বউমা শুনে যাও তো।
রীনা শাশুড়ির ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজার ফাঁক দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে ভীত গলায় বলল, মা কিছু বলবেন?
শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলার সময় তার সব সময় একটু ভয় ভয় লাগে।
তোমাকে দুপুরে একবার বললাম না ডেটল পানি দিয়ে আমার ঘরটা মুছে দেবার ব্যবস্থা করতে? এখন বাজে রাত নাটা। ঘরটা মোছা হবে কখন? আর শুকাবে কখন?
কমলার মার শরীরটা খারাপ। শুয়ে আছে।
দুদিন পরে পরেই তো শুনি শরীর খারাপ। মাখনের শরীর নিয়ে ঝি-গিরি করতে আসে কেন? পটের বিবি সেজে পালঙ্কে ঘুমায়ে থাকলেই পারে। তুমি বালতিতে করে এক বালতি পানি, ডেটলের শিশি আর একটা ন্যাকড়া দিয়ে যাবে। তোমার শ্বশুরকে দিয়ে মোছাব। উপায় কী?
টগরদের খাইয়ে আমি নিজেই এসে মুছে দেব।
তোমার মুছতে হবে না। তারপর চারদিকে বলে বেড়াবে শাশুড়ি এই করেছে সেই করেছে। ছেলের বউয়ের কথা শোনার আমার দরকার নেই। এই বয়সে কথা শুনতে ভালো লাগে না।
আপনি কি মা এখন ভাত খাবেন?
এখন ভাত খাব না তো কি শেষরাতে খাব? এটা তো মা রোজার মাস না যে সেহেরি খাওয়াবে।
টেবিলে ভাত বেড়ে আপনাকে খবর দেব।
তারেক এসেছে?
জ্বি না।
এত রাত পর্যন্ত সে কোথায় থাকে?
জানি না মা।
জানি না মা বললে তো হবে না। জানতে হবে। পুরুষমানুষ আর ছাগল এই দুই জিনিসকে চোখে চোখে রাখতে হয়। কখন কীসে মুখ দেয় কিছু বলা যায় না। রাতে যেদিনই দেরি করে ফিরবে মুখের কাছে নাক নিয়ে গন্ধ শুকবে। মদ ফাঁদ খেয়েছে কি না। বোঝার এটাই বুদ্ধি। একদিন তোমার শ্বশুর কী করেছে শোন— বাসায় ফিরেছে রাত বারটায়। দেখি মুখভর্তি পান। পানের রস গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। দেখেই সন্দেহ হলো কোনোদিন পান খায় না। আজ হুজুর খাচ্ছেন কেন? মুখের কাছে মুখ নিতেই গন্ধ পেলাম। বললাম, গন্ধ কীসের? তোমার শ্বশুর বলল, জর্দা দিয়ে পান খেয়েছি তো জর্দার গন্ধ। আমি বললাম তুমি পান খাও না-আজ একেবারে জর্দা দিয়ে পান। ব্যাপারটা কী? তখন দেখি হুজুর গাইগুই করে। একটু চাপ দিতেই আসল জিনিস বের হয়ে পড়ল। সে নাকি বন্ধুদের চাপে পড়ে অতি সামান্য হুইঙ্কি খেয়েছে। আমি বললাম অতি সামান্যটা কত?
হুজুর বললেন, এক চামচ।
আমি বললাম, কত বড় চামচ? ডালের চামচ না চায়ের চামচ?
তরকারির চামচের এক চামচ।
আমি বললাম, এক চামচ হুইঙ্কি যখন খেয়েছ তখন এক চামচ গু খেতে হবে। গু খেলে বমি হবে। পেটের জিনিস বের হয়ে আসবে। আমি যদি সতী মায়ের সতী কন্যা হই, তোমাকে আজ আমি এক চামচ গু খাওয়াব বলেই চায়ের চামচে এক চামচ গু নিয়ে এলাম।
রীনা শঙ্কিত গলায় বলল, খাওয়ালেন? গু দেখেই হুজুরের খবর হয়ে গেল। বুঝে গেল আমি খাইয়ে ছাড়ব। বমিটমি করে ঘর ভাসিয়ে ফেলল। সত্যি সত্যি তো আর খাওয়াতাম না। ভাব ধরেছিলাম। ওই ভাবেই কাজ হয়েছে। শাশুড়ির কাছ থেকে একটা জিনিস শিখে রাখ মা। সব সময় ভাব ধরবে। ভাবেই কাজ হবে। পুরুষ মানুষ যদি রাত এগারটা-বারটার সময় ঘরে ফেরে তখন বুঝবে খবর আছে। অনেক কথা বলা হয়েছে এখন যাও ভাত দাও। হুজুর কোথায়?
টগর, আর পলাশকে পড়াচ্ছেন।
তাহলেই কাজ হয়েছে। ওদের আর ইহজনমে পাস করা লাগবে না। হুজুরকে আগে ভাত দাও। হুজুরের খাওয়া শেষ হলে আমাকে দেবে।
তারেক ফিরল রাত বারটার একটু আগে। রীনা দরজা খুলে দিল। তারেক বিব্ৰতমুখে বলল, দেরি করে ফেললাম। তুমি ভাত খেয়েছ; রীনা না সূচক মাথা নাড়ল।
তুমি খেয়ে নাও। আমি খাব না। খেয়ে এসেছি।
কোথেকে খেয়ে এলে?
বলছি দাঁড়াও। হাতমুখটা ধুয়ে নি। শরীরটা ঘামে চটচট করছে। রিকশা পাচ্ছিলাম না! হাঁটতে হাঁটতে অবস্থা কাহিল। গোসল করে ফেলব কিনা ভাবছি।
ভাবাভাবির কী আছে, কর।
তুমি এক কাপ চা দাও। গোসল করে গরম গরম এক কাপ চা খাব। আচ্ছা থাক তুমি খাওয়াদাওয়া সেরে চা দিও।
গিয়েছিলে কোথায়?
লাবণীদের বাসায় মিলাদের দাওয়াত ছিল। ওর স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী। না গেলে ভালো দেখায় না। দুঃখী মেয়ে সেই জন্যেই যাওয়া।
মিলাদ কখন ছিল?
বাদ আছর ছিল। অফিস থেকে সরাসরি সেই জন্যেই চলে গিয়েছিলাম। মিলাদে লোকজন কিছুই হয় নি। বলতে গেলে আমি আর মওলানা সাহেব! মিলাদে তো আর আজকাল লোক হয় না, গানবাজার জলসা হলে লোক হয়।
মিলাদ রাত বারটা পর্যন্ত চললি?
আরে না। আছর ওয়াক্তের মিলাদ খুব ছােট হয়। আমি চলে আসতাম লাবণী এমন কান্নাকাটি শুরু করল। ওকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে রাত হয়ে গেল।
তারেক বাথরুমে ঢুকে পড়ল। রীনার খিদে মরে গেছে। কিছু মুখে দিতে ইচ্ছা করছে। না। তারপরেও তাকে খেতে বসতে হবে কারণ লায়লা তার সঙ্গে খাবে বলে এখনো খায় নি। ভাবি খায় নি বলে সে না খেয়ে বসে থাকবে লায়লা তেমন মেয়ে নয়। তার পেটে বিশেষ কোনো গল্প আছে বলেই সে ভাবির সঙ্গে নিরিবিলিতে খাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে।
খেতে বসে রীনা বলল, কিছু বলবে লায়লা?
লায়লা বলল, না তো।
তোমার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলতে চাও।
কিছু বলতে চাই না। বলব। আবার কী? ভাবি তুমি কি কখনো মাড ট্রিটমেন্ট করেছি?
মাড ট্রিটমেন্টটা কী?
মাড ট্রিটমেন্ট হচ্ছে ভাবি অদ্ভুত একটা জিনিস। মুখের চামড়া ঠিক করার জন্যে এরচে’ ভালো কিছু হতে পারে না। কী করতে হয় শোন-কিছু এঁটেল মাটি নিতে হয়। কাগজি লেবুর রস, জামপাতার রস আর সামান্য ফিটকিরি মিশিয়ে এঁটেল মাটিটাকে কাদা বানাতে হয়। খুব মিহি কাদা প্রয়োজনে শিলপাটায় বেটে নেয়া যায়। তারপর সেই মিহি কাদাটা মুখে মেখে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। সকালবেলা মুখ ধুয়ে ফেলা। সপ্তাহে একদিনও যদি করা যায় তাহলে মুখে কোনোদিনও রিংকেলস পড়ে না। চামড়া হয় উজ্জ্বল এবং সফট…
