হাসান কিছু বলল না। চিত্ৰলেখা বলল, এখান থেকে আপনি কোথায় যাবেন?
বুঝতে পারছি না। সুমিদের বাসায় যেতে পারি।
আপনার ছাত্রী?
জ্বি।
চিত্ৰলেখা হাসতে হাসতে বলল–এখন তো সে আপনার ছাত্রী না। এক সময় ছিল। আচ্ছা যান শুধু শুধু আপনাকে দেরি করিয়ে দিচ্ছি…। আসুন আপনাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দি।
চিত্ৰলেখা হাসানের সঙ্গে নিঃশব্দে হাঁটছে। দারোয়ান দুজন চট করে দাঁড়িয়ে মিলিটারি কায়দায় স্যালুট দিল।
হাসান বলল, যাই।
চিত্ৰলেখা জবাব দিল না। তার বাবা হিশামুদ্দিন সাহেব এই ছেলেটিকে এত পছন্দ কেন করতেন তা সে বোঝার চেষ্টা করছে। হিশামুদ্দিন সাহেব হাসানের ফাইল এত যত্ন করে কেন তৈরি করেছেন। তার মাথায় অন্য কোনো পরিকল্পনা কি ছিল?
বেল টিপতেই সুমি দরজা খুলে দিল। সহজ গলায় বলল, স্যার কেমন আছেন? যেন সে স্যারের বেল টেপার জন্যেই বসার ঘরে চুপচাপ বসেছিল।
হাসান বলল, কেমন আছ সুমি?
সুমি বলল, ভালো। স্ট্রং ডায়রিয়া হয়েছিল— এখন ভালো।
স্ট্রং ডায়রিয়ার জন্যে কি তোমাকে এমন রোগা রোগ লাগছে?
না। বাবা চলে গেছেন তো খুব মন খারাপ। এই জন্যেই রোগা রোগ লাগছে। মন খারাপ হলে মানুষকে রোগা রোগী লাগে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ তাই। আপনারও নিশ্চয়ই মন খারাপ। আপনাকেও খুব রোগা রোগা লাগছে।
আমার মন অবশ্যি একটু খারাপ। তুমি ঠিকই ধরেছ।
স্যার বসুন। কী খাবেন বলুন, চা না কোক?
বাসায় আর কেউ নেই?
কাজের মেয়েটা আছে–রহমত চাচা আছে। মা গিয়েছে মেজোখালার বাসায়। আমারও যাবার কথা ছিল।
যাও নি কেন?
আপনি আসবেন তো–এই জন্যে যাই নি।
হাসান হেসে ফেলল। সুমির এই ব্যাপারটা খুব মজার। এমনভাবে কথা বলে যেন সে ভবিষ্যৎ চোখের সামনে দেখছে। দু’মাস পর আজ হাসান এসেছে। তাও আসার কথা ছিল না। বেবিট্যাক্সি দিয়ে যাচ্ছিল হঠাৎ বেবিট্যাক্সির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল। বেবিট্যাক্সিওয়ালা স্ট্রার্টার হাতল ধরে অনেক টানাটানি করে হাল ছেড়ে দিল। হাসান বেবিট্যাক্সি থেকে নেমে দেখে সুমিদের বাসা দুটো বাড়ির পরেই। বাসার আশপাশেই যখন আসা তখন সুমিকে দেখে যাওয়া যাক। এই ভেবে সুমিদের বাসায় আসা। অথচ মেয়েট ভবিষ্যদ্বক্তা জেন ডিক্সনের মতো কথা বলছে।
স্যার।
হুঁ।
আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না। তাই না?
কে বললা করছি না। করছি তো।
উঁহুঁ। আপনি বিশ্বাস করছেন না। আপনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনি মনে মনে হাসছেন। কেউ যখন মনে মনে হাসে তখন তার চোখ হাসতে থাকে। মুখ থাকে খুব গম্ভীর।
হ্যাঁ। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনি আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করবেন।
সেটা কীভাবে?
ফুলিকে আমি বলব–আমার পড়ার টেবিলে ওপর থেকে নীল ভেলভেটের ডায়রিটা আনতে। ওই ডায়েরিতে আজকের তারিখে আমি লিখে রেখেছি–আজ হাসান স্যার আমাদের বাসায় আসবেন।
বল কী?
ডায়েরিটা আমি নিজেই আনতে পারতাম। আমি আনলে আপনি ভাবতেন আমি আপনার সামনে থেকে চলে গিয়ে খুব তাড়াতাড়ি ডায়েরিতে এটা লিখে নিয়ে এসেছি। এই জন্যেই ফুলিকে দিয়ে আনাব।
সুমি গম্ভীরমুখে বসে আছে। পা দোলাচ্ছে। হাসান মনে মনে বলল, মেয়েটা খুব অন্যরকম। বিরাট একটা বাড়িতে এক এক বড় হয়ে মেয়েটা অন্যরকম হয়ে গেছে। যতটুকু ভালবাসা তার প্রয়োজন তার মা একা তাকে ততটুকু ভালবাসা দিতে পারছে না। মেয়েটা নিঃসঙ্গ। সঙ্গপ্রিয় মানুষের জন্যে নিঃসঙ্গতার শাস্তি কঠিন শাস্তি। এই শাস্তি মানুষকে বদলে দেয়।
স্যার।
বল।
আমার বাবার ধারণা আমার ই.এস.পি. ক্ষমতা আছে। ই.এস.পি, হচ্ছে এক্সট্রা সেনাসরি পারসেপশন।
তুমি এই কঠিন বাক্যটা জান!
হ্যাঁ জানি। বাবা আমার সম্পর্কে কী বলে জানেন?
না।
জানতে চান?
হ্যাঁ জানতে চাই।
বাবা বলেন–আমি ইচ্ছা করলে মানুষের ভবিষ্যৎ বলে লক্ষ লক্ষ টাকা কামাতে পারি। বাবার কথা কিন্তু ঠিক না। আমি সবার ভবিষ্যৎ বলতে পারি না। যাদের খুব পছন্দ করি। শুধু তাদেরটা বলতে পারি।
আমাকে কি তুমি খুব পছন্দ করা?
হ্যাঁ।
কেন?
সেটা আমি আপনাকে বলব না।
ফুলিকে ডেকে বল ডায়েরিটা আনতে। দেখি ডায়েরিতে তুমি কী লিখেছি?
হাসান ডায়েরি দেখে সত্যিকার অর্থে একটা ধাক্কার মতো খেল। ডায়েরিতে গোটা গোটা হরফে লেখা–আজ হাসান স্যার আমাকে দেখতে আসবেন। তবে আমার জন্যে কিছু আনবেন না। খালি হাতে আসবেন।
হাসান সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, তোমার তো দেখি আসলেই ই.এস.পি, আছে। তুমি আমার সম্পর্কে আর কী বলতে পার?
অনেক কিছু বলতে পারি। আপনি কাকে বিয়ে করবেন—তাও বলতে পারি।
বলতে পারলে বল।
উঁহুঁ আমি বলব না।
বলবে না কেন?
শুধু শুধু কেন বলব? স্যার আপনি চা খাবেন, না কোক খাবেন?
চা খাব।
আগে একটু কোক খেয়ে নিন না। তারপর চা খাবেন। আমি কোক দিয়ে খুব একটা মজার ড্রিংকস বানাতে পারি। বাবা শিখিয়েছেন। কী করতে হয় জানেন-কোকের গ্লাসে দুটা কালো কাঁচা মরিচ মাঝামাঝি চিরে দিয়ে দিতে হয়। তার সঙ্গে এক চামচ লেবুর রস এবং সামান্য বিট লবণ দিতে হয়। তারপর কোকের গ্লাসটা ডিপ ফ্রিজে দিয়ে খুব ঠাণ্ডা করতে হয়। সার্ভ করার আগে সামান্য গোলমরিচের গুড়া গ্লাসে দিয়ে দিতে হয়। না দিলেও চলে। আমি দেই নি। বাসায় গোলমরিচের গুড়া ছিল না, এই জন্যে দেইনি।
তুমি কি ড্রিংকস বানিয়ে রেখেছ?
