হাসান চুপচাপ বসে আছে। ঘরের পরদা সরিয়ে সুমির মাও তাকে এক ঝলক দেখেছেন। তাকে দেখে খুশি হয়েছেন না বিরক্ত হয়েছেন হাসান তা বুঝতে পারে নি। তিনিও কি হাসানের মতো অস্বস্তিতে পড়েছেন? অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা অবশ্যি ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বেশি। তারা যে-কোনো পরিস্থিতি অতি দ্রুত সামাল দিতে পারে। পরম শক্রকেও হাসিমুখে জিজ্ঞেস করতে পারে–তারপর ভাই কী খবর?
সুমির পড়া শেষ হয়েছে। তার টিচার এখন হোমওয়ার্ক দাগিয়ে দিচ্ছেন।
সুমি।
জ্বি স্যার।
আগামীকাল আমার আসতে আধঘণ্টা দেরি হবে।
জ্বি আচ্ছা স্যার।
জ্বি আচ্ছা বললে হবে না, তোমার মাকে বলতে হবে, তিনি যেন আধঘণ্টা পরে গাড়ি পাঠান।
আমি বলব।
নতুন টিচার উঠে দাঁড়ালেন। কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন হাসানের দিকে। সেই দৃষ্টিতে কিঞ্চিৎ সন্দেহ— ‘এ আবার কে?’–টাইপ দৃষ্টি।
হাসান নতুন শিক্ষকের ভাগ্যে সামান্য ঈর্ষা অনুভব করল। ইনাকে গাড়ি দিয়ে আনা-নেয়া করা হয়। হাসানের বেলা কখনো তা করা হয় নি। একবার খুব বৃষ্টি হচ্ছিল–সুমি বলল, ‘মা স্যারকে গাড়ি দিয়ে আসুক’। সুমির মা বলেছিলেন, ড্রাইভার আজ সারাদিন গাড়ি চালিয়েছে। এখন রেস্ট নিচ্ছে। গাড়ি বের করতে বললে রাগ করবে। হাসান ড্রাইভারকে রাগ করতে দেয় নি। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রওনা হয়েছিল।
সুমি পা দোলাতে দোলাতে বলল, স্যার আজ যে আপনি আসবেন তা কিন্তু আমি জানতাম।
হাসান একটু চমকাল। জগতের অনেক বিস্ময়কর রহস্যের মতো একটি রহস্য হলো আট বছরের বালিকা এবং একুশ বছরের তরুণীর কথার ভেতরও মিল আছে। তারা একই ভঙ্গিতে কথা বলে। সুমি সামনের খালি সোফায় বসেছে। পা নাচাচ্ছে। তিতলীও সুমির মতো পা নাচায়। এবং তিতলীও প্রায়ই বলে তুমি যে আজ আসবে তা কিন্তু আমি জানতাম।
আমি যে আজ আসব তুমি জানতে?
জ্বি।
কীভাবে জানতে? শালিক দেখেছিলে?
শালিক দেখি নি। শালিক দেখলে তো কেউ আসে না। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হয়েছে আপনি আসবেন।
হাসান সিরিয়াস শিক্ষকদের মতো ভুরু কুঁচকে ফেলল। মেয়েটি কি সত্যি কথা বলছে? না তাকে খুশি করার জন্যে বাক্য তৈরি করছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। যেদিন যেদিন বাবার চিঠি আসে। আমি আগে আগে বলে দেই। এই জন্যেই না বিশ্বাস করেছে।
তুমি কেমন আছ সুমি?
ভালো আছি। তোমার নতুন স্যার কেমন?
ভালো।
আমার চেয়ে ভালো?
হুঁ।
তোমার ধারণা আমি বেশি ভালো না?
আপনি তো ভালো পড়াতে পারতেন না।
ও আচ্ছা।
আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?
না রাগ করি নি। শোন সুমি আমি তোমার জন্যে একটা বই নিয়ে এসেছি।
ইংরেজি বই?
না, বাংলা। পথের পাঁচালী।
সত্যজিত রায়ের? না। সত্যজিত রায় তো ছবি বানিয়েছিলেন–এটা মূল বই বিভূতিভূষণের লেখা।
বাংলা গল্পের বই পড়তে আমার ভালো লাগে না।
হাসান বইটি বাড়িয়ে দিল। সুমি বইয়ের প্রতি তেমন আগ্রহ দেখাল না। সে পা দোলাচ্ছে এবং হাসানের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে হাসছে।
হাসছ কেন সুমি?
এমনি হাসছি।
তোমার পরীক্ষা কবে?
পরীক্ষা দেরি আছে। আপনি এত রোগা হয়ে গেছেন কেন স্যার?
রোগা হয়ে গেছি নাকি?
হুঁ। আপনার খুব জ্বর হয়েছিল তাই না?
জুর অবশ্যি হয়েছিল। তুমি জানলে কীভাবে?
সুমি জবাব দিল না। আগের মতো রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে লাগল এবং পা দোলাতে লাগল। ট্রেতে করে শিঙাড়া এবং চা নিয়ে সুমির মা ঢুকলেন। এটি একটি বিশেষ ভদ্রতা। অন্য সময় কাজের মেয়ে আসে।
হাসান সাহেব কেমন আছেন?
জ্বি ভালো।
আপনার ছাত্রী আজ সকালেই বলছিল। আপনি আসবেন।
হাসান চুপ করে রইল। সুমির মা বসতে বসতে বললেন, আপনার জন্যে আপনার ছাত্রী খুব ব্যস্ত থাকে। প্রতিদিন সে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আমার সঙ্গে আপনার গল্প করবে।
আমাকে নিয়ে গল্প করার মতো তেমন মালমসলা তো তার কাছে নেই।
গল্প করার জন্যে। ওর কোনো মালমসলা লাগে না। বানিয়ে বানিয়ে সে অনেক কিছু বলতে পারে। আপনার ছবিও সে এঁকেছে। সেগুলো কি দেখেছেন?
জ্বি না।
সুমি স্যারকে তোমার ছবি দেখাও।
না।
না কেন? ছবিগুলো তো সুন্দর হয়েছে। এনে দেখাও।
না।
সুমি পা দোলানো বন্ধ করে উঠে চলে গেল। তার জন্যে আনা বইটিও নিয়ে গেল না। ‘পথের পাঁচালী’ পড়ে রইল অনাদরে। সুমির মা বললেন, আপনার ছাত্রী যে কীসে রাগ করে কীসে রাগ করে না তা বুঝা খুব মুশকিল। এখন রাগ করে উঠে গেল।
রাগ করল কেন?
একমাত্র সেই জানে কেন। হাসান সাহেব চা খান। আপনি এসেছেন আমি খুশি হয়েছি। সামনের মাসে সুমির বাবা আসবেন—তখন আপনাকে খবর দেব। আপনি এসে আমাদের সঙ্গে একবেলা ডালভাত খাবেন।
জ্বি আচ্ছা। আজ উঠি?
একটু বসুন সুমিকে ডেকে নিয়ে আসি। ওকে হ্যালো বলে যান। জানি না সে আসবে কি না।
সুমি এল না। তবে সুমির মা প্ৰথমবারের মতো আর একটা ভদ্রতা করলেন। ড্রাইভারকে বললেন–হাসানকে গাড়িতে পৌঁছে দিতে। ড্রাইভার বিরক্ত হলো–গাড়িতে চড়ার যোগ্য নয় মানুষকে গাড়িতে চড়তে দেবার ব্যাপারে ড্রাইভারদের খুব অনগ্ৰহ থাকে।
বাজছে মাত্র আটটা। এখন বাসায় ফিরে হবে কী? ছাত্র অবস্থায় বাসায় ফেরার একটা তাড়া থাকে। বই নিয়ে বসতে হবে। এখন সেই তাড়া নেই। এম.এ. পরীক্ষাটা দিয়ে দেখলে হয়। সাহসে কুলৈাচ্ছে না। তারপরেও মনে হয় দেয়া উচিত। তখন কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে তাকে বলা যাবে এম.এ. পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষা করছি। কী করেন? ‘আমি কিছু করি না’ বলা খুব কষ্টের।
