তারেক চলে যাবার পর রীনার নিজেকে খুব একলা মনে হতে লাগল। সবাই কাজকর্ম করছে শুধু তার কিছু করার নেই। টগর-পলাশ তার দাদুভাইয়ের সঙ্গে পড়তে বসেছে। তার শাশুড়ি বসেছেন জায়নামাজে। ন’টার আগে তিনি উঠবেন না।
লায়লা পড়ছে। তার পড়া বাচ্চাদের মতো। শব্দ করে সে পড়া মুখস্থ করে।
হাসান আজ বের হয় নি। ঘরে আছে। তার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করা যায়। রীনার ইচ্ছা করছে না। মাকে চিঠি লিখবো। অনেকদিন মাকে চিঠি লেখা হয় না। রকিবের দেয়া কলামটায় এখনো কিছু লেখা হয় নি। রানার মনে হলো প্রথম চিঠিটা মাকে না লিখে তারেককে লিখলে কেমন হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার সে তার স্বামীকে এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি লেখে নি। চিঠি লেখার প্রয়োজন হয় নি। বিয়ের আগে তাদের পরিচয় ছিল না যে চিঠি লেখালেখি হবে। বিয়ের পর থেকে তো তারা একসঙ্গে আছে। চিঠি লেখার দরকার কী? আজ একটা চিঠি লিখে ফেললে কেমন হয়? রীনা কাগজের খোজে লায়লার ঘরে ঢুকাল। লায়লা সঙ্গে সঙ্গে বই বন্ধ করে হাসিমুখে তাকাল।
এক টুকরা কাগজ দিতে পারবে লায়লা?
হ্যাঁ পারব। ভাবি তোমাকে আজ এমন দুঃখী দুঃখী লাগছে কেন?
দুঃখী দুঃখী লাগছে?
খুব দুঃখী দুঃখী লাগছে। বোস, বল তোমার কী দুঃখ?
আমার কোনো দুঃখ নেই লায়লা।
সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। তোমার মনে কি কোনো দুঃখ আছে?
হুঁ।
কী দুঃখ?
বলা যাবে না, বললে তুমি হাসবে।
মানুষের দুঃখ শুনে আমি হাসব। আমি কি এতই খারাপ?
লায়লা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার দুঃখ খুবই হাস্যকর। আমার সব সময় মনে হয় আমার বিয়েটিয়ে হবে না।
বিয়ে হবে না?
চেহারা ভালো না। রঙেও ময়লা।
তোমার চেহারা ভালো না কে বলল? আর শ্যামলা মেয়েদের বুঝি বিয়ে হয় না? সবচে’ ভালো বিয়ে হয় শ্যামলা মেয়েদের এটা কি তুমি জান?
না জানি না। সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। তোমার বিয়ে নিয়ে তুমি কোনো দুশ্চিন্তা করো না তো লায়লা। যথাসময়ে বিয়ে হবে।
আমার বিয়ে নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। কোনো সম্বন্ধ আসে না। তোমরা তো কখনো কিছু বল না।
তোমার সামনে বলি না। তবে আড়ালে সব সময় বলি। অনেক ছেলে দেখাও হয়েছে।
সত্যি ভাবি?
অবশ্যই সত্যি। দেখি এখন আমাকে একটা কাগজ দাও।
লায়লা কাগজ দিতে দিতে লজ্জিত গলায় বলল, ভাবি নিজের বিয়ে নিয়ে এতগুলো কথা বললাম, আমার এখন খুব লজ্জা লাগছে।
লজ্জার কিছু নেই। তুমি পড়াশোনা কর।
লায়লা সঙ্গে সঙ্গে গুনগুন করতে শুরু করল। লায়লার জন্যে রীনার খুব মায়া লাগছে। তার বিয়ে নিয়ে আসলেই কোনো কথাবার্তা হচ্ছে না। হওয়া উচিত। রীনা নিজের ঘরে ঢুকে চিঠি লিখতে বসল। সে দীর্ঘ সময় নিয়ে তার স্বামীকে ছোট্ট একটা চিঠি লিখল। সে চিঠি পড়ে নিজেই খুব লজ্জা পেল। চিঠিটা ড্রয়ারের অনেক নিচে লুকিয়ে রাখল। আজই চিঠি দিতে হবে এমন না। কোনো এক সময় দিলেই হবে। রীনা বারান্দায় এসে বসল। তার এক ভাবটা কাটছে না।
হাসানের ঘর বন্ধ। সে বিছানায় উপুড় হয়ে চিঠি লিখছে। তিতলীর কাছে চিঠি। তেমন এগোচ্ছে না। ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ এ ছাড়া তিতলীকে তার লেখার কিছু নেই। সে কোনো বড় লেখক বা কবি হলে এই বাক্যটি ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে দীর্ঘচিঠি লিখতে পারত। লেখালেখির হাত তার একবারেই নেই। ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ ছাড়া তিতলীকে তার আর কী লেখার আছে? ‘তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে’–হ্যাঁ এই বাক্যটাও লেখা যায়। তিতলীকে তার সবসময় দেখতে ইচ্ছা করে। বিয়ের পরেও কি এই ইচ্ছাটা থাকবে? নাকি প্রেমে ভাটা পড়বে? দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে চোখমুখ শক্ত করে ঝগড়া করবে? হাসান লিখল,
তিতলী
তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।
হাতের লেখাটা ভালো হলো না। অক্ষরগুলো কেমন জড়িয়ে গেছে। তার হাতের লেখা ভালো না। তিতলীর হাতের লেখা অপূর্ব। গোটা গোটা অক্ষর। জড়ানো না, পেঁচানো না। প্রতিটা অক্ষর আলাদা। প্রতিটি শব্দ হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে।
দরজায় টক টক শব্দ হলো। হাসান ভুরু কুঁচকে তাকাল। যতক্ষণ দরজা খোলা থাকে। কেউ আসে না। দরজা বন্ধ করা মাত্র দরজা ধাক্কাধাকি শুরু হয়। সে কাগজ-কলম নিয়ে বসার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনবার উঠে দরজা খুলতে হয়েছে। এবারেরটা নিয়ে হবে চতুর্থবোর। অথচ মাত্র একটা লাইন লেখা হয়েছে।
কে?
রীনা।
হাসান ধড়মড় করে বিছানা থেকে নামল। রীনা ভাবির কিছু কিছু ব্যাপার আছে বেশ মজার। সবাই ‘কে?’ প্রশ্নের জবাবে বলে আমি। একমাত্র রীনা ভাবিই ‘কে?’-র উত্তরে বলবে—রীনা।
দরজা বন্ধ করে কী করছিলে?
কিছু করছিলাম না। উপুড়পটাং হয়ে পড়েছিলাম
উপুড়পটাং আবার কী?
চিৎপটাং-এর উল্টোটা উপুড়পটাং।
চিঠি লিখছিলে?
হুঁ।
তোমার সেই তিতলী বেগমকে?
হুঁ।
মেয়েটাকে একদিন নিয়ে আসতে পার না?
পারি।
একদিন নিয়ে এসো। জমিয়ে আডডা দেব।
আচ্ছা।
তোমার এই চিঠি কি এক্ষুণি লিখতে হবে, না কিছুক্ষণ পর লিখলেও হবে?
পরে লিখলেও হবে।
আমি আসলে তোমার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। বাচ্চারা পড়ছে। একা একা আমার দেখি কিছু ভালো লাগছে না।
গল্প কর–আমি শুনি।
রীনা খাটের এক মাথায় বসতে বসতে বলল, আমি কোনো গল্প করব না। আমার কাছে গল্প নেই। তুমি সারা শহর ঘুরে বেড়াও তুমি গল্প কর আমি শুনি।
হিশামুদিন সাহেবের গল্প বলব? তাঁর জীবন কাহিনী।
