মোতালেব সাহেব আমি কি চলে যাব?
থাকুন কিছুক্ষণ। চা খান, দেখি স্যার কী বলেন।
হাসান বসে পড়ল। মোতালেবের এই ঘরটা ডাক্তারদের ওয়েটিং রুমের মতো। দেয়ালের সঙ্গে ঘেষে একসারি বেতের চেয়ার সাজানো। চেয়ারগুলোতে এককালে গদি ছিল–এখন নেই। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল। ভারি কালো রঙের টেবিলের ওপর ময়লা কয়েকটা ম্যাগাজিন। ঘরের এক কোনায় ছোট্ট টেবিল নিয়ে ডাক্তার সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো বিরক্তমুখে মোতালেব বসে থাকে। মোতালেবের হাতে মুনশি। আমিরুদিনের লেখা চটি একটি বই, নাম ‘প্রেমের সমাধি’। বইটির কভারে একটা ফুটন্ত ফুলের ছবি। সেই ফুলের ওপর কুৎসিতদর্শন একটা পোকা উড়ছে। পোকাটার গায়ের রং ঘনকৃষ্ণ, চোখ টকটকে লাল। পোকাটা খুব সম্ভব ভ্রমর, তবে দৈত্যাকৃতির ভ্রমর। প্রেমের সমাধি নামের এই চটি বইটি মোতালেব গত দু মাস ধরে পড়ছে। হাসান ঠিক করে রেখেছে মোতালেব সাহেবের এই বই পড়া শেষ হলে সে বইটা তার কাছ থেকে ধার করে নিয়ে পড়ে দেখবে, ব্যাপারটা কী?
ডাক্তারের ঘরে যেমন ওষুদের গন্ধ থাকে, এই ঘরেও তেমনি ওষুধের কড়া গন্ধ। এই গন্ধ-রহস্য হাসান বের করেছে। ইনসেকটিসাইডের গন্ধ। বাগানের ফুলগাছে প্রতি সপ্তাহে একবার ক্ষেপ্ৰ করে ইনসেকটিসাইড দেয়া হয়। ইনসেকটিসাইডের বোতল এই ঘরের আলিমিরায় তালবন্ধ থাকে। আলমিরায় হাতে লেখা একটা নোটিশ আছে–
‘বিপদজণক’
জনক বানানে মূর্ধণ্য ন ব্যবহার করা হয়েছ বলেই বোধহয় নোটিশটা দেখলেই গা ছমছম করে। এই ঘরে সময় থেমে থাকে। পাঁচ মিনিট বসে থাকলেই মনে হয় পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকা হয়েছে। হাসান নড়েচড়ে বসল। সময় থামা অবস্থাতেও অনেকক্ষণ পার হয়েছে।
মোতালেব সাহেব!
মোতালেব বই থেকে মুখ তুলল। তার দৃষ্টি অপ্রসন্ন, ভুরু কেঁচকানো। হাসান অপ্ৰস্তুত ভঙ্গিতে বলল, চলে যাব?
বাজে কটা?
সাড়ে তিনটা।
আরো পাঁচ-দশ মিনিট বসে চলে যান।
আপনি কি একটু জেনে আসবেন?
জেনে আসা যাবে না। এতদিন পর স্যারের মেয়ে এসেছে। স্যার মেয়ের সঙ্গে গল্প কৰ্ম্মশ্ৰমৰ কি কের আন উপস্থিত হব। বাংলগ ছাড়া কথা বলবেন না।
জ্বি আচ্ছা।
চারটা পৰ্যন্ত অপেক্ষা করুন। তিনটা থেকে চারটা এই এক ঘণ্টার পেমেন্ট নিয়ে হাসিমুখে চলে যাবেন। বাকিটা আমি দেখব।
জ্বি আচ্ছা। স্যারের মেয়ে দেখতে কেমন?
দেখতে কেমন তা দিয়ে আপনার কোনো দরকার আছে?
জ্বি না।
তাহলে জানতে চান কেন? স্যারের মেয়ে কালো কুৎসিত হলেও আপনার কিছু যায় আসে না, ডানাকাটা পরী হলেও না।
তা তো বটেই।
হাসান একটা ম্যাগাজিন হাতে নিল। সময় কাটানোর জন্যে রোমহর্ষক অপরাধের কাহিনী পড়া ছাড়া কোনো গতি নেই। অপরাধের কাহিনী ছাড়া এখন কোনো মাগাজিন প্ৰকাশিত হয় না। দেশে তেমন কোনো মজাদার অপরাধের কাহিনী পাওয়া না গেলে বিদেশী অপরাধের কাহিনী ছেপে দেয়া হয়। লস এঞ্জেলসে তিন সমকামী তরুণীর গোপন কাহিনী জাতীয় মজাদার কেচ্ছা।
আপনি কি হাসান সাহেব?
হাসান ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল।
এক শ ভাগ খাঁটি বাঙালি মেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে। কেউ না বলে দিলেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এই মেয়ের নাম চিত্ৰলেখা। বাবার মতো টকটকে গায়ের রং না–শ্যামলা মেয়ে। মাথাভর্তি চুল–চুল নিয়ে সে খানিকটা বিব্রত। একটু পর পর মুটো করে চুল ধরছে। খুব সাধারণ সুতির শাড়ি পরেছে। মনে হচ্ছে এই সাধারণ শাড়িটা না পরলে তাকে মানাত না। সবচে’ মজার ব্যাপার মেয়েটির পায়ে স্যান্ডেল নেই। খালি পা। খালি পাতেও তাকে মানিয়েছে। মনে হচ্ছে কোনো স্যান্ডেলেই এই মেয়েকে মানাত না। এক ধরনের মানুষ আছে যাদের সবকিছুতেই মানায়। এও বোধহয় সে রকম কেউ।
আপনি হাসান সাহেব তো?
জ্বি।
আপনার না তিনটার সময় বাবার ঘরে যাবার কথা? আমি আপনার জন্যেই বসে ছিলাম।
আমার জন্যে?
জ্বি। আপনাকে বাবা কীসব গল্প বলেন এইসব আর আপনি কীভাবে নোট করেন তাও দেখব। ও আচ্ছা আমি তো আমার পরিচয় দিই নি। আমার নাম চিত্ৰলেখা।
জ্বি আমি বুঝতে পেরেছি।
কীভাবে বুঝলেন? ও আচ্ছা বোঝাটাই তো স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই এর মধ্যে শুনে ফেলেছেন যে আমি এসেছি তাই না?
আসুন আমার সঙ্গে।
কোথায়?
বাবা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
হাসান পেছনে পেছনে যাচ্ছে। তার খুব ইচ্ছে করছে জিজ্ঞেস করে–আপনি খালি পায়ে হাঁটছেন কেন? জিজ্ঞেস করল না। এ ধরনের প্রশ্ন করার মতো ঘনিষ্ঠতা মেয়েটির সঙ্গে হয় নি। কোনোদিন হবেও না।
হাসান সাহেব?
জ্বি।
আমেরিকার কেউ যদি আমার নাম জিজ্ঞেস করে আমি কী বলি জানেন? আমি বলি আমার নাম মিস পিকচার ড্র। আমার এই নামটিই এখন চালু। অনুবাদটা ভালো হয়েছে না?
জ্বি।
যান। আপনি বাবার সঙ্গে বসুন, আমি চা নিয়ে আসছি।
হিশামুদ্দিন সাহেব আজ একটা ধবধবে পাঞ্জাবি গায়ে বসে আছেন। হাসান তাকে খালি গায়ে দেখেই অভ্যস্ত। পাঞ্জাবিতে তাকে অন্যরকম লাগছে। তার সামনে পানের বাটাও নেই। হাসানের মনে হচ্ছে চিত্ৰলেখার উপস্থিতির সঙ্গে ঘটনা দুটি সম্পর্কিত।
স্যার স্নামালিকুম।
হাসান বস। আমার মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে?
জ্বি।
আমার মেয়ের মধ্যে এমন কী দেখলে চোখে পড়ার মতো?
হাসান ইতস্তত করে বলল, উনি খালি পায়ে হাঁটছেন।
হিশামুদ্দিন হাসতে হাসতে বললেন–আরে দূর। খালি পায়ে হাঁটছে কারণ স্যান্ডেল খুঁজে পাচ্ছে না। ওর সবচে’ অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ওর কাছে সব মানুষই চেনা। অতি আপন। তোমার সঙ্গেও নিশ্চয়ই খুব চেন্না ভঙ্গিতে কথা বলেছে। আমার বড় বোনের মধ্যেও এই ব্যাপারটা ছিল। আমার বড়বোনের নাম কি তোমার মনে আছে?
