সুরাইয়া ঘুমোচ্ছিলেন না। রান্নাঘরে চায়ের পানি চাপিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। মতিন সাহেব চাপা গলায় বললেন, জামাই এসেছে। জামাই। মেয়েরা কোথায়?
তিনি সুরাইয়ার জবাবের জন্যে অপেক্ষা করলেন না। মেয়েদের ঘরের দিকে ছুটে গেলেন।
তিতলী ঘরেই ছিল। নাদিয়া তার বই নিয়ে গেছে ছাদে। মুখস্থ করার কোনো ব্যাপার থাকলে সে ছাদে চলে যায়। হাঁটতে হাঁটতে সে পড়া মুখস্থ করে।
তিতলী শুয়ে ছিল। হাতপা গুটিয়ে কেন্নোর মতো শুয়ে থাকা। মাথাটা পর্যন্ত বালিশে নেই। বিয়ে হওয়া মেয়ে সবসময় সুন্দর করে সেজেণ্ডজে থাকবে–কী বিশ্ৰী ভাবেই না সে আছে! মতিন সাহেব কড়া গলায় বললেন, তিতলী ওঠ তো! জামাই এসেছেশওকত। যা কথাটথা বল, দেখা কী ব্যাপার। হাত মুখ ধুয়ে চুলটুল বেঁধে তারপর যা।
কলিংবেল বাজতে শুরু করেছে। দরজা খুলে দেবার মতো কেউ নেই। মতিন সাহেব নিজেই দরজা খোলার জন্যে গেলেন।
তিতলী শুয়ে শুয়ে কলিংবেলের শব্দ শুনছে–এক দুই তিন চার। চারবার বেল বাজল। হাসান বেল বাজাত দুবার। দুবারের বেশি। কখনো না। দরজা না খুললে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার দুবার। এই বিষয়ে হাসানের বক্তব্য হচ্ছে দুই হচ্ছে পৃথিবীর সবচে’ সুন্দর সংখ্যা। দুই মানেই আমি এবং তুমি। এটা নিশ্চয়ই হাসানের নিজের কথা না। কোনোখান থেকে শুনে এসে বলেছে। এ রকম গুছিয়ে কথা হাসান বলতে পারে না। সুরাইয়া দরজা ধরে দাঁড়ালেন। চাপা গলায় বললেন, মা শুয়ে আছিস? জামাই এসেছে। ওঠা মা।
তিতলী হাই তুলতে তুলতে বলল, তুমি এ রকম করে কথা বলছি কেন মা? জামাই এসেছে শুনে মনে হচ্ছে তুমি ভয় পাচ্ছি। জামাই এসেছে তো কী হয়েছে?
হাতমুখ ধুয়ে বসার ঘরে যা।
এত ব্যস্ত হচ্ছে কেন মা? বিয়ে যখন করেছি। বসার ঘরে নিশ্চয়ই যাব। তাড়াহুড়ার কিছু নেই। তুমি আমাকে চা খাওয়াও। চা খেয়ে তারপর যাব।
কাপড় বদলাবি না?
তুমি বললে অবশ্যই বদলাব।
সুরাইয়া ক্ষীণস্বরে বললেন–তুই এ রকম করে কথা বলছিস কেন? আমি ভালোমতোই কথা বলছি–তুমি আমাকে নিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে আছ বলে আমার স্বাভাবিক কথাই তোমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ভয় কোরো না মা। আমি হাস্যকর কোনো ড্রামা করব না। গলায় শাড়ি পেঁচিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলে পড়া আমাকে দিয়ে হবে না। কেউ একজন আমাকে দিয়ে একটা খেলা শুরু করেছে। সেই খেলোটা শেষ পর্যন্ত খেলিব।
খেলা মানে? কী খেলা?
ও তুমি বুঝবে না মা। চা এনে দাও। চা খাব। চা খেয়ে গোসল করব। তারপর সেজেণ্ডজে শওকত সাহেবের সামনে দাঁড়াব।
সুরাইয়া চিন্তিত মুখে ফিরে এলেন। তার মন বলছে এই মেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু করবে।
সেই ভয়ঙ্করটা কী তিনি ধরতে পারছেন না। মেয়ের জন্যে এক বৈঠকে এক শ রাকাত নামায তিনি মানত করেছেন। রুসমতের পর মেয়ে যে রাতে প্ৰথম শ্বশুরবাড়ি যাবে সেই রাতে তিনি মানত শেষ করবেন। মানত শেষ না করা পর্যন্ত তিনি শান্তি পাচ্ছেন না।
মতিন সাহেব অতি আনন্দের সঙ্গে তার জামাইয়ের সঙ্গে গল্প করছেন। তার হাতে রথম্যান সিগারেটের প্যাকেট। শওকতের ভদ্রতায় এই মুহূর্তে তিনি মোহিত। শওকত তার জন্যে এক কার্টুন রথম্যান সিগারেট এবং একটা লাইটার নিয়ে এসেছে। এমন সুন্দর লাইটার তিনি তার জন্মে দেখেন নি। কখনো দেখবেন এই আশাও করবেন না। লাইটারটা কালো রঙের। ছোট একটা লাল বোতাম আছে। বোতামে চাপ দিলেই নীলাভ অগ্নিশিখা দেখা দেয়। লাইটারের কর্মকাণ্ড এইখানেই শেষ হয়ে যায় না। যতক্ষণ অগ্নিশিখা জ্বলে ততক্ষণইটুনটুন শব্দ হতে থাকে। লাইটারটা তিনি এর মধ্যেই কয়েকবার জ্বলিয়েছেন নিভিয়েছেন। আবারো জ্বালাতে ইচ্ছে করছে। জামাইয়ের সামনে এ জাতীয় ছেলেমানুষি শোভন হবে না বলে মনের ইচ্ছা চাপা দিয়ে রেখেছেন। তিনি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, তারপর বাবা বল কেমন আছ?
শওকত বিনীতভাবে বলল, জ্বি ভালো।
তুমি কি ধূমপান করা? করলে আমার সামনে সিগারেট খেতে পাের। এইসব প্রিজুডিস আমার একেবারেই নেই। বিলেতে, আমেরিকায় বাপ-ছেলে এক টেবিলে বসে মদ খাচ্ছে–আর আমাদের দেশে… শ্ৰদ্ধা ভক্তি আসলে মনের ব্যাপার। তুমি আমাকে শ্ৰদ্ধা কর কি করা না তা আমার সামনে সিগারেট খাওয়া-না খাওয়া দিয়ে বিচার করা যাবে। না। তুমি কী বল?
জ্বি তা তো ঠিকই।
নাও একটা সিগারেট খাও।
আমি সিগারেট খাই না।
ভেরি গুড। এটা এমন একটা অভ্যাস যার কোনো ভালো দিক নেই–শরীর নষ্ট, স্বাস্থ্য নষ্ট, পরিবেশ নষ্ট, অর্থ নষ্ট…কোটি কোটি টাকা ধোঁয়ায় উড়ে যাচ্ছে–ভাবাই যায় না। ঠিক বলছি না?
জ্বি।
তারপর বল তোমার খবরাখবর বল।
শওকত লজ্জিত গলায় বলল, আমি একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছিলাম।
মতিন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, বল ব্যাপারটা কী?
আমার এক বন্ধুর বিয়ে। আমার ছোটবেলার বন্ধু। ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিয়ে হচ্ছে গাজীপুরে। ওর খুব ইচ্ছা আমি তিতলীকে নিয়ে সেই বিয়েতে যাই…
ইচ্ছে হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। তুমি তিতলীকে নিয়ে যাও। তোমার স্ত্রীকে তুমি নিয়ে যাবে এর মধ্যে আবার অনুরোধ কী?
এখনো ফরম্যালি উঠিয়ে নেয়া হয় নি…
তুমি এইসব ব্যাপার নিয়ে একেবারেই চিন্তা করবে না। কাবিননামা তৈরি হওয়া মানে বিয়ে হয়ে যাওয়া।
ফিরতে হয়তো দেরি হবে। গাজীপুর অনেকখানি দূরে–।
