আপনি মানুষকে সান্ত্বনা দিতে পারেন না। তাই না?
জ্বি না।
বাবা আপনাকে খুব পছন্দ করতেন, উনাকে একবার শেষ দেখার ইচ্ছাও আপনার হয় নি?
জ্বি না। জীবিত অবস্থায় তাকে দেখেছি সেই স্মৃতিই আমি রাখতে চাই। মৃত মুখের স্মৃতি রাখতে চাই না।
এটা অবশ্য ভালোই বলেছেন। বাবার জীবনী লেখার কাগজগুলো কি এনেছেন?
জ্বি। ফাইলে সব গোছানো আছে। কিছু বানান ভুল থাকতে পারে। বাংলা বানানে আমি খুব কাঁচা।
এখানে ক’পৃষ্ঠা আছে?
পঞ্চাশ পৃষ্ঠার মতো। স্যার যখন যা বলেছেন আমি লিখেছি। সাজাই নি। আপনি যদি বলেন–সাজিয়ে দেব।
চিত্ৰলেখা হাসছে। হাসান বুঝতে পারছে না মেয়েটার হাসির কারণ কী। বাবার এই মেয়ে সামলে উঠেছে। সামলে না। উঠলেও তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই তার জীবনের ওপর এত বড় একটা ঝড় গেছে।
হাসান সাহেব।
জ্বি।
এই লেখাগুলো আপনি আমার সামনে বসে কুটি কুটি করে ছিঁড়ুন।
কী বলছেন বুঝতে পারছি না।
চিত্ৰলেখা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বাবা নিজেই আমাকে বলে গেছেন কাগজগুলো যেন ছিঁড়ে ফেলা হয়। আপনাকে যা বলা হয়েছে–তা ঠিক না। ভুল বলা হযেছে। উইসফুল থিংকিঙের মতো উইসফুল পাস্ট বলে এটা ব্যাপার আছে। বাবা তাই করেছেন।
ও আচ্ছা।
তার বড় বোন পুষ্পের কথা আছে না? যিনি হঠাৎ মারা গেলেন। তিনি হঠাৎ মারা যান নি। বিষ খেয়েছিলেন। বিষ খাওয়া ছাড়া তার উপায়ও ছিল না। এই তরুণী মেয়েটিকে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্যে কুৎসিত নোংরামির ভেতরে দিয়ে যেতে হয়েছিল। বাবার উচিত ছিল তার নিজের সংগ্রামের গল্প বলা। কী করে তিনি ধাপে ধাপে এতদূর উঠেছেন। এত শক্তি পেয়েছেন কোথায়? বাবা যে স্কুলে পড়তেন সেই স্কুলের একজন শিক্ষক নজিবুর রহমান তাকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। নিজে দরিদ্র মানুষ হয়েও বাবাকে কলেজে পড়ার খরচ দিয়েছেন। ইউনিভারসিটিতে ভর্তি করিয়েছেন। এই অসাধারণ মানুষটির জন্যে বাবা কিছুই করেন নি। তিনি শেষ জীবনে খুব কষ্টে পড়েছিলেন, বাবা তাকে দেখতে পর্যন্ত যান নি।
চিত্ৰলেখা একটু থামতেই হাসান বলল, এইসব কথা বলতে আপনার বোধহয় খারাপ লাগছে। প্ৰসঙ্গটা থাক।
আমার বলতে খারাপ লাগছে না। বরং ভালো লাগছে। আমি মনে হয় বাবাকে একটু একটু বুঝতে পারছি। তার চরিত্রের একটা অদ্ভুত দিক কি জানেন? জীবনে বড় হবার জন্যে তিনি যাদের সাহায্য নিয়েছেন পরবর্তী সময়ে তাদের পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছেন। আবার কারো কারো প্ৰতি অকারণ মমতা পোষণ করেছেন। যেমন ধরুন আপনি। কারোর কথায় বা কারোর সুপারিশে বাবা কাউকে চাকরি দিয়েছেন বা চাকরির যোগাড় করেছেন এমন নজির নেই। কিন্তু আপনার ব্যাপারে ভিন্ন ব্যবস্থা হলো। তাৎক্ষণিকভাবে বাবা সব ঠিকঠাক করলেন। আপনার বন্ধু নিশ্চয়ই খুব খুশি?
জ্বি খুবই খুশি।
উনি কি সিঙ্গাপুর চলে গিয়েছেন?
জ্বি।
আপনার প্রতি নিশ্চয়ই তিনি খুব কৃতজ্ঞ। তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভঙ্গিটা কী একটু বলুন তো শুনি। তিনি কী করলেন? আপনাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন?
ও আমার ভূমিকাটা জানে না। ওকে কিছু বলি নি।
কিছুই বলেন নি?
জ্বি না।
বলেন নি কেন?
বলতে ইচ্ছা করে নি।
চিত্ৰলেখা তাকিয়ে আছে। তার চোখে কৌতুক ঝিলমিল করছে। মনে হচ্ছে হাসানের এই ব্যাপারটায় সে খুব মজা পাচ্ছে।
হাসান সাহেব।
জ্বি।
লোকচরিত্র বোঝার ব্যাপারে বাবার ক্ষমতা ছিল অসীম। আমার ধারণা আপনাকে উনি ঠিকই বুঝেছিলেন। আপনি কি জানেন বাবা আপনার পেছনে স্পাই লাগিয়ে রেখেছিলেন?
কী বললেন?
চমকে উঠবেন না। এটাও বাবার পুরনো স্বভাব। কারো সম্পর্কে কিছু জানতে হলে তিনি লোক লাগিয়ে দিতেন। আপনার ওপর বিরাট একটা ফাইল আছে। আপনি কোথায় যান, কী করেন মোটামুটি সবই সেই ফাইলে আছে।
হাসান হতভম্ব গলায় বলল, ও।
তিতলী নামের একটা মেয়ের সঙ্গে আপনার খুব ভাব ছিল তাই না?
জ্বি।
উনাকে নিয়ে আপনি মাঝে মধ্যে বুড়িগঙ্গায় নৌকায় করে ঘুরতেন।
এইসব কি ফাইলে আছে?
জ্বি।
আপনার এক ভাই রকিব সম্পর্কে অনেক কিছু আছে।
কী আছে?
থাক আপনার না জানলেও চলবে। আপনি বরং তিতলীর কথা বলুন। উনার সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়।
জ্বি না।
দেখা করতে ইচ্ছে করে না?
জ্বি না।
ভুল কথা বলছেন কেন? আপনি তো মাঝে মাঝেই তিতলীদের বাড়ির সামনে রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করেন।
ফাইলে লেখা?
জ্বি। ভুল লেখা?
জ্বি না, ভুল লেখা না।
আপনি তো এখনো বুড়িগঙ্গায় নৌকায় চড়ে একা একা ঘোরেন। তাই না?
জ্বি।
আপনার কি মনে হয় না–আপনার কর্মকাণ্ড অস্বাভাবিক।
হতে পারে।
আপনার সঙ্গে অনেকক্ষণ বকবক করলাম। কিছু মনে করবেন না। আসলে কথা বলার কেউ নেই। বাবার সব দায়িত্ব এসে পড়েছে আমার হাতে। সামাল দিতে পাচ্ছি। না। আপনার মতো একটা জীবন আমার হলে মন্দ হতো না। কাজকর্ম নেই। ঘুরে বেড়ানো–হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের বাসার সামনে হাঁটাহাঁটি। বিষন্ন মনে বুড়িগঙ্গায় নৌকা ভ্ৰমণ।
চিত্ৰলেখা কিশোরীদের মতো হাসছে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, সরি। ঠাট্টা করলাম, কিছু মনে করবেন না।
হাসান বলল, আজ উঠি?
আচ্ছা। ভালো কথা, হাসান সাহেব আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে বাবা আপনাকে ঘণ্টা হিসেবে টাকা দিতেন না?
জ্বি।
আমিও আপনাকে ঘণ্টা হিসেবে টাকা দেব। মাঝে মাঝে এসে আমার বকবকানি শুনে যাবেন।
