দূর দূর–তার জীবন কাহিনী শুনে কী হবে? একটা লোক একগাদা টাকা করেছে বলেই তার জীবন কাহিনী শুনতে হবে?
কমলার মা ট্রে নিয়ে ঢুকল। ট্রেতে দু কাপ চা। রীনা বলল, গল্প করার প্রস্তুতি দেখছি। কমলার মাকে বলেছি–আধঘণ্টা পর পর দু কাপ করে চা দিয়ে যেতে।
হাসান বুলল, তোমার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তুমি আসলে গল্প শুনতে আস নি। কিছু বলতে এসেছ? সেটা কী?
তুমি কি মিসির আলি হয়ে গেছ? ভাবভঙ্গি দেখে মনের কথা বলে ফেলছি। শুনুন মিসির আলি সাহেব–আমি গল্প শুনতেই এসেছি–কিছু বলতে আসি নি।
ভূতের গল্প শুনবে ভাবি?
ভূতের গল্প শোনা যেতে পারে। তবে ঝড়বৃষ্টির রাত ছাড়া ভূতের গল্প জমে না। তুমি জমাতে পারবে তো?
পারব। আমি যে কজনকে এই গল্প বলেছি তারা সবাই সেই রাতে ঘুমোতে পারে নি। গল্পটা ঠিক ভূতেরও না। একটা ফ্যামিলিতে দুটা কিশোরী মেয়ে খুন হয় তার গল্প।
বল শুনি।
দাঁড়াও একটা সিগারেট খেয়ে নি।
হাসান সিগারেট বের করল। রীনা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, গত কয়েকদিন ধরে তোমার ভাই একটা অদ্ভুত ব্যাপার করছে–এর মানেটা কী বল তো।
অদ্ভুত ব্যাপারটা কী?
যেমন ধর–পরশুদিন রাতে ঘুমোতে গেছি। বাতি নিভিয়ে মশারির ভেতর ঢুকতেই সে বলল-লাবণী আমার মনে হয় মশারির ভেতর মশা আছে। বাতি জ্বলিয়ে মশাগুলো মেরে নাও।
হাসান তাকিয়ে আছে। ভাবির গল্প করতে আসার কারণটা এখন তার কাছে পরিষ্কার হয়েছে।
হাসান।
জ্বি ভাবি।
তোমার ভাইয়ের এই অদ্ভুত আচরণের অর্থ কী? মশারির ভেতর শুয়ে শুয়ে সে নিশ্চয়ই লাবণী নামের কোনো মেয়ের কথা ভাবছিল। মাথার মধ্যে সেই নামটা ঘুরছিল। ফস করে মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়েছে।
তুমি কিছু জিজ্ঞেস কর নি?
না। আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই বাতি জ্বলিয়ে মশা মারলাম। তারপর বাথরুমে হাত ধুয়ে ঘুমোতে গেলাম। সারারাত আমার এক ফোঁটা ঘুম হলো না। তোমার ভাই অবশ্যি তার স্বভাবমতো কিছুক্ষণের মধ্যে নাক ডাকিয়ে ভস ভস করে ঘুমোতে শুরু করল।
সামান্য একটা কারণে তোমার সারারাত ঘুম হলো না?
কারণটা তুমি যত সামান্য ভাবিছ তত সামান্য না। আরো একবার এ রকম হয়েছে। আমাকে রীনা ডাকার বদলে লাবণী ডেকেছে।
সেটা কবে?
সপ্তাহখানেক আগে। সকালে নাশতা খেতে বসেছে–হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, লাবণী দেখ তো খবরের কাগজ দিয়ে গেছে কিনা। আমি খবরের কাগজ এনে দিলাম। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে খবরের কাগজ পড়তে লাগল।
আর তুমি চিন্তায় অস্থির হলে? চিন্তায় অস্থির হওয়াটা কি অন্যায়? অবশ্যই অন্যায়। ভাইয়াকে তুমি চেন। চেন না? মানুষকে চেনা কি এতই সহজ? ভাইয়াকে চেনা খুবই সহজ। ভাইয়া হচ্ছে পানির মতো। হাসান তুমি একটা ভুল উপমা দিলে। পানি মোটেই সহজ বস্তু না। পানি অতি জটিল। পানি একমাত্র দ্রব্য যা কঠিন হলে আয়তনে বাড়ে।
পানি আয়তনে বাড়লেও ভাইয়া বাড়ে না। ভাইয়া খুব সাধারণ সহজ সরল একজন মানুষ। লাবণী ফাবনী নিয়ে দুশ্চিন্তা করবে না তো ভাবি।
রীনা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ওদের অফিসে লাবণী নামে একটা মেয়ে আছে। ওদের সঙ্গে কাজ করে। নতুন এসেছে।
হাসান হাসতে হাসতে বলল, ব্যাপারটা তো তাহলে আরো সহজ হয়ে গেল। ভাইয়া মেয়েটাকে চেনে। তার নামটা মনে আছে। সে হয়তো দেখতেও অনেকটা তোমার মতো। থুতু দেখে যক্ষ্মা ভেবে বসবে না ভাবি। মেয়েদের স্বভাব হচ্ছে থুতু দেখলে যক্ষা ভাবে।
আর ছেলেদের স্বভাব।কী? যক্ষ্মা দেখলে থুতু ভাবা?
আমার ভূতের গল্পটা কি তোমাকে এখন বলব?
বল।
তাহলে পা তুলে খাটে হেলান দিয়ে আরাম করে বাস।
বসলাম।
তোমার মুখের চামড়া এখনো শক্ত আছে। রিল্যাক্স করা।
তুমি তোমার গল্প শুরু কর তো।
দাঁড়াও আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে নি।
হাসান তুমি আজকাল বেশি সিগারেট খাচ্ছি। সিগারেটের গন্ধে তোমার ঘরে ঢোকা यां का!
হাসান গল্প শুরু করল। সে লক্ষ করল রীনা মন দিয়ে কিছু শুনছে না। তাকিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু অন্য কিছু ভাবছে। অমনোযোগী শ্রোতাকে দীর্ঘ গল্প শোনানো খুবই কষ্টের ব্যাপার। হাসান বলল, গল্পটা কেমন লাগছে ভাবি?
ভালোই তো।
শেষ করব, না বাকিটা আরেকদিন শুনবে?
কেমন যেন মাথা ধরেছে। বাকিটা আরেক দিন শুনব। তুমি আজ বরং তোমার চিঠি শেষ কর।
ভাবি তোমার কি মন খারাপ?
না মন খারাপ না। কেমন যেন একা একা লাগছে।
ভাইয়া বাসায় নেই??
উহুঁ। নাপিতের কাছে চুল কাটাতে গেছে।
রাত দুপুরে চুল কাটাচ্ছে?
রীনা হালকা গলায় বলল, নাপিতের কথা বলে অন্য কোথাও যেতে পারে। আচ্ছা! হাসান ছেলেরা ঘরের চেয়ে বাইরে থাকতে বেশি পছন্দ করে, কারণটা কী?
জানি না ভাবি।
আমি মনে মনে একটা কারণ খুঁজে বের করেছি। আমার ধারণা, অতি প্রাচীনকালে মানুষ যখন পশু শিকার করে বেঁচে থাকত তখন থেকেই ব্যাপারটা শুরু। পুরুষরা শিকারে বের হতো। মেয়েরা সন্তানের দেখাশোনা করত। ওই যে পুরুষদের বাইরে থাকা অভ্যাস হয়ে গেল–সেই অভ্যাস আর যায় নি।
ভালো বলেছ তো ভাবি!
রীনা উঠে তার ঘরে চলে গেল। হাসান চিন্তিত মুখে বসে রইল। তিতলীর চিঠিটা শুরু করা দরকার। ঘোর কেটে গেছে। লিখতে ইচ্ছে করছে না।
তারেক বাসায় ফিরল রাত এগারটায়। তার হাতে দড়িবাধা মাঝারি সাইজের একটা কাতল মাছ। রীনা বলল, রাতদুপুরে মাছ আনলে কোত্থেকে?
