আড়ঙের সামনে হাতে নিয়ে নিয়ে মাছ বিক্রি করে। ধানমণ্ডি লেকের মাছ। এক ব্যাটা জোর করে গছিয়ে দিয়েছে। সস্তা পড়েছে–এক শ টাকা।
তুমি খেয়ে এসেছ?
হুঁ।
কী দিয়ে খেলে?
তারেক কাপড় ছাড়তে ছাড়াতে বলল, সাধারণ খাবার–ভাজ্যভুজি। তবে নতুন একটা জিনিস খেলাম কালিয়াজিরার ভর্তা। একটু তিতা তিতা। তবে খেতে ভালো। কালিয়াজিরা ভর্তা দিয়ে এক প্লেট ভাত খেয়ে ফেলেছি।
লাবণীর কাছ থেকে রেসিপি নিয়ে এসো, আমি কালিয়াজিরা ভর্তা বানাব।
তারেক অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা। বলেই চমকে গেল। রীনার কাছে সে বলে গেছে নাপিতের কাছে যাচ্ছে। সেখানে রীনা। হুট করে লাবণীর প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছে এবং সেও স্বীকার করে ফেলেছে। তারেক অসহায় ভঙ্গিতে বলল, এক কাপ চা খাব রীনা।
রীনা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, হাত মুখ ধোও চা নিয়ে আসছি।
চিনি দিও না। একটা বয়সের পরে চিনি ছেড়ে দেয়া দরকার।
আচ্ছা চিনি কমই দেব।
তারেক শোবার ঘরের চেয়ারে বসে আছে। বিছানায় টগর এবং পলাশ দুই ভাই জড়ােজড়ি করে শুয়ে আছে। তারা ঘুমোয় দাদাদাদির সঙ্গে, আজ এখানে চলে এসেছে। ওদেরকে দাদির ঘরে পার করতে হবে। কাজটা করতে হবে খুব সাবধানে— একবার ঘুম ভেঙে গেলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে।
রীনা চা এনে তারেকের সামনে রাখল। টগরকে খুব সাবধানে কোলে নিয়ে রওনা হলো। তারেক বলল, হাসানের কাছ থেকে একটা সিগারেট নিয়ে এসো তো। রীনা বলল, আচ্ছা।
তারেক চায়ে চুমুক দিচ্ছে। সে খুবই অসহায় বোধ করছে। রানা যদি আবারো লাবণীর প্রসঙ্গ তোলে সে কী বলবে। হুট করে রীনা লাবণীর প্রসঙ্গ তুললই বা কেন? হাসান কি তাকে কিছু বলেছে? বলার তো কথা না।
এই নাও সিগারেট।
থ্যাংক য়্যু।
তুমি দেখি পুরোপুরি সিগারেট ধরে ফেলছ।
আরে না টেনশনের সময় দু-একটা খাই।
এখন কি তোমার টেনশানের সময়?
কী যে বল টেনশনের কী আছে! তুমি কি ভাত খেয়েছ?
না, তোমার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।
ব্যাপারটা কী তোমাকে বলি
কিছু বলতে হবে না।
আরে শোন না। বোস তো খাটে।
রীনা খাটে বসল। তারেক সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল–আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাশিয়ার শামসুল কাদের সাহেবের গলব্লাডার অপারেশন হয়েছে। সাকসেসফুল অপারেশন, হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দিয়েছে। বাসায় এসে আবার আগের মতো ব্যথা। ডাক্তার বলল ব্যথাটা সাইকোলজিক্যাল। ব্যথা হবার কোনো কারণ নেই। যাই হোক আমি দেখতে গেলাম, গিয়ে দেখি আমাদের অফিসের লাবণী। সেও দেখতে এসেছে। তার বাসা কদের সাহেবের বাসার সামনে। রাস্তার এমাথা ও মাথা। ফেরার সময় লাবণী বলল, স্যার আমার বাসাটা দেখে যান। এমন ধরল না যাওয়াটা অভদ্রতা মুগেলাম। লাবণীর বাবা ছিলেন বাসায় তিনি না খাইয়ে ছাড়বেন না। এই হলো
রীনা বলল, তোমার সিগারেট খাওয়া তো হয়েছে। চল শুয়ে পড়ি।
তারেক হাই তুলতে তুলতে বলল, চল। সে খুবই ভালো বোধ করছে। খুব গুছিয়ে সে সুন্দর একটা মিথ্যা গল্প ফেধেছে। গল্পটা বলেছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে। রীনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে গল্পটা বিশ্বাস করছে। মেয়েরা সত্যির চেয়ে মিথ্যাটাকে সহজে গ্ৰহণ করে।
রীনা।
হুঁ।
একটা পান দাও না। চা খেয়ে মুখটা মিষ্টি হয়ে আছে। ঘরে পান আছে না?
আছে।
রীনা পান আনতে গেল। তারেক বেশ আয়েশ করে পা নাচাচ্ছে। সে বেশ আনন্দিত। তাৎক্ষণিকভাবে জটিল একটা মিথ্যা তৈরির আনন্দ। রীনা। এই গল্পটা বিশ্বাস করেছে জটিলতার কারণে। কারণ রীনা জানে তার ভেতরে কোনো জটিলতা নেই।
রীনা পান দিয়ে মশারির ভেতর ঢুকল। মশারি ভর্তি মশা। এত মশা ঢোকে কীভাবে কে জানে। মশারিতে কোনো ফুটা কি আছে? ফুটা তো চোখে পড়ছে না।
পান খাওয়া শেষ হলে বাতি নিভিয়ে ঘুমোতে এসো।
আচ্ছা।
বাড়িওয়ালার টাকাটা তুমি এখনো দিচ্ছ না। উনি আজো এসেছিলেন।
দিয়ে দেব।
কবে দেবে সেটা পরিষ্কার করে বল, আমি সেই ভাবে তাকে বলব। রোজ আসেন, বিশ্ৰী লাগে।
সামনের সপ্তাহে দেব। শনি-রোববারে আসতে বলো।
আচ্ছা।
নাপিতের কাছে আর যাও নি না?
গিয়েছিলাম, এত ভিড়!
রীনা জেগে আছে। বিছানায় শোয়ামাত্র তার ঘুম আসে না। গভীর রাত পর্যন্ত সে জেগে থাকে। আজ তার ঘুম একেবারেই আসবে না। তারেকের মতো একটা মানুষ কী করে জটিল একটা গল্প ফাদল এটা তার মাথাতেই আসছে না। খুব সহজ যে মানুষ, তার ভেতরেও কি জটিল একটা অংশ লুকিয়ে থাকে। ঠিক তেমনি ভয়াবহ জটিল মানুষের একটা অংশে কি থাকে শিশুর সারল্য? পুরোপুরি সহজ কিংবা পুরোপুরি জটিল মানুষ কি এই পৃথিবীতে হয় না?
তারেক বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুম। সুখী মানুষের নিদ্রা। মানুষটা কি সত্যি সুখী ঐ একজন সুখী মানুষকে জটিল মিথ্যা গল্প বানাতে হয় না। জটিল সব গল্প অসুখী মানুষেরা তৈরি করেন।
রীনা সাবধানে খাট থেকে নামল। তার কেমন যেন গা জ্বালা করছে। বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে থাকলে গা জ্বালা ভাবটা হয়তোবা কমবে।
হাসানের ঘরে বাতি জ্বলছে। সে মনে হয় চিঠি লিখছে। ভালবাসার চিঠি। রীনা তার এই জীবনে ভালোবাসার কোনো চিঠি পায় নি। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার কেউ তাকে কখনো বলে নি–আমি তোমাকে ভালোবাসি। তারেকও না। সোজা সরল মানুষরা ন্যাকামি ধরনের কথা বলে না।
সোমবার তিতলীর তিনটা ক্লাস
সোমবার তিতলীর তিনটা ক্লাস। তিনটাই পার পর। ন’টার মধ্যে শুরু হয়ে বারটার মধ্যে সব ক্লাস শেষ। ঝড়-বৃষ্টি-টর্নেডো যাই হোক না সোমবার বারটায় হাসান লালমাটিয়া কলেজের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে। এক জায়গায় থাকে না। একেক দিন একেক জায়গায়। তিতলীর দায়িত্ব হচ্ছে কলেজ থেকে বের হয়ে তাকে খুঁজে বের করা। একদিন সে হাসানকে পেয়েছে নাপিতের দোকানে মাথা মালিশ করাচ্ছে। কুৎসিত দৃশ্য। চোখ বন্ধ করে আয়েশ করে সে বসে আছে। নাপিত শব্দ করে মাথা বানাচ্ছে { তার জীবনে এমন ভীতু কোনো ছেলে দেখে নি। তিতলীর ধারণা, হাসানের তুলনায় তার সাহস অনেক বেশি। যেমন–হাসান কখনো তাকে নিয়ে রিকশায় উঠবে না। কোথাও যেতে হলে বেবিট্যাক্সি নেবে। বেবিট্যাক্সির সিটের দু প্রান্তে দুজন বসে থাকলে নাকি বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না। বেবিট্যাক্সিতে উঠেও শান্তি নেই— হাসান বলবে, তিতলী ওড়নাটা দিয়ে নাক আর মুখ ঢেকে রােখ। নাকমুখ ঢাকা থাকলে মানুষ চেনা যায় না। তোমার পরিচিত কেউ যদি তোমাকে দেখেও ফেলে চিনতে পারবে না।
