তারেক বিরক্ত গলায় বলল, এত রাত কোথায় দেখলে রাত মোটে আটটা বাজে।
যাচ্ছ কোথায়?
ফ্রিজ সারাইয়ের দোকানে যাব। ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে। গ্যাস ভরে দেবে।
রাত আটটার সময় যাবার দরকার কী? দিনের বেলা যেও।
তারেক বিরক্ত গলায় বললেন, দিনের বেলা আমার অফিস থাকে। দিনের বেলা যাব কীভাবে?
তাহলে থাক তোমাকে যেতে হবে না। ফ্রিজের দোকানের ঠিকানাটা দিও। হাসান যাবে।
সবকিছু নিয়ে হাসানকে ডাকার আমি কোনো কারণ দেখি না। ওদের সঙ্গে কথা হয়ে আছে—সামান্য ব্যাপার।
তুমি বলছিলে শরীরটা ভালো লাগছে না।
এখন ভালো লাগছে। দেখি এক গ্ৰাস পানি দাও।
রীনা পানি এনে দিল। তারেক সেই পানিতে এক চুমুক মাত্র দিল। তারপর গভীর মুখে বের হয়ে গেল। রীনা খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগল, যদিও অস্বস্তির তেমন কোনো কারণ নেই। রীনা বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক শেষ করে তাদের খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।
বাসায় তার শ্বশুর-শাশুড়ি কেউই নেই। শাশুড়ির রাগ এখনো ভাঙে নি। রীনার শ্বশুর। স্ত্রীর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা হিসেবে গত তিন দিন হলো মেয়ের বাড়িতে আছেন। রীনা লায়লার সঙ্গে গল্প করতে গেল। প্ৰায় এক ঘণ্টার মতো গল্প করল। লায়লার সঙ্গে গল্প করার জন্যে কোনো বিষয়বস্তু লাগে না। যে-কোনো বিষয়ে গল্প শুরু করলে লায়লা কীভাবে কীভাবে সেই গল্প সাজগোজের দিকে নিয়ে আসে। আজ গল্প হলো ইটালিয়ান স্যান্ডেল নিয়ে। ইটালিয়ান ঘাসের স্যান্ডেল লায়লার এক বান্ধবীর বাবা মেয়ের জন্যে নিয়ে এসেছেন। লায়লা সেই স্যান্ডেল পায়ে পরে দেখেছে। তার সমস্ত হৃদয় এখন স্যান্ডেলে। তার কথা শুনে মনে হতে পারে সে তার সমগ্ৰ পৃথিবী একজোড়া ঘাসের স্যান্ডেলের জন্যে দিয়ে দিতে পারে।
বুঝলে ভাবি স্যান্ডেল পায়ে দিয়েছি–মনে হচ্ছে স্যান্ডেল না, পায়ে খানিকটা মাখন মেখেছি। এত সফট আর কেমন ওম ওম ভাব।
ঢাকায় পাওয়া যায় না?
পাগল হয়েছ ভাবি–এইসব জিনিস ঢাকায় কোথায় পাবে!
গুলশানের দোকানে নাকি অনেক বিদেশী স্যান্ডেল পাওয়া যায়।
পাওয়া গেলেও সব সেকেন্ড গ্রেড জিনিস পাওয়া যায়। গরিব দেশে ভালো ভালো জিনিস। এনে লাভ কী? কে কিনবে? স্যান্ডেল জোড়ার দাম কত জান?
ইউএস ডলারে দুশ কুড়ি ডলার। ডিউটি-ফ্রি শপ থেকে কিনেছে বলে সস্তা পড়েছে। সাধারণ শপিং মল থেকে কিনলে–আড়াই শ ডলার মিনিমাম লাগত। আড়াই শ ডলার মুম্বাদশী টাকার দশ হাজার টাকা। দশ হাজার টাকা দামের স্যান্ডেল। চিন্তা করা যায় ভাবি?
চিন্তা করা যায় না। আমি যদি এই স্যান্ডেল পরি তাহলে আমার পায়ে ফোসকা পড়ে যাবে।
আমি একদিন স্যান্ডেলগুলো তোমাকে দেখাবার জন্যে নিয়ে আসব। তুমি পায়ে পরে কিছুক্ষণ হাঁটলে তোমার কাছেই মনে হবে–দশ হাজার টাকা কোনো দামই না।
লায়লা ভাত খেতে গেল এগারটার দিকে। তারেক তখনো আসে নি। লায়লা বলল, ভাইয়া কোথায় গেছে ভাবি?
ফ্রিজ সারাইয়ের দোকানে।
রাতদুপুরে ফ্রিজ সারাইয়ের দোকানে কেন?
কী জানি কেন? চলে আসবে।
আমার তো টেনশন লাগছে ভাবি। ঢাকা শহরের যে অবস্থা। আমার এক বান্ধবীর মামাকে হাইজ্যাকাররা পেটে ছুরি মেরেছে। নাড়ির্ভুড়ি বের হয়ে পড়েছিল। আমি উনাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম।
রানার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল।
ভাবি তুমি টেনশন করছ নাকি?
না।
তোমাকে দেখে মন হচ্ছে টেনশন করছি। প্লিজ টেনশন কোরো না। তোমাকে গল্পটা বলাই ঠিক হয় নি।
রাত এগারটার পর থেকে রীনা বারান্দায় হাঁটাহাটি করতে লাগল। বারান্দা থেকে রাস্তা দেখা যায়। বাসার সামনে রিকশা বা বেবিট্যাক্সি থামলে চোখে পড়ে। ফ্রিজের দোকানে তারেকের এত সময় লাগার কথা না। রাত ন’টার ভেতর দোকান বন্ধ হয়ে যাবার কথা। সে এত দেরি করছে কেন? সত্যি সত্যি হাইজ্যাকারদের হাতে পড়লে ভয়াবহ অবস্থা হবে। ছুরি মেরে ফেলে রাখলেও কেউ আগাবে না। মানুষের বিপদে এখন আর মানুষ এগিয়ে আসে না। এই যুগের নীতি হচ্ছে বিপদগ্ৰস্থ মানুষের কাছে থেকে দূরে চলে যাওয়া। যে যত দূরে যাবে সে তত ভালো থাকবে। টেনশনে রানার বুক ধকধক করা শুরু হলো। তার এই অসুখ ছোটবেলা থেকেই আছে। যত দিন যাচ্ছে অসুখ তাত বাড়ছে। আগে শুধু বুক ধকধক করত। এখন শুধু যে বুক ধকধক করে তাই না–প্ৰচণ্ড ব্যথাও হয়। নিঃশ্বাস আটকে আটকে আসে। খুব শিগগিরই ডাক্তার দেখাতে হবে। ডাক্তারের কাছে যেতেও ভয় লাগে। রীনা নিশ্চিত জানে–ডাক্তারের কাছে যাওয়ামাত্ৰই ডাক্তার ইসিজি ফিসিজি করিয়ে একগাদা খরচ করাবে। তারপর বলবে–আপনার হার্টের অসুখ আছে। একটা আর্টারি ব্লক। এনজিওগ্রাম করাতে হবে। তারচে’ বুকের ব্যথা সহ্য করা ভালো। এই ব্যথা বেশিক্ষণ থাকে না। টেনশন চলে যাওয়া মাত্র ব্যথাও চলে যায়।
ঠিক বারটার সময় বাসার সামনে এসে একটা বেবিট্যাক্সি থামল। হতভম্ব রীনা দেখল দুজন অপরিচিত ভদ্রলোক বেবিট্যাক্সি থেকে ধরাধরি করে তারেককে নামাচ্ছে। তারেক ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না, মনে হচ্ছে মাথা এলিয়ে পড়ে যাচ্ছে। সে কি মদ টদ খেয়ে এসেছে? গল্প-উপন্যাসে এ রকম বর্ণনাই তো থাকে। মাতাল স্বামীকে বন্ধুরা পৌঁছে দিতে আসে। দুদিক থেকে দুজন তাকে ধরে রাখে। রীনা দৌড়ে এসে দরজা খুলল। তারেক এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন রীনাকে চিনতে পারছে না। মোটাসোটা ধরনের অপরিচিত ভদ্রলোক বললেন–আপা উনি কি এখানে থাকেন?
