চিনতে পারলে চিনবে। তোমাকে এত ভাবতে হবে না। তুমি সহজ হয়ে বস তো। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে ‘উইজার্ড অব ওজের’ কাঠের পুতুল।
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি হাসান কখনো তিতলীর হাত ধরে না। বেবিট্যাক্সিতে উঠে হাত ধরার কাজটা তিতলীকে করতে হয়। হাত ধরার পর হাসান বাইরের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন ভেতরে কী হলো সে জানে না।
ছেলেদের এত ভীতু হলে মানায় না। ছেলেরা হবে সাহসী, বেপরোয়া। তাদের দাবি থাকবে অনেক বেশি। মেয়েরা সেই সব দাবি সামলে সুমলে মোটামুটি একটা সাম্যাবস্থায় নিয়ে আসবে। এটাই নিয়ম। যে ছেলের দাবি এক শ তাকে দেবে কুড়ি কিন্তু এমন ভাব করতে হবে যেন সত্তর দেয়া হয়ে গেল। হাসানের বেলায় সব নিয়ম উল্টো। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় তিতলীর অনেক সাহসী দাবি সে সামলে সুমলে চলছে।
ফার্স্ট পিরিয়ড শেষ হবার পর জানা গেল বাকি দুটা ক্লাস হবে না। ক্লাস না হওয়া সবসময়ই আনন্দজনক ব্যাপার। তিতলীর আনন্দ হচ্ছে না। কারণ, তাকে বারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বারটার পর হাসানকে খুঁজে বের করতে হবে। এই দুঘণ্টা সময় কী করা যায়? কলেজ ক্যান্টিনে চা খাওয়া যায়। দশ মিনিট গেল সেখানে—তারপর? লাইব্রেরিতে যাবে? অসম্ভব। লাইব্রেরিতে গেলেই তার মাথা ধরে যায়। সঙ্গে কোনো গল্পের বই নেই। গল্পের বই থাকলে কোনো একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে বসে। গল্পের বই পড়া যেত।
তিতলী ক্যান্টিনের দিকে এগোচ্ছে। ক্যান্টিনে কাউকে পেলে তাকে নিয়ে আড়ঙ-এ চলে যাওয়া যায়। আড়ঙ-এ শাড়ি নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে এক ঘণ্টা কেটে যাবে।
এই তিতলী!
তিতলী তাকাল–নাসরিন হাত ইশারা করে ডাকছে। তার তোকানো এবং হাত ইশারার ভঙ্গি সবই রহস্যময়। নববর্ষে নাসরিন খেতাব পেয়েছে সপিণী। নাসরিন লম্বা ও ছিপছিপে। সপিণী নাম তার জন্যে মানানসই। মাছ, যেমন প্রতিবছর খোলস ছাড়ে নাসরিনও নাকি খোলস ছাড়ে। তবে তার জন্যে এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না। পছন্দের কোনো মানুষ তাকে খোলস ছাড়তে বললেই নাকি সে ছাড়ে।
তিতলী অপ্ৰসন্নমুখে নাসরিনের দিকে এগিয়ে গেল। আশপাশে কেউ নেই। তবু নাসরিন গলা নামিয়ে বলল, তোর কাছে পঞ্চাশটা টাকা আছে? সহজ স্বাভাবিকভাবে সে কোনো কথাই বলতে পারে না। তার সবকিছুতেই খানিকটা রহস্য।
না।
তাহলে ভালো একটা জিনিস মিস করলি। আমার কাছে পাঁচটা ছবি আছে। একেকটা ছবি দেখতে দশ টাকা করে লাগবে।
কী ছবি?
কী ছবি বুঝতে পারছিস না? ওইসব ছবি—হুঁ হুঁ।
ওইসব ছবি দেখার আমার কোনো শখ নেই।
না দেখেই বলে ফেললি? ছবিগুলো সব টিভি স্টারদের। এদের কাণ্ডকারখানা দেখলে মাথায় হাত দিয়ে বসে যাবি।
আমার মাথায় হাত দিয়ে বসার দরকার নেই। তুই ছবি দেখিয়ে টাকা নিচ্ছিস আশ্চর্য তো!
টাকা না নিলে হবে? পাঁচটা ছবি আমাকে কি কেউ মাগনা দিয়েছে। নগদ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। গলাকাটা ছবি না। একজনের মুখ কেটে আকেজনের শরীরে বসানো না। জেনুইন ছবি।
বুঝলি কী করে জেনুইন ছবি?
যে দেখবে সেই বুঝবে জেনুইন ছবি। তুই দশ টাকা দিয়ে একটা ছবি দেখ। তারপর যদি তোর মনে হয় ছবি জেনুইন না, আমি টাকা ফেরত দেব।
কোনো দরকার নেই। ছবি দেখার পর তাদের নাটক দেখব। তখন শরীর ঘিনঘিন করবে।
আচ্ছা যা তোর টাকা লাগবে না। তোকে বিনা টাকায় দেখােব। আমাকে চা আর আলুর চাপ খাওয়া। দারুণ ক্ষিধে লেগেছে।
ক্যান্টিনে এখন ভিড় কম। টিফিন টাইমে বসার জায়গা থাকে না। আজ ফাঁকা ফাঁকা। সর্পিণী তিতলীকে নিয়ে কোণার দিকে একটা টেবিলে চলে গেল। কাধে ঝুলানো ব্যাগ থেকে পাঁচটা ছবি বের করে তিতলীর হাতে দিল। ছবি হাতে নেবার পর তিতলীর সারা শরীর কাপতে লাগল। সে ছবিগুলোর দিকে তাকাতেও পারছে না। আবার চোখ সরিয়েও নিতে পারছে না। নাসরিন পা নাচাতে নাচাতে শিস দিচ্ছে। শিস দেয়া বন্ধ করে সে তিতলীর দিকে একটু ঝুকে এসে বলল, এই জাতীয় ছবি তুই আগে দেখিস নি?
না।
তোর দেখি শরীর কাঁপছে। ফোঁসফোঁসানি শুরু হয়ে গেছে। ছবিগুলো আমার কাছে দিয়ে নরমাল হ।
তিতলী ছবিগুলো দিয়ে দিল-নরম্যাল হওয়া বলতে যা বুঝায় তা হতে পারল না। এখনো তার হাতপা কাঁপছে। নাসরিন বলল, তোকে দেখে আমার ভয় লাগছে তুই বাথরুমে গিয়ে ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে আয়। আমি চায়ের অর্ডার দিচ্ছি। হাতমুখ ধুয়ে এসে চা খা।
আমি চা খাব না। বাসায় চলে যাব।
ন্যাকামি করিস না তো। তোর ন্যাকামি অসহ্য লাগছে। বাসায় চলে যাবে? তোর নায়ক বারটার সময় আসবে তখন কী হবে?
প্লিজ চুপ কর।
ছবিগুলো আরেকবার দেখবি?
না।
আচ্ছা তুই একটা কাজ কর একটা ছবি আমি তোকে দিয়ে দিচ্ছি। তুই নিয়ে যা।
কী আশ্চৰ্য কথা! আমি ছবি নিয়ে কী করব?
তোর নায়ককে দেখাবি। এইসব ছবি দুজনে মিলে দেখার মধ্যে অনেক মজা। পাঁচটার মধ্যে কোনটা নিবি?
কী অদ্ভুত কথা! আমি কোনোটা নেব না। এক কাজ করা পাঁচটাই নিয়ে যা। রাতে দরজা-টরজা বন্ধ করে আরাম করে দেখ। কাল নিয়ে আসিস। ক্যান্টিনে বসে টেনশনে এইসব ছবি দেখে কোনো মজা পাওয়া যায় না।
এই নিয়ে আর কোনো কথা বলবি না তো নাসরিন। আমি তোর কাছে হাতজোড় করছি।
তিতলী উঠে দাঁড়াল। নাসরিন বিস্মিত গলায় বলল, তুই যাচ্ছিস কোথায়? তোর না আমাকে চা আর আলুর চাপ খাওয়ানোর কথা।
