আমিও একজাক্ট এই কথাই শম্পাকে বলেছি। আমাদের দেশের ব্যাপার তো জানিস–সবাই বলাবলি করছে বিদেশ যাওয়া-টাওয়া সব ভাওতাবাজি। বিদেশে যাচ্ছে এই ভাওতা দিয়ে বিয়ে করেছে। আমার মনটা যে কী খারাপ তুই দেখে বুঝবি না।
মন খারাপের কথা বাদ দে তো। ভবির কথা বল। ভাবি দেখতে কেমন?
দেখতে মোটামুটি মানে এভারেজ আর কি। কিন্তু অসাধারণ একটা মেয়ে। অন্তরে এত মায়া তুই কল্পনাও করতে পারবি না। আমার সম্পর্কে কেউ একটা কথা বললে তার চোখ দিয়ে চেী চেী করে পানি পড়ে। একদিন হয়েছে কি শোেন–সকালবেলা ওদের বাসায় গিয়ে নাস্তা করার কথা। যেতে পারি নি। রাত ন’টার দিকে গেছি। গিয়ে শুনলাম–রাত ন’টা পর্যন্ত তোর ভাবি না খেয়ে বসে আছে। সলিড ফুড তো খায়ই নি–পানি পর্যন্ত না–এটা পাগলামি না!
পাগলামি হলেও সুন্দর পাগলামি।
তোরা যতই সুন্দর বলিস-আমি খুব রাগ করেছি। শম্পাকে কঠিন কঠিন কিছু কথা বলব বলে ভেবেছিলাম, শেষ পর্যন্ত বলি নি। হাইলি সেনসেটিভ মেয়ে তো-কঠিন কথা শুনে কী করে না করে তার ঠিক আছে। চুপচাপ থাকাই ভালো।
ভাবি কোথায় এখন? তোর সঙ্গে?
আমার সঙ্গে থাকবে কীভাবে? আমি থাকি মেসে। বউ নিয়ে তো আর মেসে উঠতে পারি না। শম্পা তার বড় মামার সঙ্গে থাকে। আমি প্রতিদিন কমপক্ষে একবার হলেও দেখে আসি। একবার রাতে ছিলামও। ওদের বাসা খুবই ছোট। দুই কামরার বাসা। এতোগুলো মানুষ। আমরাই যদি একটা ঘর দখল করে থাকি তাহলে হবে কীভাবে? আর নিউলি ম্যারিড কাপল তো আর অন্যদের সঙ্গে খাটে আড়াআড়িভাবে ঘুমোতেও পারে না। হাসান হাসছে। লিটন এখনো ছেলেমানুষ রয়ে গেছে। কী সহজ আন্তরিক ভঙ্গিতেই না সে গল্প করছে!
হাসান শম্পার ছবি দেখবি? সঙ্গে আছে? ওদের ক্যামেরায় কিছু ছবি তুলেছিলাম। ছত্ৰিশটা স্নাপ নিয়েছি আটটা এর মধ্য নষ্ট হয়েছে। এই দেখ।
হাসান ছবি দেখছে। লিটন গভীর আগ্রহে প্রতিটি ছবি ব্যাখ্যা করছে।
শম্পার সঙ্গে যে ছোট মেয়েটা দেখছিস সে শম্পার মামাতো বোন। ক্লাস টুতে পড়ে। এমনিতে খুব শান্ত মেয়ে, একটা বিচিত্র অভ্যাস আছে। আদর করে কামড় দেয়। ওইতো পরশুদিন হঠাৎ শম্পার নাক কামড়ে ধরল। এক্কেবারে রক্ত বের করে দিয়েছে।
এই ছবিটা দেখ শম্পার গলায় যে হারটা দেখতে পাচ্ছিস এটা রিয়েল না ইমিটেশন। হাসান বলল, ভাবি তো দেখতে খুব সুন্দর। তুই কী বলছিস মোটামুটি! সামনাসামনি আরো সুন্দর দেখা যায়। ছবিতে তেমন ভালো আসে নি। ক্যামেরাটাও তত ভালো ছিল না–দেখ না। সবাই আউট অব ফোকাস। তোকে একদিন নিয়ে যাব। শম্পা খুব খুশি হবে। তোর কত গল্প করেছি।
আমার আবার কী গল্প? তোর গল্পের কি শেষ আছে? তোর টাকা নেই পয়সা নেই–তারপরেও তুই আমাদের জন্যে যা করিস সেটা কে করে? তোর একটা গল্প শুনে শম্পার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। গল্পটা হচ্ছে…
থাক তোকে গল্প বলতে হবে না।
আহা শোন না, এই গল্প আমি যে কতজনকে করেছি–ওই যে কলেজে পড়ার সময় আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম, তুই খবর পেয়ে….
চুপ কর তো।
আচ্ছা চুপ করলাম, শম্পাকে কবে দেখতি যাবি? হাত একদম খালি। খালি হাতে তাকে দেখতে যাব। কীভাবে। কিছু তো নিয়ে যেতে হবে। দেখি তিন-চার দিনের মধ্যে যাব।
তোকে এসে নিয়ে যাব। শুক্রবারে আসি? কিছু নিতে হবে না, তোকে দেখলেই খুশি হবে। উপহার দিয়ে তাকে খুশি করার ক্ষমতা তো আমার নেই। মানুষ দেখিয়ে খুশি করা সেটাও তো কম না। আজ উঠি রে।
হাসান তাকে সঙ্গে করেই বেরোল। আজ বুধবার-হিশামুদিন সাহেবের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। হিশামুদিন সাহেবকে এখনো তার নিজের চাকরির কথা বলা হয় নি। লজ্জার কারণে বলা হচ্ছে না-লিটনেরটা বল দেখবে নাকি? এই মুহুর্তে তারচে’লিটনের চাকরি। অনেক বেশি দরকার।
রাস্তায় বের হতেই আশরাফুজ্জামান সাহেবকে দেখা গেল। তিনি কয়েক পলক তাদের দিকে তাকিয়ে হুট করে পাশের গলিতে ঢুকে পড়লেন। আজকাল তিনি ছেলেদের দেখলে সরে পড়েন। হাসানের খুব মায়া লাগছে। মানুষের কত পরিবর্তনই না হয়! একটা সময় ছিল তার পায়ের শব্দেই বুক ধড়ফড় করত। সেই মানুষ আজ পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। পথেঘাটে হঠাৎ দেখা হলে এমন বিব্রত হন।
লিটন বলল, চাচাজান কি তোকে টাকাটা দিয়েছেন? এক হাজার টাকা?
হাসান বলল, না। তা
কে কিছু জিজ্ঞেস করিস না। বুড়ো মানুষ ভুলে গেছেন। জিজ্ঞেস করলে লজ্জা পাবেন।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করব না।
প্ৰচণ্ড রোদ উঠেছে। এই রোদে হাঁটতে কষ্ট হয়। হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। হাসানের পকেটে কুড়িটা মাত্র টাকা। কুড়ি টাকার একটা চকচকে নোট। নোটটা খরচ করা যাবে না। বেকারদের মধ্যে অনেক কুসংস্কার আছে। পকেট একেবারে শূন্য করতে নেই। হাসান ঘড়ি দেখল। হেঁটে যেতে গিয়ে দেরি হয়ে যাবে না তো?
দেরি হলেই হিশামুদ্দিন সাহেবের পি.এ. মোতালেব ভুরু কুঁচকে বলবে, মাই গড় আজো দেরি? ভাবটা যেন সে সবসময় দেরি করেই যাচ্ছে।
স্যার তো মনে হয়। আজ কথা বলতে পারবেন না।
হাসান বলল, ও আচ্ছা। মোতালেব হাই তুলতে তুলতে বলল, স্যারের মেয়ে এসছে— ‘চিত্ৰলেখা’; সে স্যারের সব টাইমটেবিল ভণ্ডুল করে দিচ্ছে।
হাসান বলল, চলে যাব?
মোতালেব এই প্রশ্নের জবাব দিল না-হাই তুলল। গুরুত্বহীন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের শরীরে অক্সিজেনের অভাব হয়। তাকে ঘন ঘন হাই তুলতে হয়। মোতালেব এই জন্যেই হাই তুলছে।
