তারেক খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নাশতা খেল, অফিসের জন্য তৈরি হতে লাগল। রীনা বলল, হাসান তোমার সঙ্গে যাবে।
আমার সঙ্গে কোথায় যাবে?
মতিঝিলে ওর নাকি কী কাজ আছে। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে সে তার কাজে যাবে। তোমার কোনো আপত্তি নেই তো?
তারেক বিস্মিত হয়ে বলল, কী উদ্ভট কথা আমার আপত্তি থাকবে কেন?
মতিঝিলে হাসানের কোনো কাজ নেই। সে ঠিক করে রেখেছে কাজ না থাকলেও সে আজ মতিঝিলেই ঘোরাফেরা করবে। দুপুরে কোনো সস্তা হোটেলে কিছু খেয়ে নিয়ে বিকেলে ভাইকে নিয়ে একসঙ্গে ফিরবে। ভাবি বেশি রকম চিন্তিত। যদিও সে চিন্তার তেমন কিছু দেখছে না।
হাসান ভাইকে নামিয়ে দিয়ে ঘুরতে বের হলো। বিশাল কর্মকাণ্ডের মতিঝিলের সঙ্গে তার যোগ নেই। আশ্চর্য ব্যাপার। অঞ্চলটা কেমন গমগম করছে। কাজ ছাড়া হাঁটতেও ভালো লাগে। অপরিচিত এক ভদ্রলোক চোখ ইশারায় হাসানকে ডাকল। হাসান এগিয়ে গেল। ভদ্রলোক গলা নিচু করে বললেন, ডলার কিনবেন?
জ্বি না।
ডলার আছে? বিক্রি করবেন?
জ্বি না।
লোকটা উদাস হয়ে গেল। হাসান ভেবে পেল না। তার চেহারায় ডলারের কেনাবেচার কোনো ছাপ কি আছে? ছাপ না থাকলে শুধু শুধু তার সঙ্গে ডলার নিয়ে ভদ্রলোক কথা বলবেন কেন? এরা অভিজ্ঞ ধরনের মানুষ। চোখ দেখে অনেক কিছু বলে ফেলে। এদের তো ভুল করার কথা না।
এক জায়গায় টেবিল-চেয়ার পেতে ফরম বিক্রি হচ্ছে। লোকজন লাইন দিয়ে ফরম কিনছে। হাসান কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেল। আমেরিকা যাবার ইমিগ্রেশন ফরম। দুদিন পর পর আমেরিকানরা একটা তাল বের করে, বাংলাদেশের কিছু লোকজন তাতে মোটামুটি ভালো ব্যবসা করে। ফরম বিক্রি হচ্ছে কুড়ি টাকায়। পুরোপুরি ফিলাপ করলে পঞ্চাশ টাকা।
ফরম যে বিক্রি করছে তার চোখেমুখে খুব সিরিয়াস ভাব। যেন ফরম ফিলাপ করামাত্র আমেরিকান ভিসা সে দিয়ে দেবে। সমানে বেনসন সিগারেট টেনে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ব্যবসা তার ভালোই হচ্ছে।
হাসান লাইনে দাঁড়িয়ে ফরম কিনল। সময় কাটানো দিয়ে হচ্ছে কথা। লম্বা লাইনে দাঁড়ানোয় কিছু সময় কেটে গেল। লাইনে দাঁড়ানো নিয়েও সমস্যা। একজন আগে ঢুকে পড়েছিল তাকে বের করে দেয়া হলো। সে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে শাসাচ্ছে। ভালো যন্ত্রণা।
আরেক জায়গায় বিক্রি হচ্ছে নিউজিল্যান্ড যাবার ফরম। এই ফরমের দামও বেশি। এদের পোজপাজও বেশি। ফরমের দাম দুশ টাকা। দাম বেশি বলেই কোনো লাইন নেই। বেকারদের পকেটে দুশ টাকা থাকে না। যে ফরম বিক্রি করছে তার পেছনে নিউজিল্যান্ডের ছবি। নীল পাহাড়, পাহাড় মনে হচ্ছে লেকের পানি ফুঁড়ে বের হয়ে এসেছে। পালতোলা নৌকায় তরুণ-তরুণী। তরুণী যে পোশাক পরে আছে তাতে তাকে, নগ্নই বলা যায়। যারা নিউজিল্যান্ডের ফরম কিনবে তারা অবশ্যই মেয়েটির কথা মনে রাখবে।
ভাই আপনি কি ফরম কিনবেন?
জ্বি না।
তাহলে শুধু শুধু ভিড় করবেন না।
ভিড় তো করছি না। আপনার এখানে তো লোকই নেই।
হাসান চলে এল। বিমান অফিসের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ঢুকে গোল অফিসে। এখানেও প্রচণ্ড ভিড়। এই ভিড়ের জাত আলাদা। যারা ভিড় করে আছে তাদের চোখ অনেক উজ্জ্বল। সেই চোখে স্বপ্নের ছায়া।
দুপুরে হাসান এক ছাপড়া হোটেলে খেতে গেল। ছাপড়া হোটেল হলেও কায়দাকানুন আছে। মিনারেল ওয়াটারের বোতল আছে। যারা খাচ্ছে তারাও শার্ট-প্যান্ট পরা ভদ্রলোক। হোটেলের মালিককে গিয়ে হাসান জিজ্ঞেস করল–আচ্ছা ভাই সাহেব, বড় বড় হোটেলের উচ্ছিষ্ট খাবার কি আছে? কাস্টমারদের না খাওয়া খাবার জমা করে পরে বিক্রি করে সেই জাতীয় কিছু?
হোটেলের মালিক চোখমুখ কুঁচকে বলল, দুই নম্বরী কোনো কিছু এইখানে পাবেন की।
কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারবেন? একটু খাওয়ার শখ ছিল।
জানি না। আমাদের সব টাটকা ব্যবস্থা। বাসির কারবার নাই। খেতে চাইলে হাত ধুয়ে আসেন।
চারটার পর হাসান তার ভাইয়ের অফিসে উপস্থিত হলো। সে ভেবেছিল তারেক তাকে দেখে খুব বিরক্ত হবে।
তারেক বিরক্ত হলো না, অবাকও হলো না। হাসানই বরং বিব্রত গলায় বলল, মতিঝিলের দিকে এসেছিলাম ভাইয়া, ভাবলাম দেখি তোমার ছুটি হয়েছে কি না। ছুটি হলে একসঙ্গে বাসায় ফিরব।
তারেক বলল, চল যাই। এখন বেবিট্যাক্সি-রিকশা কিছুই পাওয়া যাবে না। হাঁটতে হবে। আমার হাঁটতে ভালোই লাগে। এক্সারসাইজ হয়। ফোর্স সেভিংসের মতো–ফোর্স এক্সারসাইজ।
রাস্তায় নেমে তারেক নিচু গলায় বলল, তোকে একটা কথা বলি তোর ভাবি যেন না জানে। তোর ভাবি জানলে দুশ্চিন্তা করবে।
কথাটা কী?
মাঝে মাঝে আমার মেমোরি লিসের মতো হয়। খুবই অল্প সময়ের জন্যে হয়—কিন্তু হয়।
ব্যাপারটা বুঝলাম না।
এই যেমন ধর অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। হঠাৎ মনে হয় কিছু চিনতে পারছি না। আমি কোথায় যাচ্ছি—বাসা কোথায় কিছুই মনে করতে পারি না। খুব অল্প সময়ের জন্যে হয়–কিন্তু যখন হয় তখন খুব ভয় লাগে।
ভয় লাগারই তো কথা।
একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
চল। আজই চল।
আজ না–যাব একদিন। তোর ভাবিকে কিছু বলিস না–দুশ্চিন্তা করা হলো তার ess
তোমার মেমোরি লিসের ব্যাপারটা শেষ কবে হয়েছে ভাইয়া?
তারেক জবাব দিল না। দাঁড়িয়ে পড়ল। কেমন যেন উসখুসি করছে। চারদিকে তাকাচ্ছে। হাসান শঙ্কিত গলায় বলল, কী হয়েছে?
