না—কোনটা?
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।
তিতলীর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।
কী হয়েছে তিতলী?
কিছু হয় নি।
কাঁদছ কেন?
বুঝতে পারছি না কেন। হঠাৎ খুব মনটা খারাপ লাগছে।
মন খারাপ লাগছে কেন?
জানি না কেন? জানলে তোমাকে জানতাম।
বাসায় চলে যাবে?
হুঁ।
বেশ তো চল যাই।
তিতলী চারটার আগেই বাসায় পৌঁছে গেল এবং রাত আটটায় তার বিয়ে হয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজির এক লেকচারের সঙ্গে। ছেলের মামারা বললেন–অনুষ্ঠান পরে হবে, আকদ হয়ে যাক। আজকের দিনটা খুব শুভ। ছেলের দাদি খুবই অসুস্থ। পিজিতে ভর্তি হয়েছেন। যে-কোনো সময় মারা যাবেন। মৃত্যুর আগে নাতবউয়ের মুখ দেখে যেতে চান।
কীভাবে কী ঘটল তিতলী নিজেও জানে না। তিতলীর শুধু মনে আছে তার বাবা কাঁদতে কাঁদতে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন–তুই আপত্তি করিস না মা। আমি দরিদ্র মানুষ–এমন ভালো ছেলে তোর জন্যে আমি যোগাড় করতে পারব না। তোর কী সমস্যা আমি কিছু শুনতে চাই না। মা রে তুই আমার প্রতি দয়া কর। তুই রাজি না হলে আমি বিষ খাব রে মা। সত্যি বিষ খাব। তোর মারি নামে আমি কসম কেটে বলছি বিষ খাব। তিতলী তার বাবাকে কোনোদিন কান্দতে দেখে নি–সে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। সে তাকাল তার মার দিকে। ফিসফিস করে বলল, মা আমি কী করব? সুরাইয়া জবাব দিলেন না। তিনিও কাঁদছেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। নাদিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। তিতলী নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, নাদিয়া আমি কী করব?
নাদিয়া বলল, আপা তুমি একজনের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছ। প্ৰতিজ্ঞা ভঙ্গ কোরো না।
কিন্তু বাবা কাঁদছেন। হাউমাউ করে কাঁদছেন। বাবাকে তিতলী কখনো কাঁদতে দেখে নি।
পিজি হাসপাতালের আঠার নম্বর কেবিনে তিতলী দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে সুন্দর চেহারার একটি যুবক। যুবকের মুখ হাসি হাসি। এই যুবকটি তার স্বামী। তার নাম যেন কী? আশ্চর্য নামটা মনে পড়ছে না।
বৃদ্ধ এক মহিলা আধবোজা চোখে তাকিয়ে আছেন। তার নাকে অক্সিজেনের নল। কাঠির মতো সরু সরু হাত। হাতের নীল রগ বের হয়ে আছে। ভদ্রমহিলার বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
খুব গয়না-টয়না পরা এক মহিলা তিতলীকে বললেন, তোমার দাদিশাশুড়ি, সালাম কর।
তিতলী নড়ল না। বৃদ্ধা অস্পষ্ট জড়ানো স্বরে কী যেন বললেন। তিতলী সেই কথার কিছু বুঝতে না পারলেও অন্যরা বুঝল। বৃদ্ধার বালিশের নিচ থেকে গয়নার বাক্স বের করে আনল। বাক্স খুলে গয়না বের করে বৃদ্ধার হাতে দেয়া হলো। বৃদ্ধ তিতলীর দিকে চোখের ইশারা করলেন। গয়নাটা নিতে বললেন। পুরনো দিনের পাথর বসানো হার। বেদানার দানার মতো লাল লাল পাথর–।
তিতলীর মনে হচ্ছে লাল পাথরগুলো যেন চোখ। যেন বৃদ্ধার হাতের হারটা অনেকগুলো লাল চোখে তিতলীকে দেখছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটা হাসছে। এই যুবক তার স্বামী। তার নাম তিতলীর মনে পড়ছে না।
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না।
গানটার সুর যেন কী? আচ্ছা এই বৃদ্ধার কী হয়েছে? ক্যানসার?
লিটনকে কেমন জানি অন্যরকম লাগছে
লিটনকে কেমন জানি অন্যরকম লাগছে। কোথাও কোনো পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তনটা সূক্ষ্ম বলে ধরা যাচ্ছে না। চুল কেটেছে কি? না চুল কাটে নি। মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল। চুলের জন্যে কলেজে তার নাম ছিল শ্যাওড়াগাছ। লিটন বলল, তুই এ রকম করে তাকিয়ে আছিস কেন? কি দেখছিস?
হাসান বলল, তোকে দেখছি।
আমাকে দেখার কী আছে?
তোকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।
লিটন বলল, মনটা খুব খারাপ সেইজন্যেই বোধহয় অন্যরকম লাগছে।
মন খারাপ কেন?
লিটন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমাকে দেখে বুঝতে পারছিস না কেন মন খারাপ? মালয়েশিয়া শেষ পর্যন্ত যেতে পারি নি। ঢাকা এয়াপোটে আটকে দিয়েছে। ফলস ভিসা।
হাসান বিস্মিত হয়ে বলল, তোর মালয়েশিয়া যাবার কথা ছিল নাকি?
তুই জানিস না?
না।
আমি যে বিয়ে করেছি। সেটা জানিস?
না জানালে জানব কীভাবে? আমি তো অন্তৰ্যামী না।
চাচাজান তোকে বলেন নি। আমি তাকে বলে গেছি। আমার বিয়ে তো আর কার্ড ছাপিয়ে হবে না যে কার্ড দিয়ে যাব। সস্তার বিয়ে। বন্ধুবান্ধব যে কজনকে বলেছিলাম কেউ আসে নি। কেউ না এলেও তুই আসবি সেই ব্যাপারে। আমি নিশ্চিত ছিলাম। বলতে গেলে একা একা বিয়ে করেছি। মনটা এত খারাপ হয়েছে।
মন খারাপ হবার কথাই। বুঝলি হাসান আমি ঠিক করেছিলাম আর কোনো দিন তোর সঙ্গে কথা বলব না। তোর বিয়ের কথা জেনেও আমি যাব না। তুই ভাবলি কী করে? লিটন আনন্দিত গলায় বলল, শম্পাকেও আমি এই কথা বলেছি। আমি বলেছি— শোন শম্পা, আর কেউ আসুক না। আসুক হাসান আসবেই। শম্পা বলেছে উনি কি আলাদা? আমি বললাম হাসান আলাদা কি আলাদা না তা আমি জানি না, হাসান আসবে এইটুকু জানি।
হাসান বলল, বাবা আমাকে কিছু বলেন নি, বোধহয় ভুলে গেছেন।
বুড়ো মানুষ ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক। চাচাজানের কাছে এক হাজার টাকাও দিয়েছিলাম। ভেবেছি বিদেশ চলে যাচ্ছি যে যা টাকা পয়সা পেত দিয়ে যাই। সেই যাওয়া আটকে গেল। কী যে সমস্যার মধ্যে পড়েছি! আমার জন্যে কষ্ট হচ্ছে না। শম্পার জন্যে কষ্ট হচ্ছে। ও খুব কান্নাকাটি করে।
ভাবিকে কান্নাকাটি করতে নিষেধ করো। তুই না যাওয়াতে দুজন একসঙ্গে থাকতে পারছিস।
