সবার সামনে তুমি বলব। কে জানে এই কথাটার মানে কী? আমি বড়দের সব কথা বুঝতে পারি না। দেখি একবার কায়দা করে মাকে জিজ্ঞেস করব। মাকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না। তিনি অনেক কিছু সন্দেহ করবেন।
