তারেক বলল, কিছু হয় নি। চা খাবি?
চা?
চল নিরিবিলিতে কোথাও বসে চা খাই।
অফিস ছুটির সময় নিরিবিলি কোথায় পাওয়া যাবে? চায়ের দোকানগুলোতে রাজ্যের ভিড়। এর মধ্যেই আকবরিয়া রেস্টুরেন্টের একটা কেবিন হাসান যোগাড় করল। শিক কাবাব তৈরি হচ্ছে, তার ধোঁয়ার সবটাই সরাসরি কেবিনে ঢুকে যাচ্ছে। চোখ জ্বালা করছে।
চায়ের সঙ্গে কিছু খাবে ভাইয়া? শিক কাবাব?
খাওয়া যায়।
শিক কাবাব চলে এসেছে। নোংরা একটা বাটিতে খানিকটা সালাদ। অন্য একটা বাটিতে হলুদ বর্ণের কী একটা তরল পদার্থ। সম্ভবত টক জাতীয় কিছু। তারেক বলল, তুই খাবি না?না। তুমি খাও।
তারেক আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। মনে হয় সে দুপুরে কিছু খায় নি।
চা দিতে বলেছিস?
বলেছি। কাবাব কি তোমাকে আরেকটা দিতে বলব?
বল।
আরেকটা কাবাবের অর্ডার দিয়ে হাসান বসে আছে। সে তার ভাইয়ের ব্যাপার কিছু বুঝতে পারছে না।
হাসান।
বল।
আমি আসলে বিরাট একটা সমস্যায় পড়েছি। কাউকে বলতেও পারছি না।
সমস্যাটা কী? চাকরি সংক্রান্ত কোনো সমস্যা?
না। চাকরি সংক্রান্ত কোনো সমস্যা না। পারসোনাল।
বল আমাকে শুনি।
তোর কাছে সিগারেট আছে? দে তো একটা।
সিগারেট তো তুমি খাও না।
একদম যে খাই না তা না। মাঝেমধ্যে অফিসে এসে একটা-দুটা খুচরা কিনি।
তুমি বস আমি তোমাকে সিগারেট এনে দিচ্ছি। কী সিগারেট খাও।
বাংলা ফাইভ। আর শোন, যাচ্ছিস যখন তখন জর্দা দিয়ে একটা পানও নিয়ে আসিস।
হাসান সিগারেট-পান নিয়ে ফিরল। তারেক আনন্দিত গলায় বলল, এরা চা-টা খুব ভালো বানায়। মনে হয় আফিং টাফিং মেশায়–ভেরি গুড টেষ্ট। এরপর থেকে অফিস ফেরতের সময় এদের এখানে এক কাপ করে চা খেতে হবে।
আরেক কাপ চা দিতে বলব?
বল।
নাও ভাইয়া সিগারেট ধরাও। এই নাও ম্যাচ।
হাসান লক্ষ করল তার ভাইয়া সিগারেট ধরাতে পারছে না। তার হাত কাঁপছে।
ভাইয়া।
হুঁ।
তোমার সমস্যাটা কী বল শুনি।
তেমন কোনো সমস্যা না। আবার তুচ্ছ করাও ঠিক না।
আমি তুচ্ছ করছি না, তুমি বল।
বলছি দাঁড়া সিগারেটে কয়েকটা টান দিয়ে নেই। পান এনেছিস?
এনেছি।
জর্দা দিয়ে এনেছিস তো?
হ্যাঁ জর্দা দিয়েই এনেছি।
এই রেস্টুরেন্টটা মনে হচ্ছে খুব চালু। কাস্টমারে একেবারে গমগম করছে। ভাগ্যিাস আমরা একটা ফাঁকা কেবিন পেয়েছিলাম।
ভাইয়া তোমার সমস্যার কথা বল।
আমাদের অফিসে একজন মহিলা কলিগ আছেন–নাম হচ্ছে গিয়ে লাবণী। বয়স অল্প-কুড়ি-একুশ হবে। গত বছর বি.এ. পাস করেছে পাসকোর্সে।
দেখতে কেমন?
আছে ভালোই। এভারেজ বাঙালি মেয়েরা যেমন থাকে।
আনিমেরিড?
বিয়ে হয়েছিল হাসবেন্ড মারা গেছে। বিয়ে হয়েছিল খুব অল্প বয়সে-ক্লাস নাইনে পড়ার সময় বিয়ে হয়। প্রেমের বিয়ে। হাসবেন্ড মারা যায় বিয়ের দু বছরের মধ্যে। সে আরিচা থেকে ফিরছিল। রাস্তায় একটা কুকুর দাঁড়িয়েছিল। কুকুরকে সাইড দিতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্টটা হয়।
ও আচ্ছা।
লাবণীর একটা মেয়ে আছে। খুবই সুইট চেহারা। মেয়েটার নাম কেয়া। লাবণীর হাসবেন্ডই শখ করে নাম রেখেছিল। কেয়া এখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। কলাবাগানে ওমেন ফেডারেশনের একটা স্কুলে। খুব ভালো ছাত্রী। প্রতি বছর ফার্স্ট হচ্ছে। গান জানে, নাচ জানে, টেলিভিশনে ‘নতুন কুঁড়ি’-তে গিয়েছিল। টিকতে পারে নি। ওইসব জায়গায় সবই তো ধরাধরির ব্যাপার। লাবণীর ধরাধরি করার কেউ নেই।
সমস্যার ব্যাপারটা বল।
না মানে হয়েছে কী, একদিন অফিসে কাজ করছি লাবণী এসে খুব লজ্জিত গলায় বলল, সে ক্যান্টিনে আমাকে এক কাপ চা খাওয়াতে চায়। আমি একটু অবাক হলাম, তবে এর মধ্যে দোষের কিছু দেখলাম না। চা খেতে গেলাম। সেইখানেই লাবণী বলল যে আমার চেহারা স্বভাব চরিত্র সব নাকি তার হাসবেন্ডের মতো।
তাই নাকি?
লাবণী তার হাসবেন্ডের একটা সাদাকালো ছবিও নিয়ে এসেছিল। মিল কিছুটা আছে। তবে সে যতটা বলছে ততটা না। তবে মেয়ে মানুষ তো বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু দেখে।
লাবণী কি তোমাকে প্রায়ই ক্যান্টিনে নিয়ে চা খাওয়াচ্ছে?
আরে না। ও সেই রকম মেয়েই না।
তোমার কামরায় প্রায়ই আসে?
এক অফিসে কাজ করছি। আসবে না? ধর আমি একটা চিঠি টাইপ করতে দিলাম–চিঠি নিয়ে তাকে তো আসতেই হবে।
সমস্যাটা কোথায়?
তারেক বলল, না সমস্যা আবার কী? সমস্যা কিছু না।
তুমি যে বললে তুমি একটা সমস্যায় পড়েছি।
লাবণীকে দেখে খারাপ লাগে–এই আর কী? দুঃখী মেয়ে। একে তো রূপবতী মেয়ে, তার ওপর অল্প বয়স, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিধবা টাইটেল। এই তিন সাইনবোর্ডের মেয়ে আমাদের দেশে টিকতে পারে না। লাবণী থাকে তার বড় বোনের সঙ্গে। বেশ ভালোই ছিল। ইদানীং সমস্যা হচ্ছে। বড় বোনের হাসবেন্ডের ভাবভঙ্গি সুবিধার মনে হচ্ছে না। গত সপ্তাহে ওই হারামজাদা রাত তিনটার সময় লাবণীর দরজায় টোকা দিয়েছে। লাবণী দরজা খুলে হতভম্ব। লাবণী বলল, দুলাভাই কী ব্যাপার? হারামজাদাটা বলে কী–মাথা ধরেছে, তোমার কাছে ঘুমের ট্যাবলেট আছে? লাবণী কি তার ঘরে ফার্মেসি দিয়েছে যে তার কাছে ঘুমের ট্যাবলেট খুঁজতে হবে?
এইসব গল্প কি লাবণী তোমার সঙ্গে করেছে?
হাঁ। দুঃখের কথা ঘনিষ্ঠ দু-এক জনের কাছে বললে মনটা হালকা হয়।
তুমি কি তার ঘনিষ্ঠজন?
তারেক জবাব দিল না। পান মুখে দিল। হাসান বলল, ভাইয়া তুমি কি প্রায়ই লাবণীদের বাসায় যাও?
