পুষ্প। ভালো নাম লতিফা বানু।
হ্যাঁ ঠিক আছে।
চিত্ৰলেখার খুব ইচ্ছা আমি তোমাকে কীভাবে গল্পগুলো বলি তা শুনবে। ও আসুক তখন তোমাকে আমার বড় বোনের একটা গল্প বলব।
জ্বি আচ্ছা।
তুমি টাকা-পয়সা ঠিকমতো পাচ্ছি। তো?
পাচ্ছি স্যার।
চিত্ৰলেখা চা নিয়ে ঢুকল। টি-পটভর্তি চা। দুধের পট, চিনির পট। হাসান অবাক হয় লক্ষ করল প্রথম চায়ের কাপটি চিত্ৰেলেখা তার বাবার জন্যে না বানিয়ে তার জন্যে বানাচ্ছে। খুব সাধারণ একটি ভদ্রতা। হাসানের মতো অভাজনের জন্যে এ ধরনের আদ্রতা চিত্ৰলেখার মতো মানুষরা করে না। তার প্রয়োজন নেই।
হাসান সাহেব আপনি কতটুকু চিনি খান?
তিন চামচ।
আজ প্রথমদিন বলে তিন চামচ দিচ্ছি–দয়া করে চিনি খাওয়া কমাবেন। আমি কিন্তু ডাক্তার। অকারণে উপদেশ দেই না। যখন প্রয়োজন তখনি উপদেশ দি।
হিশামুদ্দিন বললেন, তোর স্যান্ডেল পাওয়া গেছে?
চিত্ৰলেখা হাসিমুখে বলল, একপাটি পাওয়া গেছে–অন্য পাটি খোঁজা হচ্ছে।
হিশামুদ্দিন বললেন, তোর কি এক জোড়াই স্যান্ডেল?
হ্যাঁ। এক শ জোড়া স্যান্ডেল দিয়ে আমি কী করব? আমি কি লেডি ইমালডা? বাবা তোমার গল্প শুরু কর।
চিত্ৰলেখা ঠিক তার বাবার মতোই দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছে। একটা হাত তার গালে। সাধারণ নিয়ম হচ্ছে–যে গল্প বলে শ্রোতারা তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে নিয়মের ব্যতিক্রম করে চিত্ৰলেখা তাকিয়ে আছে হাসানের দিকে। তার চোখ চাপা কৌতুকে ঝিলমিল করছে। হিশামুদ্দিন গল্প শুরু করেছেন।
আমাদের নেত্রকোনার বাসায় একটা শিউলিগাছ ছিল। শিউলিগাছ জংলি ধরনের হয়। খসখসা পাতা–কুপড়ির মতো বড় হয়। জঙ্গলে জন্মালেই এই গাছগুলোকে মানাত। শিউলিগাছের আরো সমস্যা আছে–শুয়োপোকা। বৎসরের একটা সময়ে আমাদের শিউলিগাছ ভর্তি হয়ে যেত শুয়োপোকায়। সেই সময় বাবা ঠিক করতেন গাছ কেটে ফেলা হবে। বড় আপার জন্যে কাটা হতো না। শিউলি ফুল তার খুব প্রিয় ছিল। গাছটার ফুল ফোঁটাবার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। শীতের সময় উঠোন ফুলে ফুলে ভরে থাকত। বড়। আপা বলতেন–জোছনার চাদর। যাই হোক এক বৎসর হঠাৎ কী হলো গাছটায় ফুল ফুটিল না। একটা ফুলও না। আমরা সবাই খুব অবাক হলাম–বড়। আপা হলেন অস্থির। গাছটায় একটা ফুলও ফুটবে না–এ কেমন কথা। প্রায় সময়ই দেখতাম কাজকর্ম সব ছেড়ে দিয়ে বড়। আপা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই শীতেই বড় আপা মারা গেলেন। অতি তুচ্ছ কারণেই তাঁর মৃত্যু হলো। বাথরুমে পা পিছলে পড়ে মাথায় ব্যথা পেলেন। সামান্য ব্যথা–তেমন কিছু না। রান্নাবান্না করলেন। আমাদের খাওয়ালেন। নিজে কিছু খেলেন না–তার নাকি শরীরটা ভালো লাগছে না, মাথা ঘোরাচ্ছে। তিনি বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে রইলেন। তার আধঘণ্টা পর বাবাকে ডাকলেন। বাবা বিছানায় তার পাশে বসলেন। বড় আপা বললেন, বাবা তুমি আমার মাথার চুল বিলি করে দাও। তারপর হঠাৎ করে বললেন, বাবা আমি মরে যাচ্ছি। বাবা ভয় পেয়ে আমাদের সবাইকে ডাকলেন। তার ঘণ্টাখানিকের মধ্যেই বড়। আপা মারা গেলেন। নেত্রকেনা বড় মসজিদের গোরস্থানে তার কবর হলো। হতদরিদ্র পরিবারের মৃত্যুশোক স্থায়ী হয় না। সাতদিনের মাথায বাসার সব মােটামুটি ঠিক হয়ে গেল। সেই সময় একটা আনন্দের ব্যাপারও ঘটল-বাবা একটা চাকরি পেয়ে গেলেন। চাকরি তেমন ভালো না, তবে বাবা খুব উল্লসিত-কারণ এই চাকরিতে বাড়তি আয়ের সুযোগ-সুবিধা খুবই ভালো। মাছ সাপ্লাইয়ের কাজ। ভাটি অঞ্চলের বড় বড় মাছ কাঠের পেটিতে বরফ দিয়ে ভরে ঢাকা পাঠানো। বরফের প্যাকিং হয় রাতে। এর মধ্য দু-একটা মাছ এদিকওদিক করা যায়। তাতে কেউ কিছু মনেও করে না। এই ধরনের ক্ষতি হিসেবের মধ্যে ধরা থাকে। বাবা আনন্দিত গলায় বললেন–এইবার দেখা যাবে তোরা কে কত মাছ খেতে পারিস। মাছের বড় বড় পেটি খেয়ে দেখবি এক সময় মাছের ওপর ঘেন্না ধরে যাবে। তখন মাছের ছবি দেখলেও ‘ওয়াক থু’ করে বমি করে ফেলবি।
চাকরি শুরু করার তিন দিনের মাথায় বাবা বিশাল এক চিতল মাছ নিয়ে শেষরাত্রে বাসায় চলে এলেন। মহা উৎসাহে চিতল মাছ রান্না করলেন। সকালে নাশতার বদলে বারান্দায় পাটি পেতে চিতল মাছের পেটি দিয়ে আমরা ভাত খেতে বসলাম। আর তখনি আমার মেজো বোন ময়না চেঁচিয়ে বলল, দেখ দেখ! আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখলাম শিউলি গাছের নিচটা ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। শিউলিগাছ আবার ফুল ফোঁটাতে শুরু করেছে।
হাসান আজ এই পর্যন্তই।
চিত্ৰলেখা বলল, হাসান সাহেব। আপনি কি আরেক কাপ চা খাবেন?
জ্বি না।
আপনি কি বাবার সব গল্প লিখে ফেলেছেন?
জ্বি।
পরের বার যখন আসবেন–লেখা কপিগুলো নিয়ে আসবেন। আমি একটু পড়ে দেখব। আপনি পরের বার কবে আসবেন?
আমি প্রতি বুধবারে আসি। আপনি বললে আমি কালই দিয়ে যাব।
প্লিজ। আমার খুব পড়ার ইচ্ছা। চলুন আমি আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
না না এগিয়ে দিতে হবে না।
অবশ্যই এগিয়ে দিতে হবে। আমি খুবই ভদ্র মেয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে চিত্রলেখা বলল, হাসান সাহেব!
জ্বি।
বাবার গল্পগুলো শুনতে আপনার কেমন লাগে?
ভালো লাগে।
বাবা খুব গুছিয়ে গল্প বলেন। লেখক হলেও তিনি খুব নাম করতেন।
জ্বি।
তবে আপনাকে একটা গোপন তথ্য দিচ্ছি—বাবার গল্পে কিছু বানানো ব্যাপার আছে। আপনি সামনে ছিলেন বলে আমি বাবাকে ধরলাম না। আপনি সামনে না থাকলে অবশ্যই ধরতাম।
