তুই আমার সঙ্গে বৌটার কাছে যাবি না?
না। এবং আমার একটা উপদেশ শোন মা, তুমিও যেও না। আগে ভাগে ভবিষ্যৎ জানা খুবই ভয়ংকর ব্যাপার।
ভয়ংকর ব্যাপার কেন?
তুমি বাবার সঙ্গে সুন্দর কিছু সময় কাটিয়েছ না? তুমি যদি গোড়া থেকেই জানতে একদিন বাবা তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে তাহলে কি এত সুন্দর সময় কাটাতে পারতে?
তুই বেশি জ্ঞানী হয়ে যাচ্ছিস বকু। এত জ্ঞানী হওয়া ভাল না।
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। আকাশে জীবনবাবুর চিল উড়ছে। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে চিলগুলি। হায় চিল, সোনালী ডানার চিল। এই ভিজে মেঘের দুপুরে……।
অনেকক্ষণ হল সন্ধ্যা মিলিয়েছে
অনেকক্ষণ হল সন্ধ্যা মিলিয়েছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখছি—শত শত জোনাকি পোকা, জ্বলছে নিভছে। কী যে আশ্চর্য হচ্ছি। জোনাকি পোকা আগে দেখি নি তা না। অনেক দেখেছি। কিন্তু এত জোনাকি পোকা এক সঙ্গে কখনো দেখি নি। মনে হচ্ছে থোকায় থোকায় আলোর ফুল ফুটেছে। ফুলগুলি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। চঞ্চল অস্থির কিছু ফুল। পৃথিবীতে কত অদ্ভুত দৃশ্যই না আছে।
আমার জীবনের প্রথম জোনাকি পোকা দেখার দৃশ্যটাও খুব অদ্ভুত ছিল। বাবা-মার সঙ্গে ট্রেনে কোথায় যেন যাচ্ছি। রাতের ট্রেন। ট্রেনের বাতি হঠাৎ নিভে গেল। মা বিরক্ত হয়ে নানান কথা বলতে লাগলেন–ছাতার এক দেশে ছাতার এক ট্রেন। এখন ডাকাত পড়বে জানা কথা–এই সব। মায়ের কথা শুনে আমার ভয় ভয় করতে লাগল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি দরজা জানালা দিয়ে হুড়মুড় করে একদল ডাকাত ঢুকে পড়বে। ডাকাত ঢুকল না। কী ভাবে জানি একটা জোনাকি পোকা ঢুকে পড়ল। বাবা বললেন–রুমালী দেখ একটা জোনাকি পোকা। আমি অবাক হয়ে দেখছি কী সুন্দর আলো। এই জ্বলছে, এই নিভছে। বাবা বললেন—বেচারা জোনাকি একা একা ট্রেনে করে কোথায় যাচ্ছে কে জানে। আমারো মনে হল তাইতো—এর বন্ধু বান্ধব, সঙ্গী সাথী সব কোথায় পড়ে আছে। আর সে একা একা চলে যাচ্ছে। বাবা জোনাকি পোকাটা ধরে আমার হাতে দিয়ে বললেন–মুঠি বন্ধ করে ধরে থাক। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে আলো আসবে। আমি মুঠি বন্ধ করে ধরে আছি। উত্তেজনায় আমার শরীর কাঁপছে। মা বললেন, বকু এখনই জোনাকি পোকা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দে। ফেলে দে বললাম।
আমি বললাম, কেন?
মা চাপা গলায় বললেন, গাধা মেয়ে, জোনাকি পোকা ধরে রাখলে রাতে বিছানা ভিজানো রোগ হয়।
আমি বললাম, বিছানা ভিজানো রোগটা কী?
মা আরো গলা নামিয়ে বললেন—প্রতি রাতে বিছানায় পেচ্ছাব করবি। গাধা মেয়ে। বিয়ের পরেও এই অভ্যাস যাবে না।
কী সর্বনাশের কথা। আমি জোনাকি পোকাটাকে জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম। সে যতক্ষণ উড়ে গেল আমি তাকে দেখার চেষ্টা করলাম। যে হাতে পোকাটা ধরেছিলাম শুকে দেখি সেই হাতে কেমন অদ্ভুত দুর্বা ঘাসের গন্ধের মত গন্ধ।
মিস রুমাল!
আমি চমকে দেখি সোহরাব চাচা। তাঁর হাতে প্রকান্ড বড় একটা বালতি। ফিল্ম লাইনের সবকিছুই খানিকটা উদ্ভট। এত বড় বালতি আমি আগে দেখি নি।
কী করছ গো মা?
জোনাকি পোকা দেখছি চাচা।
জংলা জায়গা। জোনাকি-ফোনাকি কত কিছু দেখবে। চা কফি কিছু খাবে?
জ্বি না।
কিছু লাগলে বল–আমি বাজারে যাচ্ছি। পাপিয়া ম্যাডামের সবুজ কালির বল পয়েন্ট দরকার। এখন আমি সবুজ কালির বল পয়েন্ট কোথায় পাব কে জানে। নেত্রকোনা ছাড়া পাওয়া যাবে না।
নেত্রকোনা যাবেন?
এখানে না পেলে যাব।
আমি পাপিয়া ম্যাডাম হলে আপনাকে একটা জিনিস দিতে বলতাম।
জিনিসটা কী?
ফুলের মালার মত একটা জোনাকি পোকার মালা। মালা গলায় দিয়ে বসে থাকতাম—মালা জ্বলতো নিভতো।
সোহরাব চাচা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর গলায় বললেন, আচ্ছা দেখি কী করা যায়। মৌমাছির মোম জোগাড় করতে পারলে জোনাকির মালা বানানো যাবে।
আমি বললাম, আমি ঠাট্টা করছিলাম চাচা। আপনাকে জোনাকির মালা বানাতে হবে না। আপনি ভারী বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বালতিটা রাখুন তারপর কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে গল্প করুন।
সোহরাব চাচা বালতি নামিয়ে রাখলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, বল কী গল্প শুনতে চাও।
তাঁর ভাবটা এ রকম যে–… আমি যে গল্পই শুনতে চাই, তিনি সেই গল্পের রেকর্ড বাজিয়ে দেবেন।
মহিলা পীরের গল্প বলুন।
সোহরাব চাচা বিস্মিত হয়ে বললেন, মহিলা পীরটা কে?
এই অঞ্চলে একজনের সন্ধান পাওয়া গেছে যে নিমিষের মধ্যে মানুষের ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান বলে দিতে পারে।
ও আচ্ছা–হাফিজ আলির বৌ এর কথা বলছ?
বৌটাকে আপনি দেখেছেন?
না তাকে দেখি নি। হাফিজ আলিকে দেখেছি। সকালবেলা সে ছিলতো। কাঠ ফাড়াই করে দিল। ফাকিবাজের শেষ। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে সারাদিনের জন্যে নিয়েছি। দুপুরের পর থেকে নেই।
তার বৌ যে ভবিষ্যৎ বলতে পারে এটা কি সত্যি!
আরে দূর দূর। গ্রামাঞ্চলে প্রায়ই এই জাতীয় খবর শুনবে। কারো এই ক্ষমতা, কারো সেই ক্ষমতা। সব বোগাস। আর মানুষের স্বভাব এরকম যে সে আসল জিনিস বিশ্বাস করে না। বোগাস জিনিস বিশ্বাস করে।
চাচা ঐ মহিলার কাছে কি আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?
কেন?
গ্রামের অল্পবয়েসী একটা মেয়ে কোন কৌশলে মানুষকে ধোকা দেয় এটা আমার দেখার শখ?
সোহরাব চাচা বালতি হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন–তুমি তো ভাল পাগলী আছ। বারান্দায় মশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকো না। জংলি মশা। কামড় খেয়ে ম্যালেরিয়া ফ্যালেরিয়া বাধাবে। ঘরে চলে যাও। ঘরে ঘরে মসকুইটো কয়েল জ্বালিয়ে দিয়েছি।
