একটু মনে হয় লাগছে।
গায়ে চাদর দিয়ে দেব?
না।
আমি রহমতউল্লাহকে তোমার নাশতা দিয়ে যেতে বলেছি।
কটা বাজে?
এখন বাজছে আটটা পঁয়ত্ৰিশ।
আজ এগারটার সময় একটা জরুরি অ্যাপায়েন্টমেন্ট আছে।
শুধু আজ না, আগামী এক সপ্তাহ তোমার কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। তুমি বিছানায় শুয়ে রিলাক্স করবে। গল্প করবে। বইটই পড়বে।
আজ এগারটায় যে অ্যাপিয়েন্টমেন্ট সেটা ক্যানসেল করা যাবে না।
সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করা যায় না। মৃত্যুর সঙ্গে যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সেটাকেও পেছনের ডেটে সরানোর জন্য আছি আমরা— ডাক্তাররা।
সেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট কিন্তু ক্যানসোল হয় না।
আজ হয় না একদিন হবে। মানুষ অমরত্বের কৌশল জেনে যাবে। এজিং প্রসেস—বৃদ্ধ হবার প্রক্রিয়াটা জানার চেষ্টা হচ্ছে–যেদিন মানুষ পুরোপুরি জেনে যাবে ব্যাপারটা সেদিনই দেখবে মৃত্যু জয় করার চেষ্টা শুরু হবে।
ভালো।
তিন হাজার সনের মানুষের অমর হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
হিশামুদ্দিন সহজ গলায় বললেন, তিন হাজার সনের মানুষ তাহলে খুব দুঃখী মানুষ। মৃত্যুর আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত।
চিত্ৰলেখা অবাক হয়ে বলল, মৃত্যুর আবার আনন্দ কী?
হিশামুদিন হাসিমুখে বললেন, আনন্দ তো মা আছেই। আমরা জানি একদিন আমরা মরে যাব এই জন্যেই পৃথিবীটাকে এত সুন্দর লাগে। যদি জানতাম আমাদের মৃত্যু নেই তাহলে পৃথিবীটা কখনো এত সুন্দর লাগত না।
তুমি ফিলোসফারদের মতো কথা বলছি বাবা।
আর বলব না। ক্ষিধে লেগেছে নাশতা দিতে বল। আর শোন দুধ সিরিয়েল খাব না। দুধ-চিড়া খাব। দুধ-চিড়াও না–দই-চিড়া। পানিতে ভিজিয়ে চিড়াটাকে নরম করে টক দই, সামান্য লবণ, কুচিকুচি করে আধটা কাচামরিচ. এটা হচ্ছে আমার বাবার খুবই প্রিয় খাবার।
তুমি যেভাবে বলছ আমারও খেয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে। এক কাজ করলে কেমন হয়। আগামীকাল আমরা এই নাশতাটা খাব–আজ আমার মতো খাও।
আচ্ছা।
আমি চলে যাচ্ছি, রহমতউল্লাহ ঠিক দশটার সময় দুটা ট্যাবলেট দেবে তুমি হাসিমুখে খেয়ে নেবে।
আচ্ছা হাসিমুখেই খাব।
হিশামুদ্দিন সাহেব নাশতা খেলেন। রহমতউল্লাহ তাকে খাটে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভীত চোখে তাকিয়ে আছে। সাধারণত তিনি তার নাশতা বা খাবার একা একা খান। কেউ পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে অস্বস্তি লাগে। আজো লাগছে। কিন্তু তিনি কিছু বলেন না।
রহমতউল্লাহ।
জ্বি স্যার।
কাল দই-চিড়া খাব।
জ্বি আচ্ছা স্যার।
দই-চিড়া আমার বাবার খুবই প্রিয় খাবার।
জ্বি আচ্ছা।
হিশামুদিনের ভুরু কঁচকে গেল। তিনি ঠিক কথা বলছেন না। দই-চিড়া তার বাবার প্রিয় খাবার না। গরিব মানুষদের কোনো প্রিয় খাবার থাকে না। খাদ্যদ্রব্য মাত্রই তাদের প্রিয়। তার বাবা যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন কিছু খেতে পারতেন না। তখন বলেছিলেন, দই-চিড়া দে। দই-চিড়া বলকারক, খেতেও ভালো। সেই দই-চিড়ার ব্যবস্থা হয় নি। তার বাবার বিচিত্র ধরনের অসুখ হয়েছিল। অসহ্য গরম লাগত। কাপড় ভিজিয়ে গায়ে জড়িয়ে হাওয়া করেও সেই গরম কমানো যেত না। রাতে ঘরে ঘুমোতে পারতেন না। বারান্দায় হাওয়া বেশি খেলে বলে বারান্দায় শুইয়ে রাখা হতো। এক রাতে অবস্থা খুব খারাপ হলো। কবিরাজের কাছ থেকে মকরধ্বজ এনে খাওয়ানো হলো। সেই ওষুধের নাকি এমনই তেজ যে খাওয়ামাত্র মরা রোগী লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে। মকরধ্বজ খাওয়ার পর তার অবস্থা আরো খারাপ হলো, তিনি ছটফট করতে লাগলেন। মাঝে মাঝে ছটফটানি কমত–তিনি তখন বলতেন— আমার শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে। আরো জোরে হাওয়া কর। আরো জোরে। রাত দুটার দিকে তার জুলুনি বোধহয় একটু কমল। তিনি ক্লান্তভঙ্গিতে বললেন-আজ মৃত্যু হবে কি না বুঝতে পারছি না। চাঁদনী রাত ছিল। মরণ হলে খারাপ ছিল না। শরীরের জ্বলুনিটা কমত। জ্বলুনি আর সহ্য হয় না।
দুৰ্ভগাদের কোনো ইচ্ছাই পূর্ণ হয় না। তার শেষ ইচ্ছাও পূর্ণ হয় নি। তিনি মারা যান। পরের রাতে। সে রাতে আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। চাদ বা তারা কোনোটাই ছিল না।
আচ্ছা তিনি কি তার বাবাকে গ্লামারাইজড করছেন না? একটা দুষ্ট প্রকৃতির লোককে দুঃখী, মহৎ এবং সুন্দর মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। ব্যাপারটা আসলে সে রকম না। তার বাবা ছিলেন চোর, অসৎ প্রকৃতির মানুষ, সৰ্বরকম দায়িত্ব জ্ঞানহীন একজন দুর্বল মানুষ। দুর্বল মানুষদের চরিত্রও দুর্বল থাকে। তার চরিত্রও দুর্বল ছিল। তার খারাপ পাড়ায় যাতায়াত ছিল। খারাপ পাড়ার একটি মেয়েকে তিনি বিয়েও করেছিলেন। সেই মেয়েকে তিনি অবশ্যি ঘরে আনেন নি। তবে সেই নষ্ট মেয়ের গর্ভের একটি সন্তানকে ঘরে স্থান দিয়েছিলেন। এই ঘটনা চিত্ৰলেখাকে বলা হয় নি, হাসানকেও বলা হয় নি। তিনি পাশ কাটিয়ে গল্প বলছেন। এটা ঠিক হয় নি।
রহমতউল্লাহ!
জ্বি স্যার।
তুমি হাসানকে একটু খবর দাও। জ্বি আচ্ছা স্যার।
পান দিতে বল। চা খেয়ে মুখ মিষ্টি হয়ে গেছে। জর্দা ছাড়া পান।
জ্বি দিচ্ছি।
একটা পাতলা চাদর আমার গায়ে দিয়ে দাও। শীত লাগছে।
ফ্যান বন্ধ করে দিব স্যার?
ফ্যান বন্ধ করতে হবে না।
হিশামুদ্দিন চোখ বন্ধ করলেন। বেশ ভালো ঠাণ্ডা লাগছে। তার বাবা মৃত্যুর সময় অসহ্য গরমে ছটফট করেছেন। আর তিনি নিজে হয়তো শীতে কাপতে কাঁপতে মারা যাবেন। তার বাবার কোনো সাধই পূর্ণ হয় নি। তার নিজের প্রতিটি সাধ পূর্ণ হয়েছে। তিনি যদি চান তার মৃত্যু হবে জোছনা দেখতে দেখতে তাহলে হয়তো-বা কৃষ্ণপক্ষের রাতেও পূৰ্ণচন্দ্ৰ দেখা যাবে।
