হাসান বলল, কোন জিনিসটা বানানো?
ওই যে শিউলিগাছে বাবার বড় বোন পুষ্পের মৃত্যুর পর পর ফুল ফুটল।
বানানো বলছেন কেন?
কারণ এই গল্প বাবা আমাকেও বলছেন। তখন গল্পটা অন্য রকম ছিল।
কী রকম ছিল?
আমাকে বাবা বলেছিলেন–তাঁর বড় বোনের মৃত্যুর পর আমাদের দাদাজানের সব রাগ গিয়ে পড়ল গাছটার ওপর–তিনি পাগলের মতো সামান্য মাছকাটা বঁটি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে গাছটা কেটে ফেললেন।
ও আচ্ছা–উনি হয়তো ভুলে গেছেন।
এ রকম একটা বড় ঘটনা ভুলে যাবার কথা তো না।
সবগুলো ডাল হয়তো কাটা হয় নি–একটা রয়ে গিয়েছিল। সেই ডালে ফুল ফুটেছে।
চিত্ৰলেখা খিলখিল করে হসছে। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, বাবাকে তো আপনি দেখি আমার চেয়েও বেশি পছন্দ করেন। এখন একটা ব্যাপার পরিষ্কার হলো।
হাসান ভীত গলায় বলল, কোন ব্যাপার?
বাবা আপনাকে এত পছন্দ করেন কেন সেই কারণটা ধরা গেল। আপনি বাবাকে পছন্দ করেন বলেই বাবা আপনাকে পছন্দ করেন। পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার মানুষ খুব সহজেই ধরতে পারে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে অনেক গল্প করে ফেললাম। এখন আপনি চলে যান।
চিত্ৰলেখা হাসানকে গোট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। খালি পায়ে সে হাঁটছে–হাসানের আবারো মনে হলো এই মেয়ে খালি পায়ে না হেঁটে স্যান্ডেল পায়ে হাঁটলে তাকে মোটেও মানাত না।
দিনটা মেঘলা।
সারাদিন মেঘ ছিল না। এখন কোথেকে গাদা গাদা মেঘ আকাশ অন্ধকার করে ফেলেছে। হাসানের মনে হলো নীল রঙে আকাশকে মানায় না, কালো রঙেই মানায়।
হাসানের হাঁটতে ভালো লাগছে। মেঘলা দিনের বিকেলে হাঁটতে ভালো লাগে। শুধু সারাক্ষণ মনে হয়। একজন প্ৰিয় কেউ পাশে থাকলে আরো ভালো লাগত। তিতলীর বাসায় গিয়ে দেখা যেতে পারে। তাকে যদি কোনোভাবে শুধু বলা যায় –তিতলী আমার খুব ইচ্ছা করছে তোমাকে নিয়ে হাঁটতে। সে যে করেই হোক একটা ব্যবস্থা করবে। তারা হাঁটবে মেঘের দিকে তাকিয়ে। ওই যে একটা গান আছে না–মেঘ বলেছে যাব যাব। ওই গানটা দুজনই মনে মনে গুনগুন করবে।
হাসান সাত টাকা দিয়ে বড়.একটা গোলাপ কিনল। গোলাপ যে এত বড় হয় তার ধারণা ছিল না। মনে হচ্ছে বোম্বাই গোলাপী। বড় বলেই দাম বেশি। প্ৰমাণ সাইজের গোলাপ চার টাকা করে বিক্রি হচ্ছে–এই গোলাপ সাত টাকা। প্রায় ডাবল দাম। গোটা দশেক। কিনতে পারলে তিতলী হতভম্ব হয়ে যেত। টাকা নেই। সাত টাকা খরচ করতেও গায়ে লাগছে।
সাত টাকায় সাত কাপ চা খাওয়া যায়। এক প্যাকেট সন্তা সিগারেট কেনা যায়। এক ডজন দেয়াশলাই কেনা যায়। সাত টাকার এই বোম্বাই গোলাপী একদিনে বাসি হয়ে যাবে। মনে হবে গোলাপটার খারাপ ধরনের ডায়রিয়া হয়েছে। তারপরেও ফেলা হবে না। রেখে দেয়া হবে। তিতলীর যা কাণ্ডকারখানা পাপড়িগুলো সে হয়তো কোনোদিনও ফেলবে না। কোনো এক গল্পের বইয়ের পাতার ভাঁজে ভঁাজে রেখে দিয়ে ভুলে যাবে। হঠাৎ একদিন বই ঝাড়তে গিয়ে পাতায় পাতায় পাওয়া যাবে গোলাপের পাপড়ির অপূর্ব শুটকি। হাসানের মনে হলো একটা গোলাপ নিয়ে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। এক হচ্ছে অমঙ্গলসূচক। এক মানেই একা। সবচে’ মঙ্গলসূচক সংখ্যা হলো দুই। দুই মানেই আমি এবং তুমি। পনেরটা টাকা চলে যাবে। তার সঙ্গে আছে কুড়ি টাকার একটা নোট। ফেরার সময় ফিরতে হবে হেঁটে হেঁটে। হাঁটা মন্দ কী? তিতলীর সঙ্গে দেখা হবার পর হেঁটে হেঁটে ফিরতে খারাপ লাগবে না।
হাসান ফুলওয়ালাকে বলল, ভাই ঠিক এই সাইজের আরেকটা গোলাপ দিন। এই গোলাপগুলোর নাম কী বলুন তো? ফুলওয়ালা বিরস গলায় বলল, তাজমহল।
গোলাপের নাম তাজমহল ঠিক বিশ্বাসযোগ্য না। মোতালেব সাহেবকে একদিন জিজ্ঞেস করতে হবে। তিনি যেহেতু বাগানে বিষ প্রে করেন তিনি জানবেন। হিশামুদ্দিন সাহেবের মেয়েটিও জানতে পারে। তাকে দেখলেই মনে হয় এই মেয়ে সব জানে। কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলে হাসিমুখে বলে দেবে।‘
দুবার কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলল। দরজা খুলে দিল নাদিয়া। হাসান বলল, কেমন আছে নাদিয়া?
নাদিয়া জবাব দিল না। হাসান জানে নাদিয়া জবাব দেবে না। এই মেয়েটা অসম্ভব লাজুক। তবে একবার কথা শুরু করলে ফড়িফড় করে অনেক কথা বলে। ওই দিন খুব কথা বলেছে।
তোমার প্রিপারেশন কেমন হলো?
জ্বি ভালো।
সব বই নিশ্চয়ই ঠোঁটস্থ হয়ে গেছে? নাদিয়া জবাব দিল না। চোখ বড় বড় করে হাসানের দিকে তাকিয়ে রইল। হাসানের একটু অস্বস্তি লাগছে। এই মেয়েটা কখনো তো এ রকম করে তাকায় না। ব্যাপারটা কী?
তিতলী বাসায় আছে?
জ্বি না।
কোথায় গেছে? তার ফুফুর বাসায়?
জ্বি না। হাসান ভাই আপনি বসুন আপনাকে সব বলছি।
হাসান হঠাৎ বুকে একটা ধাক্কা খেল। তিতলীর কি কোনো অসুখ-বিসুখ করেছে? হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে? নাকি তারচেয়েও খারাপ কিছু? না তারচে’ খারাপ কিছু না। তারচে’ খারাপ কিছু হলে নাদিয়া এমন সহজভাবে কথা বলতে পারত না কিন্তু সহজভাবে সে কি কথা বলছে?
কী হয়েছে নাদিয়া?
আপার কাল রাতে হঠাৎ করে বিয়ে হয়ে গেছে। ফুফু একটা ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন–সেই ছেলের সঙ্গে.
তিতলীর বিয়ে হয়ে গেছে?
জ্বি।
ও এখন তার শ্বশুরবাড়িতে?
জ্বি।
ও আচ্ছা। নাদিয়া আমি তাহলে আজ যাই।
হাসান ভাই প্লিজ আপনি এক সেকেন্ডের জন্যে হলেও বসে যান। আপনি এইভাবে চলে গেলে আমি সারা রাত কাঁদব।
