সারা বিকাল রীনা ডলার।ভর্তি খাম নিয়ে ঘুরে বেড়াল। সাত শ ডলারে ঠিক কত টাকা হবে তাও জানে না। জানতে খুব ইচ্ছে করছে। যত টাকাই হোক সে একটা পয়সা খরচ করবে না। জমা করে রাখবে। শুধু শীতের আগে আগে টগর এবং পলাশের সুন্দর দুটা সুয়েটার কিনবে। গত বৎসর এদের জন্যে দুটা সুয়েটার তার খুব পছন্দ হয়েছিল। একেকটার সাড়ে চার শ’ টাকা করে দাম। তার বাজেট ছিল পাঁচ শ টাকা। তারেককে ভালো একজোড়া পামিসু কিনে দিতে হবে। প্রতিবছর ঈদের বাজারের সময়ে সে পামসু দেখে বেড়ায়। জুতা পরে মচমচ করে খানিকক্ষণ হাঁটে। রীনার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলে–ভালো ফিট করেছে। দাম শুনে আর কেনে না।
এই দুটা জিনিসের জন্যে সে যা টাকা লাগে খরচ করবে। তার বেশি না। একটা টাকাও না।
সন্ধ্যার আগে আগে তারেক ফেরে, আজ ফিরল না। তবে হাসান ফিরল। রীনা প্রায় ছুটে গেল হাসানেব। ঘরে। উৎফুল্প গলায় বলল, কেমন আছ হাসান?
হাসান প্ৰাণহীন গলায় বলল, ভাবি ভালো আছি।
হাসানের নিম্প্রাণ গলা বীনার কানে বাজল না। সে আনন্দ ও উত্তেজনায় ঝলমল করছে।
আজ এত সকাল সকাল ফিরলে যে?
একদিন সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় ফিরে দেখলাম কেমন লাগে।
কফি খাবে হাসান?
কফি?
আজ তোমার ভাইকে চমকে দেবার জন্যে একটিন কফি কিনিয়ে এনেছি। এতটুকু একটা টিন দাম নিয়েছে আশি টাকা।
ভাবি কফি খাব না।
আহা খাও। আমিও তোমার সঙ্গে খাব।
বেশ তো খাব।
রীনা চেয়ারে বসতে বসতে বলল, হাসান তুমি কি জান বাংলাদেশে ডলার কত করে?
তোমার কথা বুঝতে পারছি না ভাবি।
এক ডলারের বদলে বাংলাদেশী কত টাকা পাওয়া যাবে?
তুমি ডলারের খোঁজ করছ, কেন?
রীনা খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, আদার ব্যাপারি তো এইজন্যে ডলারের খোঁজ করছি। কত করে ডলার তুমি জান না?
একশ ডলারে তিন হাজার পাঁচশ টাকা করে পাওয়া যায়।
রীনা দ্রুত হিসাব করে বলল–চব্বিশ হাজার পাঁচ শ, কী সৰ্বনাশ!
ভাবি বিড়বিড় করে কী বলছ?
আমি কী বলব তুমি বুঝতে পারবে না। দেখি তুমি হাত পাত তো। চোখবন্ধ করে হাত পাত। আহা হাত পাত
হাসান হাত পাতল।
রীনা তার হাতে একটা একশ ডলারের নোট দিয়ে বলল, এটা তোমার। ভাবি ব্যাপার কী?
আমি কিছু ডলার পেয়েছি, সেখান থেকে এক শ ডলার তোমাকে দিলাম। তোমার টাকায় আমি কত অসংখ্যবার ভাগ বসিয়েছি আজ সামান্য কিছু তোমাকে ফেরত দিতে পেরে আমার কী যে ভালো লাগছে তা তুমি কোনোদিনও বুঝতে পারবে না।
ডলার তোমাকে কে দিয়েছে?
আমার ছোটমামা। আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। আর ফিরে আসেন নি। তিনি আজ দুপুরে হঠাৎ বাসায় এসে উপস্থিত। যাবার সময় আমাকে সাত শ ডলার দিয়ে গেছেন।
তুমি তো বিরাট বড়লোক ভাবি।
বড়লোকের চেয়ে বড় কথা হল–আমি কী যে খুশি হয়েছি তা তোমাকে বোঝাতে পারব না।
তোমার খিলখিল হাসি শুনে বুঝতে পারছি।
ডলারটা পকেটে রাখা হাসান।
হাসান ডলারটা পকেটে রাখল। রীনা বলল, তোমার মুখ এমন শুকনো কেন তোমার কি শরীর খারাপ?
না।
মন খারাপ?
হাসান কিছু বলল না। রীনার গলার স্বর তীক্ষ্ণ হলো, সে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। হাসানের যে মন এতটা খারাপ তা সে বুঝতে পারে না। কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে হাসানকে।
সত্যি কিছু হয় নি?
না।
আমাকে বলতে পার। আমি শ্ৰোতা হিসেবে ভালো। তোমার সমস্যা আমাকে লাভ হবে না। আমি কিছু করতে পারব না। তারপরও শুনতে চাই।
শোনাবার মতো কোনো সমস্যা হয় নি।
বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে? তিতলী বেগম।
হাসান সামান্য হাসল। শার্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে বলল, না। ঝগড়া হয় নি।
আমার মনে হচ্ছে তোমরা ঝগড়া করেছ। ভালোবাসাবাসির সময়ে অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হয়। কঠিন প্ৰেম ভেঙে যায় যায় অবস্থাও হয়।
এসব কিছু না ভাবি। আমাদের কখনো ঝাগড়া হয় নি। মনোমালিন্য হয় নি।
তাহলে কী?
হাসান সহজ গলায় বলল, তিতলীর বিয়ে হয়ে গেছে।
রীনা বিস্মিত হয়ে বলল, কী বললে?
কাল বিকেলে ওদের বাসায় গিয়ে শুনলাম হঠাৎ করে ওর বিয়ে হয়ে গেছে।
কবে বিয়ে হলো?
কবে বিয়ে হলো বলতে পারব না। এত কিছু জিজ্ঞেস করি নি।
ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে?
না। ও বাসাতেই ছিল–দেখা হয় নি।
রীনা কোমল গলায় বলল, হাসান মনটা কি খুব বেশি খারাপ হয়েছে?
হ্যাঁ।
তোমার মন ভালো করার মতো কিছু কি আমি করতে পারি?
কড়া করে এক কাপ কফি বানিয়ে খাওয়াতে পার।
তিতলীর ওপর তোমার কি খুব রাগ হচ্ছে?
না। রাগ হচ্ছে না। এক সময় আমরা দুজন একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। যে যত অন্যায়ই করুক আমরা কেউ কারো ওপর রাগ করব না। আমি প্ৰতিজ্ঞা রক্ষা করছি।
রীনা উঠে দাঁড়াল। নিচু গলায় বলল, আমি তোমার জন্যে কফি নিয়ে আসছি। হাসান বলল, এখন কপি খাব না ভাবি। পরে এক সময় বানিয়ে দিও। কারো হাতে বরং খুব ঠাণ্ড এক গ্লাস পানি পাঠাও–পানির পিপাসা হচ্ছে।
ঘর থেকে বের হওয়ামাত্র রীনার চোখে পানি এসে গেল। এমন একটা কষ্টের ব্যাপার ঘটেছে অথচ সান্ত্বনার কোনো কথা সে বলতে পারছে না। সান্ত্বনা হাসান চাচ্ছেও না। চাইলে নিজেই এসে বলত-। সে বলতে চায় নি। রীনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করেছে। কোনো দরকার ছিল না। কেন সে জিজ্ঞেস করতে গেল? রীনা বারান্দার রেলিং ধরে দাড়িয়ে রইল। রাত ন’টার মতো বাজে। টেবিলে রাতের খাবার দেবার সময় হয়েছে। কমলার মা আজ টেবিলে খাবার দেবে না। তার শরীর ভালো না। সন্ধ্যা থেকে কথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। রীনা শঙ্কিত বোধ করছে। কমলার মার লক্ষণগুলো ভালো মনে হচ্ছে না। তার শরীর খারাপটা দেশে যাওয়ার ছুতো না তো? প্রতিবারই দেশে যাবার আগে কমলার মার শরীর খারাপ করে। কয়েকদিন কোনো কাজকর্ম করে না। শুয়ে বসে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে মন টিকছে না, দেশে যাব। টিনের ট্রাংক গুছিয়ে সে তৈরি। কার সাধ্য তাকে আটকায়। আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে সপ্তাহখানিক থেকে সে ফিরে আসে। ঘরে ছেলের বউয়ের যন্ত্রণায় টিকতে পারে না। এবার যদি ছেলের বউ যন্ত্রণা করে, যদি আদর-যত্ন না করে তাহলে কী হবে? আচ্ছা রীনার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। একটু আগে সে হাসানের এতবড় একটা দুঃসংবাদ শুনেছে। শোনার পরে সে কিনা ভাবছে কমলার মার কথা? রীনা রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো। মনোয়ারার ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় তিনি ডাকলেন।
