লিটন তৃপ্তির হাসি হাসছে। হাসান মুগ্ধ হয়ে লিটনের হাসি দেখছে। না। শম্পা মেয়েটা ভাগ্যবতী। সে তার এক জীবনে অসংখ্যবার স্বামীর সুন্দর হাসি দেখবে।
হিশামুদ্দিন সাহেব বাথরুমে ঢুকে কল ছাড়লেন
হিশামুদ্দিন সাহেব বাথরুমে ঢুকে কল ছাড়লেন তখন হঠাৎ তার মনে হলো ভূমিকম্প হচ্ছে। পৃথিবী দুলছে। অস্পষ্ট কাঁপুনি। আশ্চর্য কাণ্ড! সেই কঁপুনি তার শরীরের প্রতিটি কোষে ঢুকে যাচ্ছে। শরীরও কপিছে। ব্যাপারটা কী? তিনি এক হাতে বেসিনে ধরে ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলালেন। ভূমিকম্পের সময় ঘরবাড়ি ছেড়ে ফাঁকা জায়গায় ছুটে যেতে হয়। তার পা থেমে গেছে–তিনি বাথরুম থেকে বেরোবার আশা ছেড়ে দিলেন। বের হওয়া এখন অসম্ভব। তাকে যেতে হবে দরজা পর্যন্ত। দরজার লক। খুলতে হবে। অথচ পা জমে আছে। ভূমিকম্পের দুলুনি আরো বাড়ছে। তার শরীরের দুলুনিও বাড়ছে। তিনি ভাঙা গলায় ডাকলেন–চিত্ৰলেখা! চিত্ৰলেখা! নিজের গলা থেকে আওয়াজ বের হচ্ছে কি না তাও তিনি বুঝতে পারছেন না। চারদিক থেকে ঝমােঝম শব্দ হচ্ছে। সবাই যেন টিনের থালাবাসন হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে। তিনি আবারো ডাকলেন চিত্ৰলেখা! চিত্ৰলেখা! কেউ কি আযান দিচ্ছে। তিনি আযানের শব্দও শুনছেন।
মহাপ্রাকৃতিক বিপদে মানুষ। আযান দেয়। আযান কে দিচ্ছে? মোতালেব?
বাথরুমের দরজায় ধাক্কা পড়ছে। কে যেন মিষ্টি গলায় ডাকছে—বাবা দরজা খোল। দরজা খোল। কে ডাকছে? চিত্ৰলেখা? তার গলা তো এমন না। মনে হচ্ছে দশ বছরের কোনো বালিকা।
বাবা তোমার কী হয়েছে?
ভূমিকম্প হচ্ছে রে মা।
দরজা খোল ত বাবা।
আমি নড়তে পারছি না রে মা।
খোলা কল দিয়ে ছড়াছড় শব্দে পানি পড়ছে। বাথরুমের আলো উজ্জ্বল হচ্ছে। আবার কমে যাচ্ছে। হিশামুদ্দিন বুঝতে পারছেন তার বাথরুমের দরজার পাশে অনেকেই ভিড় করেছে। দরজায় শব্দ হচ্ছে। তারা বোধহয় দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। সেই চেষ্টা বাদ দিয়ে তাদের উচিত–নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেয়া। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুৰ্যোগের সময় কারো দিকে তাকাতে হয় না। পিতা, মাতা, পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কারো দিকেই না। শুধু নিজেকে বীচানো। তার মধ্যে দােষের কিছু নেই। প্রকৃতি মানুষের ডিএনএ কোষে এই ব্যাপারটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। প্রকৃতির মমতা তার সৃষ্টির জন্যে। প্রকৃতি জানে মহাবিপদের সময় যদি একে অন্যকে বাচানোর চেষ্টা করতে থাকে তাহলে কেউ বাঁচবে না। কাজেই প্রকৃতি এই বিধান ডিএনএ-তে ঢুকিয়ে দিয়েছে। যে বিধানে ভয়ঙ্কর বিপদে মানুষের সব চিন্তা নিজের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। কিন্তু এরা এমন করছে কেন? এরা কেন ছুটে গিয়ে মাঠে কিংবা ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়াচ্ছে না। টিনের থালা বাসন পেটানোরও বা অর্থ কী। আনন্দের কোনো ব্যাপার তো না যে ঘণ্টা বাজাতে হবে?
বাথরুমের দরজা ভাঙা হয়েছে। দরজার ওপাশে উদ্বিগ্নমুখে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। মোতালেব, রহমতউল্লাহ, চিত্ৰলেখা। চিত্ৰলেখা বাথরুমে ঢুকে বাবার হাত ধরল। পানির ট্যাপ বন্ধ করল। হিশামুদিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বিব্রত গলায় বললেন, ভূমিকম্প হচ্ছে। চিত্ৰলেখা বলুল, ভূমিকম্প হচ্ছে না। তোমার শরীর খারাপ করছে। মনে হয় প্রেসার সাডেন শুট করেছে। তুমি কি আমার হাত ধরে ধরে হাঁটতে পারবে? নাকি তোমাকে কোলে করে নিতে হবে?
হাঁটতে পারব।
তাহলে এস।
পা আটকে গেছে। পা নাড়াতে পারছি না।
কোনো অসুবিধা নেই। আপাতত পা না নাড়ালেও চলবে। তোমাকে কোলে করে নেবার ব্যবস্থা করছি।
হিশামুদিন সাহেব খুবই বিস্মিত হচ্ছেন। কল বন্ধ করা হয়েছে অথচ এখনো পানি পড়ার ছড়াছড় শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে শব্দটা মাথার ভেতর ঢুকে পড়েছে। অনন্তকাল এই শব্দ মাথার ভেতর হতেই থাকবে। একঘেয়ে শব্দের জন্যে হিশামুদ্দিন সাহেবের কেমন ঘুমাও পেয়ে গেছে। যন্ত্রণাময় ঘুম। প্রবল জ্বরের সময় এ ধরনের ঘুম পায়; ঘুম হচ্ছে অথচ শারীরিক সব যন্ত্রণা টের পাওয়া যাচ্ছে। সবার কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে–এ রকম।
হিশামুদ্দিন সাহেব শুয়ে আছেন তার নিজের খাটে। ঘর অন্ধকার। জানালার সব পরদা টেনে দেয়া। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। দিনের শুরুটা ঠাণ্ডা। ফ্যানের বাতাসে তার শীত শীত লাগছে। গায়ে একটা পাতলা চাদর দিয়ে দিতে কি চিত্ৰলেখাকে বলবেন? শীত শীত ভাবটা খুব যে খারাপ লাগছে তা না। মাঝে মাঝে একটু শুধু কাঁপন লাগছে–এই যা।
শরীরটা এখন কেমন লাগছে বাবা?
ভালো।
তোমার ব্লাডপ্রেসার এখন অনেকখানি কমেছে। তবে পালস রেট এখনো হাই–মিনিটে ৯৮, তবে রেগুলার হয়েছে–আগে খানিকটা ইরেগুলারিটি ছিল। তোমাকে আমি টাংকুলাইজার দিয়েছি। এতে ঘুম হবে কিংবা তন্দ্রার মতো হবে। তোমার থরো চেকাপের একটা ব্যবস্থা আমি করছি। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা তুমি নাড়াতে পার কি না। একটু দেখ তো।
হিশামুদিন পায়ের বুড়ো আঙুল নাড়লেন। চিত্ৰলেখা বলল, গুড। এখন ব্রেকফার্স্ট কর। হালকা কিছু খাও। দুধ সিরিয়েল, আধা কাপ ফলের রস। এক কাপ আগুনগরম চা।
তুই তো সত্যিকার ডাক্তারদের মতো কথা বলছিস।
আমি সত্যিকারেই ডাক্তার। আমি এখন একটু বের হব। এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরব। তোমার কানে যে যন্ত্রণা হচ্ছিল সেটা কি এখনো হচ্ছে?
না।
একসেলেন্ট! কাঁপছ কেন? তোমার কি শীত লাগছে?
