নাদিয়ার ঘর থেকে আবার হাসির শব্দ আসছে। মতিনউদ্দিন উঁচু গলায় বললেন, তোমরা একটু আস্তে হাসাহাসি কর, মানুষকে ঘুমোতে দেবে না।
হাসির শব্দ থেমে গেল। মতিন সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে গেল। হাসাহসির করছিল করত। তিনি কেন ধমক দিলেন। সারাজীবন তিনি কি শুধু ভুলই করে যাবেন! তার চোখে পানি এসে গেল। কেউ সেই পানি দেখল না।
শওকতের অভ্যাস হচ্ছে ভোরবেলা দুটা খবরের কাগজ নিয়ে চা খেতে বাসা। নাশতাটা জরুরি না, খবরের কাগজ পড়াটা জরুরি। তিতলী সেই সময় তার সামনেই থাকে। তবে সে নাশতা খায় না। সঙ্গ দেবার জন্যে যে বসে তাও না। নিজ থেকে একটি কথাও বলে না। শওকত কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়। সেই জবাবও অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। মানুষের অভ্যস্ত ক্ষমতা অসাধারণ। শওকত মনে হচ্ছে এই ব্যাপারটায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
আজ শওকত খবরের কাগজ তিতলীর দিকে বাড়িয়ে দিল–বিস্মিত গলায় বলল, নাদিয়ার ছবি ছাপা হয়েছে।
তিতলী কিছু বলল না, সে তার চায়ের কাপে চা ঢালছে। তাকে কোনো প্রশ্ন করা হয় নি, কাজেই জবাব দেবার কিছু নেই।
শওকত বলল, কী ব্যাপার, তুমি এই খবর পেয়েছ?
পয়েছি।
কখন পেয়েছ?
কাল রাতে।
রাতে মানে ক’টার সময়?
এগারটার সময়। নাদিয়া টেলিফোন করেছিল।
আমি তো তখন বাড়িতেই ছিলাম। আমাকে কিছু বল নি কেন?
বলার কী আছে?
এত বড় একটা খবর তুমি আমাকে জানাবে না?
এখন তো জানলেই।
তার মানে কি এই দাঁড়াচ্ছে–তুমি নিজ থেকে আমাকে কিছু বলবে না?
তিতলী জবাব দিল না, চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। শওকত বিরক্ত মুখে বলল, তুমি যা করছি তা যে ছেলেমানুষ তা কি বুঝতে পারছি?
তিতলী এই প্রশ্নেরও জবাব দিল না। শওকত ঠাণ্ডা গলায় বলল, তুমি যা করছ তা হচ্ছে হাস্যকর ছেলেমানুষ। যখন ছেলেমানুষিটা শুরু করেছিলে আমি তোমাকে বাধা দেই নি। আমার ধারণা ছিল বাধা দিলে এটা আরো বাড়বে। আমি ভেবেছি সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন দেখছি হচ্ছে না।
এখন কী করবে?
শোন তিতলী! আমার ধৈর্য অপরিসীম। আমি তোমাকে আরো সময় দেব। দু’বছর, তিন বছর, চার বছর…কোনো অসুবিধা নেই। আমি দেখতে চাই এক সময় তুমি তোমার ভুল বুঝতে পেরেছ।
যদি কোনোদিনই ভুল বুঝতে না পারি?
তুমি তো বোকা মেয়ে না। বুদ্ধিমতী মেয়ে–আমি নিশ্চিত তুমি ভুল বুঝতে পারবে। তখন আমরা জীবন শুরু করব। সে জীবন অবশ্যই আনন্দময় হবে।
আনন্দময় হলেই তো ভালো।
ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে তোমার কি এর মধ্যে দেখা হয়েছে?
না।
টেলিফোনে কথা হয়েছে?
না।
শোন তিতলী আমি চাচ্ছি ভদ্রলোকের সঙ্গে তোমার দেখা হোক, কথা হোক।
কেন চাচ্ছ?
আমার ধারণা ভদ্রলোকের সঙ্গে তোমার যদি দু-একবার দেখা হয়–তুমি তোমার ভুল দ্রুত বুঝতে পারবে। এক কাজ করা যাক-আমি ভদ্রলোককে বাসায় একদিন খেতে বলি।
কোনো প্ৰয়োজন নেই।
তোমার অস্বস্তি বোধ করার কিছু নেই। আমি তার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করবো।
তিতলী চুপ করে আছে। তার দৃষ্টি চায়ের কাপের দিকে।
শওকত দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। তিতলী ঠিক তার সামনে বসা। নতুন বউরা শ্বশুরবাড়িতে এসে শুরুর কিছু দিন ঘোমটা দিয়ে থাকে। তার মাথায়ও ঘোমটা। লালপাড়ের কালো শাড়িতে তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। দেবী প্রতিমার মতো মেয়েটি চোখমুখ শক্ত করে বসে আছে। শওকত নিশ্চিত জানে এই শক্তমুখ একদিন কোমল হবে। সেই একদিনটা কবে এটাই সে জানে না।
তিতলী!
জ্বি।
আমি আশপাশে থাকলে তোমার কি অসহ্য লাগে?
না।
আমি আশপাশে থাকলে তোমার মুখ শক্ত হয়ে থাকে। এই জন্যেই জিজ্ঞেস করছি। নাদিয়াকে কনগ্রাচুলেট করতে যাবে না?
যাব।
আমি সঙ্গে গেলে কোনো অসুবিধা আছে?
অসুবিধা নেই–তবে আমি একাই যেতে চাই।
ব্যাপারটা খুব অশোভন হবে না? তুমি আমার সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করছ, সেটা ལ་ལས་ཀ་༢ বাড়ির কেউ জানে না। সবাই জানে আমরা খুব সুখে আছি। আনন্দে
সেটা জানাই তো ভালো।
তাদের জন্যে ভালো তো বটেই। তাদের সেই ভালোতে যেন খুঁত না থাকে সেই চেষ্টা তো আমাদের করা উচিত। তোমার পক্ষ থেকে কিছু অভিনয় দরকার। কাজেই হাসিমুখে আমার সঙ্গে চল।
আচ্ছা।
আরেকটা কথা। তুমি তো জানই আমি পি.এইচডি করতে বাইরে যাচ্ছি। তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে?
সেটা তোমার ইচ্ছা।
অর্থাৎ তোমার নিজের কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা নেই।
না।
সেই ক্ষেত্রে আমার মনে হয় তোমার না যাওয়াই ভালো। এখানে থাকতে পার বা ইচ্ছে করলে তোমার মা-বাবার সঙ্গে থাকতে পার।
আমি এখানেই থাকব।
বেশ তো থাকবে। যদি এর মধ্যে তোমার ইচ্ছা করে আমার কাছে যেতে-চিঠি দিলেই আমি টিকিট পাঠাব। তুমি চলে আসবে।
আচ্ছা।
তোমার সব কথাই তো এ পর্যন্ত শুনে আসছি–এখন তুমি কি আমার একটা কথা শুনবে? কথাটা হচ্ছে–চল আমার সঙ্গে দুজন মিলে কোনো সুন্দর জায়গা থেকে ঘুরে আসি। যেমন ধর নেপাল। সুন্দর দৃশ্যের পাশে থাকলে মন সুন্দর হয়। পুরনো অসুন্দর ধুয়ে মুছে যায়। যাবে?
তুমি বললে যাব।
ভেরি গুড।
তোমার নাশতা খাওয়া তো হয়েছে। আমি কি এখন উঠতে পারি?
শওকত ক্লান্ত গলায় বলল, পার। তার মেজাজ খুবই খারাপ হয়েছে। সে অনেক চেষ্টা করেও মেজাজ ঠিক রাখতে পারছে না। মনে হচ্ছে সে সমস্যাটা সামলাতে পারছে। না। ভবিষ্যতেও পারবে কি না বুঝতে পারছে না।
হাসান নামের ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে তার কি দেখা করা উচিত? তার সমস্যা মেটানোর জন্য ভদ্রলোকের সাহায্য প্রার্থনা করাটা কি ঠিক হবে? ভদ্রলোক কি সাহায্য করবেন? মনে হয় করবেন। যে-কোনো বিবেকবান মানুষেরই সাহায্য করা উচিত।
