হাসান কিছু বলল না। বসল। তার কেমন অদ্ভুত লাগছে। তার মনে হচ্ছে এই ঘরের আলো হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে। ঘরের এক প্রান্তে ষাট পাওয়ারের বাতি জ্বলছে না।
জ্বলছে ফ্লাডলাইটের তীব্র আলো। সেই আলো চোখে লাগছে। চোখ জ্বালা করছে। খুব ঠাণ্ড পানি চোখেমুখে ছিটাতে পারলে ভালো লাগত।
হাসান ভাই!
হুঁ।
চা খাবেন হাসান ভাই? আপনার জন্যে এক কাপ চা নিয়ে আসি?
মেয়েটা এভাবে কথা বলছে কেন? মনে হচ্ছে সে কেঁদে ফেলবে। কেঁদে ফেলার মতো কিছু হয় নি। তিতলী একটা সমস্যায় পড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। এ রকম সমস্যা তো হতেই পারে।
নাদিয়া আমি চা খাব না। তবে একটু পানি খাওয়াতে পার, খুব তৃষ্ণা লেগেছে। আচ্ছা থাক পানি লাগবে না।
হাসান ভাই আপনি বসুন। আমি এক্ষুণি পানি এনে দিচ্ছি।
নাদিয়া ছুটে বের হয়ে গেল। আর প্রায় তৎক্ষণাৎ হাসানের মনে হলো তিতলী এ বাড়িতেই আছে। নাদিয়া ছোট্ট একটা মিথ্যা বলেছে। তার বিয়ে হয়ে গেছে এটা ঠিক সে এখনো শ্বশুরবাড়িতে যায় নি। এই মিথ্যাটার হয়তো প্রয়োজন ছিল।
হাসানকে নাদিয়া গোট পৰ্যন্ত এগিয়ে দিতে এল। হাসান বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করল নাদিয়া কাঁদতে কাঁদতে তার সঙ্গে আসছে। হাসান বলল, কাঁদছ কেন নাদিয়া?
নাদিয়া গায়ের ওড়নায় চোখ মুছল। কিছু বলল না। হাসান বলল, তিতলী ঘরেই আছে তাই না?
নাদিয়া ক্ষীণস্বরে বলল, জ্বি।
ওকে বোলো–সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে ও যেন মন খারাপ না করে।
আপনি ভালো থাকবেন হাসান ভাই।
ভালো থাকব। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা কোরো। আমি জানি তুমি খুব ভালো রেজাল্ট করবে।
কী করে জানেন?
আমার মন বলছে।
হাসান ভাই, আপনি আপার ওপর রাগ করে থাকবেন না।
না রাগ করব কেন? যাই নাদিয়া?
হাসান এগোচ্ছে। ঠিকমতো পা ফেলতে পারছে না। টিপটিপ বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। আশ্চৰ্য কাণ্ড যখনই সে তিতলীর কাছে আসে তখনই বৃষ্টি হয়।
হাসান হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তিতলীদের বাসাটা একবার তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছা! করছে। সবসময় এই জায়গা থেকে সে পেছনে ফিরে তাকায়। আরেকটু এগোলে তিতলীদের বাসা আড়ালে পড়ে যাবে আর দেখা যাবে না। হাসান যতবারই এখান থেকে তাকিয়েছে ততবারই দেখেছে তিতলী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আজ নিশ্চয়ই দেখা যাবে শুধুমাত্র কেন আর কোনোদিনই দেখা যাবে না। হাসানও আর আসবে না। আসা ঠিক হবে না।
তিতলীর বাবা নিশ্চয়ই মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠান করবেন। সেই অনুষ্ঠানে তার দাওয়াত হবে না। তিতলী এমন হৃদয়হীন কাণ্ড কখনো করবে না। ভালো কোনো উপহার তার অবশ্যি দিতে ইচ্ছে করছে। টাকা থাকলে তিতলীকে সে একটা হারমোনিয়াম কিনে দিত। মেয়েটার হারমোনিয়ামের খুব শখ ছিল। তার স্বামী নিশ্চয়ই তিতলীর সেই শখ মেটাবেন। মানুষের সবচেয়ে প্রিয় ইচ্ছা প্রকৃতি সবসময় পূর্ণ করে।
তিতলী কী গানটা জানি তাকে শোনাতে চেয়েছিল? হাসান কিছুতেই মনে করতে পারছে না–মেঘ বলেছে যাব যাব, মেঘের পরে মেঘ জমেছে? নাকি অন্য কোনো গান? না এটা না অন্য কী একটা গান। আশ্চর্য মনে পড়ছে না। হাসান মাথার ভেতর তীব্ৰ চাপ অনুভব করছে। গানের লাইনগুলো মনে না পড়লে কিছুতেই মনের এই চাপ কমবে না। একবার চট করে তিতলীকে জিজ্ঞেস করে এলে কেমন হয়। না না তিতলীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা ঠিক হবে না। সে জিজ্ঞেস করবে নাদিয়াকে। নাদিয়া তার আপার কাছ থেকে জেনে আসবে।
হাসান পেছন দিকে তাকাল। বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই।
বৃষ্টির ফোঁটা বড় বড় হয়ে পড়তে শুরু করেছে। হাসান এগোচ্ছে ক্লান্ত ভঙ্গিতে।
তিতলীদের বাড়ির সামনে
তিতলীদের বাড়ির সামনে বড় একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। কালো রঙের গাড়ি–জানলার কাচ উঠানো বলে গাড়ির ভিতরে কে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।
মতিন সাহেব জানালার পরদার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেন। দুপুরে খাবারের পর তিনি খালি গায়ে হাতপা এলিয়ে ফুলম্পিডে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বড় একটা ঘুম দেন। আজো ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎ ইলেট্রিসিটি চলে যাওয়ায় ফ্যান থেমে গেল, তার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি ‘চামচিকার বাচ্চারা দেশটার বারটা বাজিয়ে দিল’ বলতে বলতে জানালার পরদা সরিয়ে কালো গাড়িটা দেখলেন। তিতলীর বিয়ের পর পর বড় বড় গাড়ির আনাগোনা শুরু হয়েছে। তিতলীর শ্বশুরবাড়ির দিকের সব আত্মীয়স্বজনেরই মনে হয়। গাড়ি আছে। রোজই কেউ না কেউ আসছে। দেখতে ভালো লাগছে। খালি হাতেও কেউ আসছে না। ঘর ভর্তি হয়ে আছে মিষ্টিতে। মিষ্টি খাওয়া তার নিষেধ। সামান্য ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। সেই নিষেধ অমান্য করে তিনি নিয়মিত মিষ্টি খাচ্ছেন। খাওয়া শেষ হবার পর উদাস গলায় বলছেন–মিষ্টিটিষ্টি কী আছে দাও। খাওয়ার পর মিষ্টি খাওয়া রসুলে করিমের সুন্নত। সুন্নত পালন করলে স্বাস্থ্য নষ্ট হয় না।
আজ কে এসেছে? যে এসেছে সে গাড়ি থেকে নামছে না কেন? মতিন সাহেব এই বয়সেও বুকের ভেতর এক ধরনের ছেলেমানুষি উত্তেজনা অনুভব করলেন। তার সেই উত্তেজনা চরমে উঠল। যখন দেখলেন গাড়ি থেকে নামছে শওকত। তিতলীর হাসবেন্ড। কথা ছিল রুসমত না হওয়া পর্যন্ত শওকত এ বাড়িতে আসবে না। কী জন্যে এসেছে কে জানে। মতিন সাহেব ধড়মড় করে উঠে বসলেন। আলনা থেকে নিয়ে একটা পাঞ্জাবি গায়ে দিলেন। সুরাইয়াকে খবর দিতে হবে। গরমের সময় তার একটা বাজে অভ্যাস আছে–ভেতরের মেঝেতে হাতের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া। জামাই যদি এসে দেখে শাশুড়ি মাতারিদের মতো হা করে ঘুমোচ্ছে, মুখের ওপর মাছি ভিনভন করেছেসেই দৃশ্য সুখকর হবে না।
