তিতলীকে না জানিয়ে ভদ্রলোককে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এলে হয়। সহজ স্বাভাবিকভাবে সবাই মিলে কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করা হবে। ক্ষতি কী?
তিতলী! তিতলী!
তিতলী এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না। শওকত বলল, আচ্ছা যাও। এমনি ডেকেছিলাম। ও আচ্ছা শোন, নাদিয়ার ইন্টারভ্যুটা পড়েছ?
না।
পড় নি কেন? নাকি প্ৰতিজ্ঞা করেছ। আমার কেনা খবরের কাগজও পড়বে না?
আমি কোনো প্ৰতিজ্ঞা করি নি।
পড়ে দেখ। ভালো লাগবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তোমার প্রিয় মানুষ কে?
সে তোমার নাম বলেছে।
ও আচ্ছা।
তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে তিতলী!
থ্যাংক য়্যু।
তুমি কি আমার ছোট্ট একটা অনুরোধ রাখবে? খুব ছোট্ট অনুরোধ?
কী অনুরোধ?
হাসলে তোমাকে কেমন দেখায় আমি জানি না। একটু হাস আমি দেখি। এত বড় খুশির একটা খবর পেয়েছ। এমনিতেই তো হাসা উচিত।
উচিত কাজ কি মানুষ সব সময় করতে পার?
না, উচিত কাজ মানুষ সব সময় করতে পারে না। মানুষ বরং অনুচিত কাজটাই সব সময় করে। আমাকে বিয়ে করাটা ছিল খুবই অনুচিত কাজ সেই কাজটা তুমি করেছি। বিয়ের পর পুরনো সমস্যা ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক হওয়াটা ছিল উচিত কাজতুমি করছি উল্টোটা। দাঁড়িয়ে আছ কেন? বাস কথা বলি।
তিতলী বসল।
শওকত ক্লান্ত গলায় বলল, তুমি আমাকে একটা সত্যি কথা বল তো। তুমি কি আমার কাছ থেকে মুক্তি চাও? চুপ করে থেকে না, বল হ্যাঁ বা না।
মুক্তি চাইলে পাব?
তিতলী তাকিয়ে আছে। তার চোখে পলক পড়ছে না। শওকত চুপ করে রইল। তিতলীর প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না। সম্ভবত জবাব তার জানা নেই।
ইংরেজিতে লেখা একটা ছোট্ট চিঠি
ইংরেজিতে লেখা একটা ছোট্ট চিঠি। যার বঙ্গানুবাদ মোটামুটি এ রকম–
প্রিয় হাসান সাহেব,
আশা করি ভালো আছেন। আমার বাবা গত মাসের ৯ তারিখে মাইয়োকাড্রিয়েল ইনফেকশনে মারা গেছেন। তাঁর জীবনের অংশবিশেষ যা আপনি লিখেছেন তা আমাকে দিয়ে গেলে বাধিত হব। আপনি আপনার জনৈক বন্ধুর জন্যে বাবার কাছে চাকুরি চেয়েছিলেন। তিনি সে ব্যবস্থা করে গেছেন। আশা করি ইতিমধ্যে আপনার বন্ধু সে খবর জানেন। আপনি ভালো আছেন তো?
বিনীতা
চিত্রলেখা
অফিস অফিস গন্ধওয়ালা চিঠি। অফিস বস ডিকটেট করেছেন–পি.এ. ডিকটেশন নিয়ে চিঠি টাইপ করেছে। ফাইনাল কপি বাস পড়েছেন, দু-একটা বানান ঠিক করে নাম সই করেছেন। চিঠি চলে গেছে ডিসপ্যাঁচ সেকশনে। চিঠিতে নাম্বার বসিয়ে ডিসপাঁচ ক্লার্ক চিঠি পোষ্ট করে দিয়েছে। চিঠিতে আন্তরিক অংশ হচ্ছে গোটা গোটা অক্ষরে বাং লেখা আপনি ভালো আছেন তো? এটাকেও আন্তরিক ধরার কোনো কারণ নেই। অফিসিয়েল চিঠিকে ব্যক্তিগত ‘ফ্লেভার’ দেয়ার এটা একটা টেকনিক।
হাসান চিঠি পেয়েছে বিকেলে। সন্ধ্যা মিলাবার পরপরই ফাইল হাতে হিশামুদ্দিন সাহেবের বাড়ির গেটের সামনে উপস্থিত হলো। গেটের দুজন দারোয়ানই তাকে খুব ভালো করে চেনে–তারপূরেও তারা এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন তাকে তারা এই প্রথম দেখেছে। হাসান বলল, ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করব। উনি আছেন না?
দারোয়ানের একজন গম্ভীর গলায় বলল, ম্যাডাম বাড়িতে কারো সঙ্গে দেখা করেন না। আপনি অফিসে যাবেন।
দারোয়ানরা দর্শনপ্রাথীদের আটকে দিতে পারলে খুশি হয়। হাসান লক্ষ করল দারোয়ান দুজনেই মুখের তৃপ্তির ভাব।
উনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ভেতরে খবর দিয়ে দেখুন। ইন্টারকম তো আছে।
আমাদের ওপর অর্ডার আছে কাউকে ঢুকতে না দেয়ার।
ও আচ্ছা। আমার কাছে ম্যাডামের কিছু জরুরি কাগজপত্র ছিল।
দারোয়ানদের একজন নিতান্ত অনিচ্ছায় ইন্টারকমের দিকে এগোচ্ছে। তার যেতে আসতে প্রচুর সময় লাগবে–হাসান সিগারেট ধরাল। সে অবাক হয়ে লক্ষ করল হিশামুদ্দিন সাহেবের সঙ্গে কথা বলার আগে বুকের ওপর সে যেমন চাপ অনুভব করত এখনো তাই করছে।
আপনি যান। সিগারেট ফেলে দিয়ে যান।
হাসান সিগারেট ফেলল। সিগারেট হাতে কাউকে ঢুকতে দেয়া যাবে না–এমন নির্দেশ কি আছে? দারোয়ানরা ক্ষমতাবানদের যেমন সম্মান দেখাতে ভালোবাসে তেমনি ক্ষমতাহীনদের অপমান করতেও ভালবাসে। গেটের সামনে চিত্ৰলেখা দাঁড়িয়ে থাকলে সে নিশ্চয়ই বলত না–সিগারেট ফেলে দিয়ে আসুন।
হাসান বসার ঘরে চুপচাপ বসে আছে। কতক্ষণ হয়েছে? তার হাতে ঘড়ি নেই। বসার ঘরেও ঘড়ি নেই। সময় কতটা পার হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না, মনে হয়। অনেকক্ষণ হয়েছে। একা একা বসে থাকতে অদ্ভুত লাগছে। নীরব একটা বাড়ি। শব্দ নেই, হইচই নেই। টিভি চলছে না, কেউ হাঁটাহাঁটি করছে না। এ রকম শব্দহীন ঘরে মানুষ বাস করে কী করে। বাড়িতে নানান রকম শব্দ হবে–শিশুরা চিৎকার করবে–দাপাদাপি করবে। তাদের হাসি এবং কান্নার শব্দ ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাবে…
সরি হাসান সাহেব দেরি করে ফেলেছি। দেরিটা ইচ্ছাকৃত না। নিন চা নিন।
চিত্ৰলেখা নিজেই হাতে করে চায়ের কাপ এনেছে। তার এই ভদ্রতা দীর্ঘ অপেক্ষা এবং গেটের সামনের অপমান ভুলে যাওয়া যায়।
আপনি এসেছেন শোনার পর হট শাওয়ার নিতে বাথরুমে ঢুকেছিলাম। সারা দিন নানান জায়গায় ছোটাছুটি করেছি। গা ঘেমে ছিল। একা একা নিশ্চয়ই খুব বোর হচ্ছিলেন?
বোর হচ্ছিলাম না।
বাবার মৃত্যুর খবর জানতেন?
উনি যেদিন মারা গিয়েছিলেন আমি সেদিনই এসেছিলাম। উনার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আসিনি–এমনিতেই এসেছিলাম। বাড়ির সামনে প্রচুর গাড়ি দেখলাম। খবর শুনলাম–তারপর ভাবলাম আমার কিছু করার নেই। চলে গিয়েছি।
