তুই ভাত খেয়ে নে। আমি বসি।
তোকে একটা ডিম ভেজে দি খা।
না—আমি খাব না।
খা নারে দোস্ত। আমি গরিব মানুষ এর বেশি কী দেব। দাঁড়া আমি চট করে একটা ডিম নিয়ে আসি।
আমার জন্যে কিছু আনতে হবে না। তুই খেয়ে শেষ কর। তোর জন্য একটা পাঞ্জাবি এনেছি–গায়ে দিয়ে দেখ লাগে কি না।
আমার জন্যে পাঞ্জাবি কেন? আমি কী করলাম?
তুই বিয়ে করেছিস। ফকির অবস্থায় বিয়ে করে যে সাহস দেখিয়েছিস সেই সাহসের পুরস্কার।
মাই গড! স্যান্ডেলও কিনেছিস নাকি?
হ্যাঁ। তোর এখনকার স্যান্ডেল জোড়া দয়া করে আমার হাতে দে। আমি নিজে ডাক্টবিনে ফেলব।
এত দামি পাঞ্জাবি কিনেছিস? টাকা পেলি কোথায়? তোর কি চাকরি বাকরি কিছু হয়েছে?
না। শোন লিটন, তোদের উপহার দেয়ার জন্যে আমি কিছু টাকা বাজেট করেছিলাম। উপহার কেনার পর কিছু টাকা বেঁচে গেছে। এই টাকাটাও আমি দিতে চাই। কার কাছে দেব? তোর কাছে না তোর স্ত্রীর কাছে?
লিটন কথা বলছে না। তার ডিম ভাজা হয়ে গেছে–আগুনগরম ভাত সে কাপ কপ করে খাচ্ছে। অভাবের সময় মানুষের ক্ষিধে বেশি লাগে এটা বোধহয় ঠিক।
হাসান।
হুঁ।
তুই যে খুব অদ্ভুত একটা প্ৰাণী তা কি তুই জানিস?
না।
তোর বন্ধুবান্ধবরা সবাই কিন্তু এটা জানে।
জানলে তো ভালোই।
কত মানুষের দোয়া যে তোর ওপর আছে!
দোয়ায় তো কাজ হয় না।
তা হয় না। কাজ হলে আমার দোয়াতেই তোর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। ভালো চাকরি বাকরি করে সুখে ঘর-সংসার করতি।
আমি সুখেই আছি।
সুখে থাকলে তো ভালোই।
লিটন নতুন পয়জামা-পাঞ্জাবি পরল। স্যান্ডেল পরল। হাসিমুখে বলল, হাসান আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?
খুবই ভালো দেখাচ্ছে শুধু মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িটায় সমস্যা করছে। ভালমতো শেভ কর।
নাপিতের দোকানে শেভ করব। শম্পা। আজ কী যে খুশি হবে–ওর খুশি খুশি মুখ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। গত চারদিন তার সঙ্গে দেখা হয় নি।
কেন?
খুবই লজ্জার ব্যাপার–তোকে বলতেও লজ্জা লাগছে।
লজ্জা লাগলে বলার দরকার নেই।
শোন। তোকে না বললে আর কাকে বলব, হয়েছে কী, শেষবার যখন শম্পার সঙ্গে দেখা হলো সে হঠাৎ খুব লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, তুমি আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবে? আমি বললাম, কত? সে বলল, পাঁচ শ টাকা দিলেই হবে। আমি বললাম আজ তো সঙ্গে নেই। পরের বার যখন আসব নিয়ে আসব। টাকার যোগাড় হয় নি যাওয়াও হয় নি। আজ তুই যখন বললি, উপহার কেনার পর কিছু টাকা বেঁচেছে তুই টাকাটা দিয়ে দিতে চাস তখন আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। তুই বোধহয় লক্ষ করিস নি। আমি সেই সময় ডিম ভাজা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। পুরুষ মানুষের চোখের পানি কাউকে দেখাতে নেই।
শম্পা শাড়ি দেখে ছেলে মানুষের মতো খুশি হলো। কয়েকবার বলল, আশ্চর্য এত সুন্দর শাড়ি! এত সুন্দর রঙ!
লিটন বলল, যাও তো তুমি শাড়ি পরে আসা। আর এই খামটা রাখ।
খামে কী?
এক হাজার টাকা আছে। রেখে দাও–টুকটাক খরচ আছে না?
শম্পা খুবই লজ্জিতভাবে হাসানের দিকে তাকাচ্ছে। লিটন বলল, হাসান মিষ্টি এনেছে–মিষ্টি ভেতরে দিয়ে আস। বাচ্চারা খাক। আর শোন তুমি হাসানের সঙ্গে দুএকটা কথা বল। এমন মূর্তির মতো বসে আছ কেন?
শম্পা আরো লজ্জিত হয়ে বলল, আমি শাড়িটা পরে আসি। আর শোন তুমি এই চার দিন আস নি কেন?
মানুষের কাজকর্ম থাকে না?
শম্পা হাসানকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লিটনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি গতকাল তোমার মেসে গিয়েছিলাম। তুমি ছিলে না। কেউ তোমাকে বলে নি?
কী আশ্চর্য! তুমি মেসে উপস্থিত হলে কোন আন্দাজে? তোমাকে না বলেছি আজেবাজে জায়গায় থাকি কখনো যাবে না।
কেন তুমি চারদিন আসলে না?
শম্পার চোখে পানি এসে গেছে। একটু আগে যে মেয়ে শাড়ি হাতে আনন্দে ঝলমল করছিল এখন সে প্রায় বাচ্চাদের মতোই শব্দ করে কাঁদছে। হাসান খুব অস্বস্তিতে পড়েছে। আবার তার খুব ভালোও লাগছে। তার মন বলছে লিটনের সব সমস্যার সামধান হবে। তাদের দুজনের সুন্দর সংসার হবে। সেই সংসারে চাঁদের মতো খোকাখুকু আসবে। ভালবাসার পবিত্র অশ্রু প্রকৃতি কখনো অবহেলা করে না।
লিটন বলল, শম্পা তুমি যাও তো শাড়িটা পরে আসা। আর শোন প্লেটে করে হাসানকে একটু মিষ্টি দাও। ওর মিষ্টিই ওকে খাইয়ে দি। বেলপাতায় বেলপূজা। হা হা হা।
শম্পা শাড়ি হাতে ভেতরে চলে গেল। লিটন বলল, হাসান আমার বউকে কেমন দেখলি?
সুন্দর খুব সুন্দর।
ছেলেমানুষ–বয়সও অবশ্য কম। জুন মাসে আঠার হবে। এই কদিন আসি নি কেঁদে কেটে কী সিন ক্রিয়েট করল দেখলি! তুই থাকায় রক্ষা নয়তো আরো হইচই করত।
লিটন তুই এক কাজ কর বউকে নিয়ে আজ সারাদিন ঘুরে বেড়া। কিছু টাকা তো আছে?
কোথায় ঘুরব?
জাদুঘর, চিড়িয়াখানা কিংবা এক কাজ করা–সদরঘাটে গিয়ে একটা নৌকা ভাড়া কর। বুড়িগঙ্গায় নৌকায় করে ঘুরবি। কিছু খাবারদাবার সঙ্গে নিবি, একটা ফ্লাস্কে করে চা।
নৌকা ভাড়া কত জনিস?
এটা হিসেবে ভাড়া। পঞ্চাশ টাকা করে ঘণ্টা। নৌকায় বসে দুজনে গল্পগুজব করবি।
মাঝি ব্যাটা তো সব শুনবে।
শুনুক, অসুবিধা কী?
তুইও চল আমাদের সাথে।
আরে না। আমি না। পুরো ব্যাপারটাই দুজনের।
শম্পার চুল কত লম্বা দেখেছিস?
হ্যাঁ, খুব লম্বা চুল।
সেদিন কী বলল শোন, ফট করে বলল, আমি যদি তার সঙ্গে কোনোদিন ঝগড়া করি। তাহলে সে চুল কেটে ফেলবে। যা সেনসেটিভ স্বভাব–কেটে ফেলবে তো বটেই। আমি খুব ভয়ে ভয়ে থাকি।
