স্যার!
হুঁ।
পান এনেছি স্যার।
পান খাব না নিয়ে যাও। আরেকটা পাতলা চাদর গায়ে দাও। শীত বেশি লাগছে।
জ্বি আচ্ছা স্যার।
তোমার দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। তুমি চলে যাও।
রহমতউল্লাহ চলে গেল না। ঘরে থেকে বের হয়ে গেল ঠিকই। তবে দাড়িয়ে রইল দরজার ওপাশে। মনে হয় তার প্রতি চিত্ৰলেখার এ ধরনের নির্দেশ আছে।
হিশামুদ্দিন চোখ বন্ধ করে আছেন। পানিতে ডুবে যারা মারা যায় সমগ্র জীবনের ছবি তাদের চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যায়। খাটে শুয়ে যাদের মৃত্যু তাদের চোখের ওপর দিয়ে কিছু কি ভাসে? যাপিত জীবনের খণ্ডচিত্ৰ?
রহমতউল্লাহ আবার ঘরে ঢুকেছে৷ তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে লজ্জিত এবং কিঞ্চিত ভীত।
কিছু বলবে?
হাসান সাহেবকে খবর দেয়া হয়েছে স্যার।
ভালো। ভেরি গুড। সে এলে তাকে সরাসরি এখানে নিয়ে আসবে।
জ্বি আচ্ছা।
আপা এই ওষুধ দুটা দিয়ে গেছেন। দশটার সময় আপনাকে খাওয়াতে বলেছেন।
আচ্ছা দাও।
হিশামুদিন ট্যাবলেট দুটা গিলে ফেললেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ঝিমুনির মতো এসে গেল। তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন।
হাসান অনেকক্ষণ থেকে বসে আছে। তাকে চা-স্যান্ডউইচ দেয়া হয়েছে। বলা যেতে পারে খানিকটা আদর-যত্ন করা হচ্ছে। অন্য সময় এরচে’ দীর্ঘ সময় বসে থাকলেও চাটা কিছুই দেয়া হয় না। হিশামুদ্দিন সাহেব খুব অসুস্থ এই খবরটা তাকে দেয়া হয়েছে। অসুস্থতার ফলে তাকে এখানে ডেকে আনার কারণটা সে ধরতে পারছে না। গুরুতর অসুস্থ মানুষ লইয়ারদের সঙ্গে কথা বলতে চায়। বিষয়-সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা করে। কেউ কেউ মওলানা ডেকে এনে তওবা করেন। পরকালে নিৰ্ভয়ে যাবার ব্যবস্থা করেন। তবে তওবার ব্যাপারটা নিম্নবিত্তের মানুষদের ক্ষেত্রেই বেশি ঘটে। হিশামুদিন সাহেবদের মতো অকল্পনীয় বিত্তের মানুষরা তওবা করেন না।
হাসান সাহেব!
হাসান প্ৰায় লাফিয়ে উঠল। হিশামুদ্দিন সাহেবের মেয়ে চিত্ৰলেখা দরজা ধরে দুয়েছে। মেয়েটিকে আজ খুব বিষন্ন লাগছে। বাবার অসুখের ব্যাপারে সে হয়তো চিন্তিত।
ম্যাডাম স্নামালিকুম। আমাকে ম্যাডাম ডাকবেন না তো— শুনতে কুৎসিত লাগে। আমাকে নাম ধরে ডাকবেনা–চিত্ৰলেখা। কোনো সমস্যা নেই। চা খাওয়া হয়েছে?
জ্বি।
বাবা অসুস্থ শুনেছেন বোধহয়?
জ্বি।
অসুখ যতটা সহজ ভেবেছিলাম তত সহজ না। বেশ জটিল। আমি বেশ চিন্তিত বোধ করছি। ভালো কোনো ক্লিনিকে তাকে ট্রান্সফার করলে ভালো হত। আমি ক্লিনিক খুঁজে বেড়ালাম। কোনোটাই পছন্দ হচ্ছে না। ক্লিনিকে সুযোগ-সুবিধা কী আছে জানতে চাইলে ওরা বলে–এসি আছে, কালার টিভি আছে, ফ্রিজ আছে, ইন্টারকমের ব্যবস্থা আছে। চিকিৎসার ব্যবস্থা কী তা বলে না।
স্যারের কী হয়েছে?
ব্লাডপ্রেসার খুব ফ্লাকচুয়েট করছে। পালস ইরেগুলার। তার এখন দরকার কনসটেন্ট মনিটরিং।
কোনো হাসপাতালে কি ভর্তি করাবেন? ঢাকা মেডিকেল কলেজ বা পিজি?
এখনো বুঝতে পারছি না। আজ দিনটা দেখে আগামীকাল ডিসিশান নেব। আপনি আসুন। বাবার ঘুম ভেঙেছে তার সঙ্গে কথা বলুন।
উনি আমাকে কেন ডেকেছেন বলতে পারেন?
লাইফ ক্টোরি সম্ভবত বলবেন।
এখন কি উনার কথা বলা ঠিক হবে?
আমি তাতে কোনো অসুবিধা দেখছি না। কথা বলে তিনি যদি আনন্দ পান তাহলে কথা বলাই উচিত। উনি যে গুরুতর অসুস্থ তা আমি তাকে বুঝতে দিতে চাচ্ছি না। আমার কথা বুঝতে পারছেন তো?
জ্বি।
বাবা যে আপনাকে গল্প বলেন তার পেছনের কারণটা কি আপনি ধরতে পেরেছেন?
জ্বি না।
বাবা যা করছেন তা হচ্ছে এক ধরনের কনফেসন। খ্রিষ্টানরা যখন কোনো অপরাধ করে তখন তারা পাদ্রীদের কাছে কনফেসন করে। বাবা যা করছেন তা হচ্ছে এক ধরনের কনফেসন।
উনি তো কোনো অপরাধ করেন নি।
অপরাধ না করেও কেউ কেউ নিজেকে অপরাধী ভাবে। বাবার মা-বাবা, ভাইবোন হতদরিদ্র ছিলেন। অনেকেই মারা গেছেন বিনা চিকিৎসায়। যারা বেঁচে আছেন তাদের অবস্থা শোচনীয়। অথচ মাঝখান থেকে বাবা হয়ে গেলেন বিলিওনিয়ার। এই কারণেই তিনি হয়তো নিজেকে অপরাধী ভাবেন। মানুষ অতি বিচিত্ৰ প্ৰাণী হাসান সাহেব। কী, ঠিক বলছি না?
জ্বি।
আপনার কথাবার্তা দেখছি–জ্বি এবং জ্বি নাতে সীমাবদ্ধ। হড়বড় করে কথা বলা অভ্যাস করুন তো। হড়বড় করে যারা কথা বলে তাদের মন সব সময় প্রফুল্প থাকে। এটা হচ্ছে রিসেন্ট ফাইন্ডিং নিউজউইকে উঠেছে।
হাসান চুপ করে রইল। চিত্ৰলেখা বলল, বাবার অপরাধবোধের আরেকটা বড় কারণও আছে। তিনি তার আত্মীয়স্বজনদের কোনো সাহায্য করেন নি। কেউ কেউ সাহায্যের জন্যে এসেছিল তাদের দূর দূর করে তাড়িয়েছেন।
ও
বাবার অনেক কিছু আমি বুঝতে পারি না। এই ব্যাপারটিও পারি না।
বুঝতে বোধহয় চেষ্টাও করেন নি।
ঠিক বলেছেন, চেষ্টাও করি নি। আমার উচিত ছিল বাবার আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, আমি সেটাও করি নি। বাবা যেমন পৃথিবীতে একা আমিও একা। আমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে–কিন্তু আমার কথা বলার মানুষ নেই। এই যে আপনার সঙ্গে কথা বলছি–আমার ভালো লাগছে। কেন ভালো লাগছে বলুন তো?
বলতে পারছি না।
কারণ আপনি বাবার খুব পছন্দের মানুষ। কী করে বললাম বলুন তো?
বুঝতে পারছি না।
কাল রাতে খেতে বসে বাবা হঠাৎ বললেন, হাসানকে একদিন আমাদের সঙ্গে খেতে বলি। আমি বললাম, বেশ তো বল। উনি তৎক্ষণাৎ বললেন— না থাক। বাবার সমস্যা কী জানেন? তার সমস্যা হচ্ছে–তিনি যাদের পছন্দ করেন তাদের কখনো তা জানান না। তার পছন্দ এবং অপছন্দ দুটা ব্যাপারই খুব গোপন। আমি বোধহয় বকবক করে আপনার মাথা ধরিয়ে দিয়েছি। চলুন বাবার ঘরে যাই।
