রকিব এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট কিনল। চমানবাহার দেয়া মিষ্টি পান কিনল এক খিলি।
তিন লাখ টাকার ভাগাভাগিতে তার অংশে পড়েছে এক লাখ তিরিশ। সে আরো বেশি নিতে পারত, নেয় নি। এক লাখ টাকা আলাদা করে রাখতে হবে। কিছুদিনের জন্যে গা ঢাকা দেয়াও দরকার। পাসপোর্ট করে ইন্ডিয়া ঘুরে এলে হয়। তিন হাজার টাকা ফিস দিলে চব্বিশ ঘণ্টায় পাসপোর্ট হয়। ইন্ডিয়ায় দেখার অনেক কিছু আছে। কোনারকের সূর্যমন্দিরটা নাকি দেখার মতো। কোনারক কোথায় কে জানে? খোঁজ নিতে হবে। পাসপোর্ট করতে ছবি লাগে। ছবিটা আজকে তুলে ফেললে কাল পাসপোর্টের টাকা জমা দেয়া যায়। এত রাতে কি কোনো স্টুডিও খোলা আছে? আছে নিশ্চয়ই। রাত ন’টা এমন কিছু রাত না। রকিব স্টুডিওর খোজে রওনা হলো। আকাশ পরিষ্কার। চাঁদ উঠেছে। সুন্দর জোছনা। জোছনায় হাঁটতে রকিবের বেশ ভালো লাগছে। নতুন প্যাকেট খুলে সিগারেট ধরাল। নতুন প্যাকেটের প্রথম সিগারেটের স্বাদ আলাদা।
ক্ষিধে লেগেছে। প্ৰচণ্ড ক্ষিধের সময় সিগারেট ধরালে ধোয়াটা চট করে মাথায় গিয়ে লাগে। এখনো তাই হচ্ছে। ক্ষিধের দোষ নেই–দুপুরে কিছু খাওয়া হয় নি। শিঙাড়াবাদাম, এখন বাজে রাত সাড়ে ন’টা, ক্ষিধের দোষ কী? কোনো একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকে চাইনিজ ফাইনিজ খেয়ে নিলে হয়। রেস্টুরেন্টে একা খেতে ইচ্ছে করে না। রেক্টরেন্টে একা খেতে যাবার অর্থ–এই মানুষটার সংসার নেই, বন্ধুবান্ধব নেই। বয় বেয়ারার চোখে করুণা চলে আসে। সে করুণার ধার ধারে না।
বাসায় চলে গেলে কেমন হয়। বাসায় সবাই সকাল সকাল খেয়ে ফেলে। ভাত তরকারি কিছুই হয়তো নেই। তাতে কী, রীনা ভাবি চোখের নিমিষে চাল ফুটিয়ে একটা ডিম ভেজে দেবে। ভাপ ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে ডিমভাজা–এই তো যথেষ্ট। রীনা ভাবির কাছ থেকে টাকাটা নেয়া হয়েছিল, টাকাটা ফেরত দেয়া দরকার। টগর এবং পলাশের জন্য কিছু গিফটও কেনা দরকার। খেলনার দোকান কি খোলা আছে? গরমের সময় রাত দশটা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকার কথা। টগর এবং পলাশের পছন্দের খেলনা একটাই’বল’। যখনই জিজ্ঞেস করা হয়–কী খেলনা চাই ওরা বলবে, ‘বল’। সে নিজেই ওদের চার-পাঁচটা ‘বল’ দিয়েছে। ঠিক আছে–পুরনো বলের সঙ্গে যুক্ত হোক আরো দুটা ‘বল’। বলে বলে ধুলপরিমাণ।
রকিব দুটা ‘বল’ কিনল।
দোকানদার বলল, স্যার রঙ পেন্সিল কিনবেন? চাইনিজ পেন্সিলের সেট আছে, দাম খুব সস্তা, আশি টাকা করে।
রকিব দুই সেট পেন্সিলও কিনে ফেলল। সুন্দর সুন্দর কলম বিক্রি হচ্ছে। দেখে মনে হয়। ফাউন্টেন পেন, খুললে দেখা যায় বল পয়েন্ট। কালির কলম বোধহয় পৃথিবী থেকে উঠে যাচ্ছে। একবার রীনা ভাবি বলছিল–কালির কলমে লিখতে তার সবচে’ ভালো লাগে। একটা কালির কলম কিনে ফেললে হয়। রকিব দেখে শুনে কালির কলমও একটা কিনল। দাম বেশি নিল না পাঁচ শ টাকা। নিক রীনা ভাবিকে কখনো কোনো গিফট দেয়া হয় না।
সবার জন্যে একটা করে গিফট কিনলে কেমন হয়? কত আর টাকা লাগবে? দোকানটা ছোট। সবার পছন্দসই জিনিস। এখানে পাওয়া যাবে না। গুলশানের দিকে গেলে হয়। গুলশানের দোকানগুলো জিনিসপত্রে ঠাসা থাকে। লায়লার জন্যে একটা ঘড়ি কিনতে হবে। লায়লার হাতঘড়ি চুরি হয়ে গেছে আর কেনা হয় নি।
রকিব দোকান থেকে বেরোল। তার কেমন যেন মাথা ঘুরছে। শরীর মনে হয় ভেঙে আসছে। সাততলা দালানে দ্রুত উঠে এলে যেমন লাগে তেমন লাগছে, অথচ আজ সে কোনো পরিশ্রমই করে নি। বলতে গেলে সারাদিনই সাখাওয়াতের বোনের বাসায় বসা। রকিব রিকশা নিল। বাসায় যাবার পরিকল্পনা বাদ দিল। তার মুখ দিয়ে নিশ্চয়ই ভক ভক করে গন্ধ বেরোচ্ছে। ভাড়া ঠিক করার সময় রিকশাওয়ালা অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছিল। কথাও বলছিল উঁচু গলায়। মাতালদের সঙ্গে মানুষ সব সময় উঁচু গলায় কথা বলে। সবাই ধরেই নেয় নিচু গলায় কিছু বললে মাতালরা শুনতে পায় না।
সে মাতাল না। তার মাথা ঠিক আছে। খুব ঠিক আছে।
সন্ধ্যা মিলাবার পর
সন্ধ্যা মিলাবার পরপর খানিকটা সময় হাসানের খুব অস্থিরতার মধ্যে কাটে। মনে হয় কিছুই করার নেই। ঘরে মন টেকে না, বাইরেও মন টেকে না। ব্যাপারটা কি শুধু তার একারই হয় না কমবেশি সবার হয়? এই প্রশ্ন মাঝে মাঝে তার মনে এলেও উত্তর জানার সে কোনো চেষ্টা করে নি। এ রকম এক সন্ধ্যায় মনের অস্থির ভােব কাটাবার জন্যে সে সুমিদের বাসায় উপস্থিত হলো। উপস্থিত হয়ে সে খানিকটা লজ্জায় পড়ে গেল। সুমি পড়ছে তার স্যারের কাছে। স্মার্ট ধরনের যুবক। চোখে চশমা। ঠোঁটের ওপর ঘন গোফ। মনে হচ্ছে সিরিয়াস ধরনের শিক্ষক। এরা ছাত্রীর সঙ্গে গল্প করে সময় নষ্ট করে না। পড়া শেষ করে যাবার সময় একগাদা হোমওয়ার্ক দিয়ে যায়। সুমির মা হাসানকে ছাড়িয়ে দিয়ে নতুন এই টিচার রেখেছেন। হাসানের ওপর আস্থা রাখতে পারে নি। ভদ্রমহিলা যদিও তাকে বলেছিলেন মেয়েকে তিনি নিজেই পড়াবেন। হাসান। তাই বিশ্বাস করেছিল।
সুমি হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার আপনি কিন্তু চলে যাবেন না। এক্ষুণি আমার পড়া শেষ হবে।
সুমির এই কথাতেও তার নতুন শিক্ষক ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছে। এটিও সিরিয়াস শিক্ষকের নমুনা। সিরিয়াস শিক্ষক পড়াশোনা ছাড়া যে-কোনো কথায় ভুরু কুঁচকবেন। তিন বছরের মাথায় তার কপালে পার্মানেন্ট ‘ভুরু-কুঁচকা’ দাগ পড়ে যাবে। হাতের রেখা দেখে ভবিষ্যৎ বলার মতো ভুরু-কুঁচকা দাগ দেখে বলে দেয়া যাবে ইনি একজন আদর্শ শিক্ষক।
