লায়লা আপন মনে কথা বলে যাচ্ছে রীনা মনে মনে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললমেয়েটা কী সুখে আছে। পৃথিবীর কোনো সমস্যাই তাকে স্পর্শ করে না। সে আছে নিজের মতো। সাজগোজের সামান্য উপকরণ পেলেই সে তৃপ্ত। সংসার চলছে না, একটা ভাইয়ের চাকরি নেই, তার নিজের বিয়ের কিছু হচ্ছে না–তাতে কী?
ভাবি।
হুঁ।
তুমি আমাকে খানিকটা এঁটেল মাটি যোগাড় করে দেবে?
তুমি মাড ট্রিটমেন্ট করে কী করবে। তোমার মুখের চামড়া এমনিতেই উজ্জ্বল। আয়নায় নিজেকে দেখ না?
দেখি তো। সারাক্ষণই তো আয়নায় দেখি। আমার নিচের ঠোঁটটা ভাবি একটু বেশি মোটা, আরেকটু কম মোটা হলে ভালো লাগত।
মোটা ঠোঁটের আলাদা সৌন্দৰ্য আছে।
এটাও ভাবি ঠিক বলেছ। পুরুষরা মোটা ঠোঁট পছন্দ করে। মোটা ঠোঁটের মেয়েদের খুব সেক্সি লাগে তো এই জন্যে।
হাসান ভাত খাবে না।
তার জ্বর এসেছে। রীনা গায়ে হাত দিয়ে দেখেছে আসলেই জ্বর। বেশ ভালো জ্বর।
রীনা খাওয়া শেষ না করেই উঠে পড়ল। রুচি হচ্ছে না। প্লেটভর্তি ভাত রেখে উঠতেও কষ্ট হচ্ছে। ছোটবেলায় মা বলতেন না খেয়ে ফেলে রাখা প্রতিটা ভাত সত্তরটা করে সাপ হয়ে দংশন করবে। সেই স্মৃতি বোধহয় মনে রয়ে গেছে।
ভাবি তোমার কি কোনো কারণে মন খারাপ?
না।
ভাবি মন সব সময় ভালো রাখতে হবে। মন খারাপ হলে শরীরের ওপর তার এফেক্ট হয়। চোখের নিচে কালি পড়ে, মুখের চামড়া টামড়া চিমসে মেরে যায়। মাথার চুলও পাতলা হয়ে যায়।
এই জন্যেই কি তুমি কখনো মন খারাপ কর না?
অনেকটা তাই। আমি দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করি ভাবি।
দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন যাপনের পদ্ধতি এক সময় তোমার কাছ থেকে আমার শিখতে হবে। আমি সব সময় ভয়াবহ দুশ্চিন্তায় থাকি।
তোমাকে দেখে অবশ্যি তা বুঝা যায় না। তবে এক সময় বোঝা যাবে। হঠাৎ একদিন দেখা যাবে তুমি বুড়ি হয়ে গেছ। তোমার চামড়ায় রিংকেলস পড়েছে।
তখন মাড ট্রিটমেন্ট করব। এ ছাড়া আর উপায় কী?
ভাবি কমলার মা তো দেশে যাচ্ছে ওকে বলেছি কিছু এটেল মাটি নিয়ে আসতে।
রীনা শঙ্কিত গলায় বলল, ও দেশে যাচ্ছে নাকি? হ্যাঁ আমাকে তো বলল, তার নাকি শরীর টিকছে না।
কী সর্বনাশের কথা!
একবস্তা এঁটেল মাটি নিয়ে এলে আমাদের অনেক দিন চলে যাবে।
রীনা চা বানাতে বসেছে। লায়লা তার পাশে বসে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। রীনার মনে হলো লায়লা তার মার স্বভাব পেয়েছে। দুজনই কথা বলতে পছন্দ করে। যাকে কথাগুলো বলা হচ্ছে সে শুনছে কি শুনছে না। তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।
তারেক গোসল শেষ করে তার ভাইয়ের ঘরে উঁকি দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা আসবে। চায়ের সঙ্গে একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। সিগারেটের অভ্যাসটা বোধহয় হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝেই সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে। একটা প্যাকেট কিনে আলমারিতে রেখে দিতে হবে।
হাসানের ঘরে বাতি জ্বলছে। সে আধশোয়া হয়ে আছে। সন্ধ্যা থেকেই তার মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল, এখন যন্ত্রণাটা বেড়েছে। জ্বর এসেছে। জ্বরটা কত কে জানে। মনে হচ্ছে আজ রাতে ঘুম হবে না। আর ঘুম হলেও হাঁসের স্বপ্নটা দেখবে।
তোর শরীর খারাপ নাকি রে?
না।
মুখটুখ শুকিয়ে কেমন হয়ে আছে। তোর কাছে কি সিগারেট আছে? থাকলে একটা দে।
হাসান প্যাকেট বের করল। একটা সিগারেট বের করে ভাইয়ের দিকে দিল। তারেক বলল, আরেকটা দে–বিছানায় শুয়ে শুয়ে খাব।
তোমার দেখি সিগারেটের নেশা হয়ে যাচ্ছে।
তারেক হাসল। হাসানের মনে হলো তার ভাইকে আজ খুশি খুশি লাগছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার জীবনে আনন্দময় কোনো ঘটনা ঘটেছে।
ভাইয়া বাস।
তোর ভাবিকে বলেছিলাম চা দিতে। ভুলে গেছে কিনা কে জানে।
ভাবি ভুলবে না।
তুই খাবি? তুই খেলে রানাকে বলে আসি।
আমি খাব না। তুমি খাও।
তাৱেক বসল। আরাম করে সিগারেট ধরাল। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, তোর চাকরির ব্যাপারে আজ কথা বললাম।
কার সঙ্গে কথা বললে?
লাবণীর সঙ্গে কথা বললাম। লাবণীর আপন মামা কমার্স মিনিস্টার। তাদের হাতে অনেক চাকরি। লাবণীর চাকরির ব্যবস্থাও তিনি করে দিয়েছেন।
আজ কি তুমি ওই মহিলার বাসায় গিয়েছিলে?
হুঁ।
প্রায়ই কি যাও?
প্রায়ই যাব কী? মাঝে মধ্যে যাই। দুঃখী মেয়ে তো আমার সঙ্গে কথা বললে মনে শান্তি পায়। আজ ওর হাসবেন্ডের মৃত্যুদিবস ছিল। সেই উপলক্ষে মিলাদ।
ও।
লাবণীকে চিটাগাং বদলি করে দিয়েছে। সামনের সপ্তাহে চলে যাবে। অফিসের কাণ্ডকারখানা দেখ–একটা মহিলা হুট করে তাকে বদলি করে দিল চিটাগাং।
উনার মামাকে দিয়ে বললেই বদলি রদ হয়ে যাবে। লাবণীও চিটাগাং যেতে চাচ্ছে–সেখানে কোয়ার্টার পাবে। নিজের মতো করে থাকতে পারবে। অবশ্যি আজকালকার সোসাইটি যা হয়েছে। একজন মহিলার পক্ষে বাচ্চা একটা মেয়ে নিয়ে থাকা মুশকিল। তার উপর আবার বিধবা।
হুঁ।
একা একা চিটাগাং যেতেও ভয় পাচ্ছে। আমি বলেছি পৌঁছে দেব।
তোমার যাওয়াটা ঠিক হবে না ভাইয়া।
এত জিনিসপত্র নিয়ে একা একা যাবে কীভাবে?
দরকার হলে আমি পৌঁছে দেব।
তোর সঙ্গে যাবে কেন? তোকে সে চেনে নাকি? আমাকেই যেতে হবে। তোর ভাবিকে বলব দুদিনের একটা ট্যুর পড়ে গেছে।
হাসান গভীর বিস্ময়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কী রকম সহজ সরল ভঙ্গিতে কথা বলে যাচ্ছে–যেন জীবনে জটিলতা বলতে কিছু নেই। জীবনটা শান্ত দিঘির জলের মতো।
