রীনা চায়ের কাপ নিয়ে উপস্থিত হলো।
তুমি এখানে আমি সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছি।
তারেক আনন্দিত গলায় বলল, হাসানের সঙ্গে গল্প করছিলাম–ওর চাকরির একটা লাইন পাওয়া গেছে। লাবণীর এক মামা হচ্ছেন কমার্স মিনিস্টার। ফুল মিনিস্টার না–প্রতিমন্ত্রী। তবে প্রতিমন্ত্রীদেরও অনেক ক্ষমতা। মোটামুটি ধরনের একটা চাকরি ওদের কাছে কোনো ব্যাপারই না। লাবণী বলেছে একটা বায়োডাটা তৈরি করে ওর হাতে দিতে।
রীনা গভীর গলায় বলল, ভালো কথা দিও।
তারেক উৎসাহী গলায় বলল, হাসান তুই সুন্দর করে একটা বায়োডাটা তৈরি করে দু-একদিনের মধ্যে আমাকে দে, সার্টিফিকেট মার্কশিটের ফটোকপি দিবি, দুটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি, লেটার অব রেফারেন্স কিছু থাকলে তাও দিবি।
আচ্ছা দেব। আমি যাই তুই আরাম করে ঘুমো। এত চিন্তা করে কী হবে। রুটিরুজি নিয়ে এত চিন্তা করতে নাই।
তারেক চলে যাবার পর হাসান ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল। গত রাতে সে এক মুহূর্তের জন্যেও ঘুমোতে পারে নি–মনে হয় আজো ঘুমোতে পারবে না। কড়া কোনো ঘুমের ওষুধ নিয়ে আসা দরকার ছিল।
তিতলী অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে সুখে আছে–গল্প করছে এই চিন্তাটাই তাকে কষ্ট দিচ্ছে। তিতলী কী নিয়ে গল্প করে? তার গল্প করার বিষয়বস্তুর অভাব হবার কথা না। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়েও সে সুন্দর কথা বলে। বড়লোক স্বামীর ঘর করছে–গানও নিশ্চয়ই এখন শিখবে। সে কি তার স্বামীকে ওই গানটা শোনাবে? যে গানটা তাকে শোনাবার কথা ছিল। গানটার লাইনগুলো কী? আশ্চর্য এখনো মনে আসছে না। এক কপি গীতবিতান কিনে প্রতি গানের প্রথম লাইনের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে গেলেই গানটা পাওয়া যাবে। হাসান সেটা চাচ্ছে না। তার ইচ্ছা আপনাতেই গানটা তার মনে আসুক। ‘বিধি ডাগর আঁখি?’ উঁহুঁ। চরণ ধরিতে দিও গো… উঁহুঁ। না তাও না। তাহলে গানটা কী?
হাসানের মাথা দপদপ করেছে। সে উঠে এসে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়াল। ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। আকাশ পরিষ্কার। চাঁদ আছে–চাঁদটা দেখা যাচ্ছে না। ডান দিকের সাততলা বাড়ির আড়ালে ঢাকা পড়েছে। তিতলী এবং তার স্বামী কি চাদটা দেখতে পাচ্ছে? আচ্ছা তারা কি জেগে আছে? জেগে থাকারই কথা। নতুন বিয়ে হওয়া স্বামীস্ত্রীরা চট করে ঘুমোতে যায় না। এক ধরনের মধুর ইনসমনিয়ায় তারা আক্রান্ত হয়। হাসানের মাথাধরাটা আরো বাড়ছে। সে বাথরুমের দিকে রওনা হলো। কলের নিচে মাথা দিয়ে সে কলটা অনেকক্ষণ ছেড়ে রাখবে। কলে পানি আছে তো? কদিন ধরে পানির খুব টানাটানি যাচ্ছে। সন্ধ্যারাতেই পানির ট্যাংক খালি হয়ে থাকে। আজ কি কৃষ্ণপক্ষ না শুক্লপক্ষ?
এক শ ডলারের নোটটা
এক শ ডলারের নোটটা হাসান ভাঙিয়েছে। তার ভাগ্য ভালো ডলারের দাম হঠাৎ চড়ে যাওয়ায় তিন হাজার সাত শ টাকা পেয়েছে। এক শ টাকার নোটে পাঞ্জাবির পকেট ভর্তি। একটা হাত সব সময় পাঞ্জাবির পকেটে রাখতে হচ্ছে। সব সময় টাকা ছুঁয়ে থাকা।
হাসান আজ কিছু উপহার কিনবে। লিটনের স্ত্রীর জন্যে ভালো একটা শাড়ি। লিটনের জন্যে একটা পাঞ্জাবি, পায়জামা এবং একজোড়া স্যান্ডেল। লিটনের স্যান্ডেল দেখে সেদিন খুব মায়া লেগেছিল। উপহারের চেয়ে টাকাটা পেলে তাদের কাজে লাগত। সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় বিয়ে করার যন্ত্রণায় হাসানকে যেতে হয় নি। এটা কম কি?
তার জীবনে যা ঘটেছে মনে হয় ঠিকই ঘটেছে। তিতলীর ভালো বিয়ে হয়েছে। প্রথম কিছুদিন সে কষ্ট করবে। তারপর সেই কষ্ট গা সহা হয়ে যাবে। সব কষ্টই মানুষের একসময় শেষ হয়ে যায়। মানুষের কষ্ট গ্যাস বেলুনের মতো–উঁচুতে উঠতে থাকেএক সময় না এক সময় সেই বেলুন নেমে আসতে থাকে। বেলুন ভর্তি প্যাস থাকে ঠিকই তবে গ্যাসের বেলুনকে উড়িয়ে রাখার ক্ষমতা থাকে না।
হাসান সুন্দর একটা সিন্ধের শাড়ি কিনল। শাড়ি কেনার সময় তিতলীর কথা মনে পড়ল। কোন রঙটা তিতলীকে মানাবে ভেবে কেনা। শাড়ি পছন্দ করার একটা বুদ্ধিও তিতলী তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল। সেই বুদ্ধিটাও খুব সুন্দর। দোকানদার অনেকগুলো শাড়ি মেলে ধরবে। তখন তুমি দেখবে কিছু কিছু শাড়ি তোমার হাত দিয়ে ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে। ওই শাড়িগুলোই শুধু কিনবে। তিতলী সব সময় মজার মজার কথা বলত। এখনো কি বলে?
লিটনকে তার মেসে পাওয়া গেল। কেরোসিনের চুলায় সে ভাত বসিয়েছে। একটা বাটিতে ডিম ফেটে রেখেছে। ভাত নেমে যাবার পর ডিম ভাজবে। লিটন হাসানকে দেখে লাফিয়ে উঠল–আরে তুই।
ভাবিকে দেখতে এসেছি, আমাকে নিয়ে চল।
লিটন হাসিমুখে বলল, আশ্চর্য কাণ্ড, আমি গত রাতে স্বপ্নে দেখেছি তুই এসেছিস। খুবই অদ্ভুত একটা স্বপ্ন। দেখি কী, আমি আর শম্পা কক্সবাজারে বেড়াতে গেছি। সন্ধ্যাবেলা সমুদ্রের পাড়ে হাঁটছি। হঠাৎ শম্পা চেচিয়ে বলল, ওই দেখ তোমার বন্ধু বসে আছে। আমি বললাম, তুমি তো তাকে কোনোদিন দেখ নি। চিনলে কী করে। শম্পা তখন এমন হাসতে শুরু করল যে হাসির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়িতে দেখি রাত তিনটা বাজে। তারপর আর ঘুম হয় নি। রাতে চা বানিয়ে খেলাম। সকালে দোকান থেকে পরোটা এনে খেয়েছি। এখন এগারটা বাজে, এর মধ্যে ক্ষিধে লেগে গেছে। ভাত বসিয়েছি।
নিজেই রান্না করে খাস?
হুঁ। খরচ বাঁচে। অবস্থা কাহিল রে দোস্ত।
