তারেক বলল, আরে না। প্রায়ই যাব কী! মাঝেমধ্যে যাই। কেয়ার জন্মদিন হলো। জন্মদিনে গোলাম। সেও গতি সপ্তাহে। এই সপ্তাহে এখনো যাই নি।
হাসান বলল, ভাইয়া চল উঠি।
তারেক উঠে দাঁড়াল।
হাসান বলল, ভাইয়া একটা কথার জবাব দাও তো। তুমি কি লাবণী মেয়েটার প্রেমে পড়েছ?
তারেক জবাব দিল না। ভাইয়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকালও না। তবে তার মুখে এক ধরনের শান্তি শান্তি ভাব দেখা গেল। যেন ভাইকে ব্যাপারটা বলতে পেরে সে শান্তি পেয়েছে।
তারেকের অফিসে যাবার পর থেকে রীনার মন উতলা হয়ে ছিল। বাড়িওয়ালার বাসা থেকে সে অফিসে একবার টেলিফোনও করেছিল। তারেকের সঙ্গে কথা হয়েছে তাতেও রানার উতলা ভাব দূর হয় নি। দুপুরে সে তার শাশুড়িকে নিয়ে এল। রীনার শাশুড়ি এতদিন রাগ করে তার বড় মেয়ের বাসায় ছিলেন। কঠিন রাগ অনেক চেষ্টা করেও ভাঙানো যাচ্ছিল না। আজ তারেকের ঘটনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছেন। তিনি বাসায় পা দেয়ামাত্র রানার মনে হয়েছে–আর ভয় নেই। দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
মনোয়ারা তসবি টিপতে টিপতে রীনার কাছে পুরো ঘটনা দু’বার শুনলেন। তারপর গাষ্ঠীর মুখে বললেন, বউমা কোনো চিন্তা করবে না। একটা মুরগি ছদকা দিয়ে দাও। আর শোেন–সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হতে দেবে না। যা কাজকর্ম দিনে করবে। সন্ধ্যার পর সংসার দেখবে। চিরকালের নিয়ম। রীনা বলল, মা আপনি একটু বলে দেবেন।
মনোয়ারা বললেন, আমি তো বলবই। বিয়ের পর মার কথার ধার থাকে না। তার ওপর আমি হলাম পরগাছা মা। ছেলের রক্ত চুষে বেঁচে আছি। আমার কথার দাম কী। তুমি বলবে। শক্ত করে বলবে।
জ্বি আচ্ছা।
বিবাহিত ছেলে সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে থাকবে এটা কেমন কথা!
শাশুড়ির কথা রীনার এত ভালো লাগল। তার মনের সমস্ত চিন্তাভাবনা এক কথায় উড়ে গেল। বিকেলে আরো আনন্দের ব্যাপার হলো। রকিব একগাদা উপহার নিয়ে বাসায় উপস্থিত। পলাশ এবং টগরের জন্যে দুটা ফুটবল। তার জন্যে কালির কলম। লায়লার জন্যে ঘড়ি। রানার কাছ থেকে ধার করা টকাটাও ফেরত দিল। রীনা হতভম্ব গলায় বলল, তুমি এত টাকা পেলে কোথায়?
রকিব বলল, কিছুদিন ধরে একটা ফার্মের সঙ্গে থেকে একটা পার্টটাইম চাকরি করেছি। ওরা থোক কিছু টাকা দিয়েছে।
কত টাকা?
সেটা তোমাকে বলব না। ভাবি শোন আজ রাতে ভালোমন্দ কিছু রান্না কর তো। পোলাও-কোরমা-রোষ্ট। আমি বাজার করে নিয়ে আসছি।
সন্ধ্যা হয়েছে।
বাচ্চারা ফুটবল নিয়ে খেলছে। তাদের চিৎকারে কান পাতা যাচ্ছে না। রকিব গিয়েছে বাজার করতে। তারেক ও হাসান দুজনই ফিরেছে। আশ্চর্য কাণ্ড–তারেক তার জন্য একটা শাড়ি কিনে এনেছে। আহামরি কিছু না-সবুজ জমিন লাল পাড়। তবুও তো সে কিনল। এই প্রথম তারেক তার জন্যে শাড়ি কিনল।
তারেক গভীর গলায় বলল, শাড়িটা পর দেখি।
রীনা লজ্জিত গলায় বলল, হঠাৎ শাড়ি কেন?
আনলাম আর কী? সবুজ রঙ কি তোমার পছন্দ না?
খুব পছন্দ।
রীনার লজ্জা লাগছে। আনন্দও লাগছে। তার চোখ ভিজে উঠছে। সে বুঝতে পারছে। না। এত সুখী আল্লাহ তাকে কেন বানিয়েছেন!
বিবাহিত পুরুষ সন্ধ্যার পর ঘরে থাকবে
বিবাহিত পুরুষ সন্ধ্যার পর ঘরে থাকবে। সন্ধ্যায় সে ঘরে ফিরবে। স্ত্রী-পুত্ৰ-কন্যাদের নিয়ে সময় কাটাবে। মনোয়ারার এই কথাগুলো রীনার খুব মনে ধরলেও সে জানে এটা অসম্ভব একটা ব্যাপার। পুরুষমানুষ মানেই–একটা অংশ ঘরের বাইরে। ভালো না লাগলেও এটা স্বীকার করে নিতে হবে। রীনা স্বীকার করে নিয়েছে।
তারেককে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে জামাকাপড় পরতে দেখেও চুপ করে রইল। তারেক বলল, দেখি একটা চিরুনি দাও তো চুলটা আঁচড়াই। রীনা চিরুনি এনে দিল এবং হঠাৎ লজ্জিত মুখে বলল, মাথাটা নিচু করা–চুল আঁচড়ে দেই। বিয়ের পর অনেক দিন রীনা তারেকের চুল আঁচড়ে দিয়েছে। তারপর এক সময় সংসারে টগর-পলাশ এলোরীনা ব্যস্ত হয়ে পড়ল সংসার নিয়ে। অফিসে যাবার সময় স্বামীর চুল আঁচড়ানো বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হওয়াটা ঠিক হয় নি। তার অবশ্যই উচিত ছিল স্বামীর জন্যে কিছুটা সময় আলাদা করে রাখা; রাখলে তারেকের বাইরে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাসটা নিশ্চয়ই কিছু কমত।
তোমার চুল খুব লম্বা হয়েছে। চুল কাটাও না কেন?
কাটাব।
সন্ধ্যাবেলা যাচ্ছে কোথায়?
তারেক বলল, নাপিতের কাছে যাব। চুল কাটাব। চুল লম্বা হয়ে কানে লাগছে–অসহ্য।
রীনার মনটা খারাপ হয়ে গেল। তারেক মিথ্যা কথা বলছে। সন্ধ্যাবেলা সে নাপিতের কাছে চুল কাটাতে যাচ্ছে না। চুল কাটার প্রসঙ্গ উঠছে বলেই সে ফিট করে বলল। চুল কাটাতে যাচ্ছি। মানুষটা গুছিয়ে মিথ্যা কথাও বলতে পারে না। বেচারা।
তারেক বলল, জুতার ব্রাশটা দাও তো জুতাজোড়া কালি করি।
রীনা নিজেই জুতা কালি করতে বসল। তারেক মোজা পায়ে অপেক্ষা করছে। রানার কেমন যেন মায়া লাগছে। এই মায়ার উৎস সে জানে না। রীনা বলল, সেজোগুজে নাপিতের কাছে চুল কাটাতে যাচ্ছে?
তারেক বলল, সাজের কী দেখলে ঐ জুতা ময়লা হয়েছিল।
ফিরতে দেরি হবে?
দেরি হবে কেন? চুল কাটাতে যতক্ষণ লাগে।
রানার মনে হলো সে শুধু শুধুই সন্দেহ করছিল। বেচারা আসলে চুল কাটাতেই যাচ্ছে। সরল ধরনের মানুষের কর্মকাণ্ডও সরলু প্রকৃতির হয়। নাপিতের দােকানে যে জুতা ব্ৰাশ করে যাবার দরকার নেই তা মনে থাকে না।
