ড্রাইভার বিরক্ত গলায় বলল, আপনে যাবেন কই?
হাসান বলল, কোথাও যাব না। তোমার যেখানে ইচ্ছা আমাকে নামিয়ে দিতে পার।
আপনার বাসা কোন দিকে?
বাসা অনেক দূর। এতদূর আমাকে নিয়ে যাবার মতো ধৈর্য তোমার নেই–কোনো এক জায়গায় নামিয়ে দাও।
ড্রাইভার রাস্তার পাশে গাড়ি থামাল। হাসান নেমে গেল। ড্রাইভারের সঙ্গে সামান্য রসিকতা করলে কেমন হয়? পকেট থেকে ছেড়া ন্যাতন্যাতে একটা এক টাকার নোট যদি ড্রাইভারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলা হয়–এই নাও বকশিশ। ড্রাইভারের চোখমুখের ভাব কেমন হবে? যত ইন্টারেস্টিংই হোক চোখমুখের ভাব দেখাটা ঠিক হবে না। বেকারদের অনেক কিছু নিষিদ্ধ। সেই অনেক কিছুর একটা হচ্ছে রসিকতা। বেকারদের কিছু ধর্ম আছে। তাদের সেই ধর্ম পালন করতে হয়। হাসানের স্কুল জীবনের বন্ধু জহিরের মতে বেকার ধর্মের চারটি স্তম্ভ
(১) কচ্ছপ বৃত্তি।
সব সময় কচ্ছপের মতো নিজেকে খোলসের ভেতর লুকিয়ে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে মাথা বের করে চারপাশ দেখে আবার টুক করে মাথা ঢুকিয়ে ফেলা।
(২) গণ্ডার বৃত্তি।
চামড়াটাকে গণ্ডারের চামড়ার মতো করে ফেলা। কোনো কিছুই যেন গায়ে না লাগে। গায়ে এসিড ঢেলে দিলেও ক্ষতি হবে না।
(৩) প্যাচা বৃত্তি।
কাজকর্ম সবই রাতে। গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে হবে রাত এগারটা থেকে বারটার দিকে যখন বেশিরভাগ মানুষ শুয়ে পড়ে।
(৪) কাক বৃত্তি।
কাকের মতো যেখানে যা পাওয়া যাবে তাই সোনামুখ করে খুঁটিয়ে খেয়ে ফেলা। কোনো অভিযোগ নেই।
বেকার ধর্মের চারটি স্তম্ভ যে মেনে চলে সে আদর্শ বেকার। তার কোনো সমস্যা নেই। সমস্যাও হবে না। হাসানের নিজের ধারণা সে একজন আদর্শ বেকার। আদর্শ বেকার রাত এগারটার আগে বাসায় ফেরে না। রাত এগারটা পর্যন্ত হাসানের করার কিছু নেই। জহিরের কাছে যাওয়া যায়। জহির থাকে। আগামসি লেনের এক মেসে; রাত বারটার আগে তাকে পাওয়া যাবে না। বারটা পর্যন্ত তার জন্যে অপেক্ষা করা যায়। অনেকদিন জহিরের সঙ্গে দেখা হয় না। জহিরের ‘প্রোজেক্ট বাংলা হোটেলে’ কিছু টাকা দিয়ে আসা যায়। গত কয়েক মাসে কোনো টাকা-পয়সা দেয়া হয় নি।
জহির নানান সময়ে নানান ধরনের স্বপ্ন দেখে। তার বর্তমান স্বপ্ন হলো–সাধারণ ডালভাতের হোটেল দেয়া। বিভূতিভূষণের আদর্শ হিন্দু হোটেলের মতো আদর্শ বাং হোটেল। সে হোটেলে আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, করলা ভাজি, ডালের চচ্চড়ি টাইপ খাবার ছাড়া কোনো খাবার পাওয়া যাবে না। নতুন ধরনের এই হোটেল দেখতে দেখতে জমে যাবে। বন্যার স্রোতের মতো হু-হু করে টাকা আসতে থাকবে।
বুঝলি হাসান ফালতু চাইনিজ খেতে খেতে আমাদের মুখ পচে গেছে। চাইনিজদের মতো নাকিও খানিকটা ডেবে গেছে। আগে বাঙালি জাতির যে খাড়া নাক ছিল এখন নেই। আমাদের নতুন ধরনের খাবার, নতুন ব্যবস্থা–লোকজন পাগলের মতো হয়ে যাবে। ভাত খাবার জন্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।
নতুন ব্যবস্থাটা কী?
পাটি পেতে খাবার ব্যবস্থা। আয়েশি ব্যবস্থা। পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে খাবে।
প্যান্ট পরে তো পাটিতে বসতেই পারবে না।
যারা বসতে পারবে না তারা খাবে না। আমাদের হোটেল এমন হবে যারা আসবে তারা তৈরি হয়েই আসবে।
জহির আদর্শ বাংলা হোটেল ফান্ড খুলেছে। ফান্ড চালু হয়েছে এক বছরের মতো। প্ৰতি মাসেই রোজগারের একটা অংশ হাসানের সেই ফান্ডে দেবার কথা। গত তিন মাস কিছু দেয়া হয় নি। ফান্ডে দেবার মতো রোজগারই হয় না–দেবে কী? আজ কিছু টাকা আছে জহিরকে দিয়ে এলে সে খুশি হবে। হাতে টাকা বেশিদিন থাকবে না। দিতে হলে এখনই দিয়ে আসা দরকার।
জহিরকে পাওয়া না গেলে সে যাবে লিটনের খোজে। লিটন বেচারা খুব খারাপ অবস্থায় আছে। তাকে কিছু টাকা দিয়ে আসবে। সে নিতে চাইবে না। জোর করে দিতে হবে। তার চাকরি হচ্ছে না–ঠিক আছে। কিন্তু জহিরের মতো একটা ভালো ছেলের চাকরি হবে না। এটা খুব কষ্টের।
হাসান আগামসি লেনের দিকে রওনা হলো। জহিরের জন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। হেঁটে হেঁটে যাওয়াই ভালো–সময় কাটবে। স্বাস্থ্যটাও ভালো থাকবে। বেকাররা ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। কারণ তাদের প্রচুর হাঁটতে হয়।
রাত বারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও জহিরের দেখা পাওয়া গেল না। ইদানীং নাকি জহিরের ফেরার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। কয়েক দিন রাত তিনটায় ফিরেছে। এত রাত পর্যন্ত সে বাইরে কী করে তাও কেউ বলতে পারছে না। আর অপেক্ষা করার মানে হয়। না। এত রাতে লিটনের খোজে যাওয়াও অর্থহীন। হাসান রাত একটায় বাড়ি ফিরে এল।
রীনা দরজা খুলে কাদো কাদো গলায় বলল, তুমি কোথায় ছিলে?
রীনার পাশে লায়লা। সেও কাঁদছে। বেশ শব্দ করেই কাঁদছে।
হাসান অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে ভাবি?
তোমার ভাই তো মরতে বসেছিল।
মরতে বসেছিল মানে কী?
রীনা কী হয়েছে বলার আগে বাচ্চা মেয়েদের মতো কেঁদে ফেলল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। হাসান হাত ধরে ভাবিকে চেয়ারে বসাল।
ঘটনা যা ঘটেছে তা ভয়াবহ তো বটেই।
ঘটনাটা এ রকম–তারেক অফিস থেকে ফিরে চা খেল। রীনা একবাটি মুড়ি ভেজে দিয়েছিল। সে মুড়ি খেল না। তার নাকি শরীরটা ভালো লাগছে না। রাত আটটার সময় হঠাৎ দেখা গেল তারেক শার্ট-প্যান্ট পরছে। রীনা অবাক হয়ে বলল, এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?
