রীনা হতভম্ব গলায় বলল, ওর কী হয়েছে?
আমরাও বুঝতে পারছি না। রাস্তার মাঝখানে চুপচাপ বসে ছিলেন। বিড়বিড় করে কী বলছিলেন। তারপর ঠিক মাঝরাস্তায় বসে পড়লেন।
আপনারা এইসব কী বলছেন!
চিন্তা করবেন না। আপা। শুরুতে উনি তার নাম, বাসার ঠিকানা কিছুই বলতে পারছিলেন না। শেষে বলেছেন। উনার কথামতোই আমরা এসেছি। একজন ডাক্তারের কাছেও নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বললেন–কাউন্ড অব নাৰ্ভাস ব্ৰেক ডাউন। ঘুমের ওষুধ দিয়ে দিয়েছেন। রাতে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে বলেছেন।
রীনা অস্পষ্ট গলায় কী একটা বলল। কী বলল সে নিজেও বুঝতে পারল না। তারেক স্পষ্ট গলায় বলল, রীনা বাচ্চারা কি স্কুল থেকে ফিরেছে?
এই হলো ঘটনা।
হাসান পুরো ঘটনা নিঃশব্দে শুনছে। রীনা ঘটনাটা খুব গুছিয়ে বললেও মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে। রানা যতবার কেঁদে উঠছে, লায়লাও তার সঙ্গে কেঁদে
ভাইজান এখন কী করছে?
ঘুমাচ্ছে।
তুমি ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়েছ?
হুঁ।
তোমার সঙ্গে ভাইজানের কোনো কথা হয় নি? তুমি জিজ্ঞেস কর নি ব্যাপার কী?
জিজ্ঞেস করেছিলাম–কিছু বলে না।
রাতে খাওয়াদাওয়া করেছে?
রুটি বানিয়ে দিয়েছিলাম। একটা রুটি খেয়েছে।
তার মানিব্যাগ কি আছে না খোয়া গেছে?
মানিব্যাগ আছে।
যে দুজন ভদ্রলোক নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন—তাদের ঠিকানা কি রেখেছ?
না, ঠিকানা জিজ্ঞেস করার কথা মনেও হয় নি। আমি তাদের থ্যাংকস পর্যন্ত দেই নি। মাথা তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। আমার এখন এত খারাপ লাগছে।
খারাপ লাগার কিছু নেই ভাবি। এই জাতীয় কাজ যারা করে–তারা থ্যাংক-এর আশা করে না।
তোমার কি ধারণা তোমার ভাইজানের মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
ভাইজানের কিছু হয় নি। মানুষের মাথা খুব শক্ত। চট করে খারাপ হয় না। মাথার কোনো সমস্যা হলে বাসার ঠিকানা বলতে পারত না। কাল সকালে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
যদি ঠিক না হয়?
অবশ্যই ঠিক হবে। ভাবি তুমি দয়া করে কাদা বন্ধ করা। ঘুমের ওষুধা তুমিও একটা খাও, খেয়ে ঘুমাতে যাও।
তারেক সারা রাত মরার মতো ঘুমাল। তার পাশে তার গায়ে হাত দিয়ে রীনা বসে রইল। একপলকের জন্যেও চোখ বন্ধ করল না।
সকালবেলা তারেক খুব স্বাভাবিকভাবে বিছানা থেকে নামল। রীনার চোখ তখন ধরে এসেছে। সে খাটে হেলান দিয়েছে, এই অবস্থাতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল। চিন্তিত গলায় বলল, কোথায় যাচ্ছে? তারেক বিস্মিত হয়ে বলল, কোথায় যাই মানে! বাথরুমে যাই–আবার কোথায় যাব?
তোমার শরীরটা কি এখন ভালো লাগছে?
শরীর খারাপ লাগবে কেন?
রাতের প্রসঙ্গ টেনে আনা ঠিক হবে কিনা, রীনা বুঝতে পারছে না। মনে হয় ঠিক হবে না। সে খাটে বসে রইল। তারেকের বাথরুমে ঢোকার শব্দ, কল খোলার শব্দ, দাঁতে ব্ৰাশ ঘষার শব্দ সবই শুনল কান খাড়া করে। শব্দগুলোর ভেতর কি কোনো অস্বাভাবিকতা আছে? ব্রাশ কি অন্যদিনের চেয়ে দ্রুত ঘঁষছে? কলটা বন্ধ করছে না কেন? পানি ছড়ছড় করে পড়েই যাচ্ছে। ব্রাশ ঘষার সময় কলটা বন্ধ করছে না কেন? কলের পানি পড়েই যাচ্ছে। স্বাভাবিক একজন মানুষ তো এই সময় কলটা বন্ধ করবে।
তারেক বাথরুম থেকে বের হয়ে বলল, রীনা চা দিতে বল তো। চা খাব।
এটাও তো অস্বাভাবিক। তারেকের কোনো অস্বাভাবিক চা-প্ৰীতি নেই। বাসিমুখে কখনো চা খেতে চায় না। আজ চাচ্ছে কেন? রীনা চিন্তিত মুখে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো। টগর এবং পলাশ দুজনেরই ঘুম ভেঙেছে। কমলার মা তাদের হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে কলঘরের দিকে। টগর বলল, মা আমি কিন্তু আজ স্কুলে যাব না। পলাশও সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমিও যাব না।
অন্যদিন হলে রীনা কঠিন গলায় বলত, অবশ্যই স্কুলে যাবে। স্কুলে যাব না। এইকথা যেন না শুনি। আজ রানা বলল, আচ্ছা যেতে হবে না।
টগর, এবং পলাশ বিম্বিত হয়ে তাকাচ্ছে। ব্যাপারটা তাদের কাছে এতই অপ্রত্যাশিত যে আনন্দের বিকট চিৎকার দিতেও ভুলে গেছে।
আজ তাদের স্কুলে পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না। স্কুলে নিয়ে যাবার মানুষ নেই। হাসানকে পাঠানো যায়। রীনা তা করতে রাজি না। তারেককে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। সে একা যাবে না, হাসানকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। শ্বশুর-শাশুড়িকেও বাসায় নিয়ে আসতে হবে। মাথার ওপর মুরুকিব কেউ থাকলে ভরসা থাকে। যে-কোনো দুশ্চিন্তার ভাগ মুরুকিবরা নিয়ে দুশ্চিন্তা হালকা করে ফেলেন। কাল তাঁর শাশুড়ি বাসায় থাকলে তিনিও রীনার সঙ্গে সারা রাত জাগতেন।
তারেক চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বলল, তোমার চোখমুখ এমন শুকনো কেনো, কী ব্যাপাৱ?
রীনা বলল, রাতে ঘুম হয় নি।
শোবার আগে আমার মতো গোসল করে শুবে তাহলে দেখবে ভালো ঘুম হবে।
রীনা ইতস্তত করে বলল, কাল রাতে তুমি ফ্রিজের দোকানে গিয়েছিলে?
তারেক বলল, ফ্রিজের দোকানে যাব কেন?
যাবে বলছিলে এই জন্যে জিজ্ঞেস করলাম। তা
রেক চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। রীনা বুঝতে পারছে না, কাল রাতের প্রসঙ্গটা নিয়ে আরো কথা বলাটা ঠিক হবে কিনা। মনে হয় ঠিক হবে না। রীনা বলল, এক কাজ কর, আজ তোমার অফিসে যাবার দরকার নেই।
তারেক বলল, তোমার কথা বুঝতে পারছি না। শুধু শুধু অফিস কামাই করব কেন? খবরের কাগজ এসেছে কি না একটু দেখ তো। হকারটাকে বদলাতে হবে। ঠিক অঠিসে যাবার আগে আগে কাগজ এনে দেয়। অফিসে যেতে হয় কাগজ না পড়ে।
