সাখাওয়াত হাসিমুখে বলল, আর মুখ ধোয়াধুয়ি। আগে মাল খেয়ে নি।
রকিব বলল, তিন গ্লাসে ঢাল। আমি খাব না।
খাবি না কেন?
তোর কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে? খেতে ইচ্ছা করছে না, খাব না।
শালা তোর বাপ খাবে।
রকিব ক্রুদ্ধচোখে তাকাল। তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেছে। সাখাওয়াত ভীত গলায় বলল, এ রকম করে তাকাচ্ছিস কেন?
রকিব বলল, বাপ তুলে আর যদি কথা বলিস তোর নিজের বমি তোকে চেটে খাইয়ে দেব।
ঠাট্টা করছিলাম রে দোস্ত। থাক তোর খেতে হবে না–তোরটা আমি খাব। এই দেখ খাচ্ছি।
রকিব মুখ ফিরিয়ে সিগারেট টানছে। ঘড়িতে মাত্র ছাঁটা বাজে। ন’টা বাজতে এখনো তিন ঘণ্টা। এই দীর্ঘ সময় শুধু শুধু বসে থাকতে হবে ভাবতেই তার মাথা ধরে যাচ্ছে। তার ওপর সিগারেট শেষ হয়ে গেছে।
ঘরের এক কোণায় বিড়ি ব্যবসায়ী হাজি মুসাদেক পাটোয়ারী বসে আছেন। তার হাত পেছন দিক করে বাধা। তিনি ভয়ে অস্থির হয়ে আছেন। যদিও এখন তার ভয় থাকার কথা না। তার পরিবার থেকে তিন লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। রাত ন’টার সময় তাকে একটা বেবিট্যাক্সিতে তুলে দেয়া হবে। সেই বেবিট্যাক্সি নিয়ে তিনি যেখানে ইচ্ছা! সেখানে যেতে পারেন।
হাজি মুসাদেক পাটোয়ারী বিড়বিড় করে বললেন, বাবা আপনাদের দয়ার কথা কোনোদিন ভুলব না। আমি খাস দিলে আপনাদের জন্য দেয়া করি।
হাজি সাহেব কথাগুলো আন্তরিকভাবেই বললেন। তিনি বেঁচে আছেন এবং তাকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে এই আনন্দেই তিনি অভিভূত।
বাবারা একটা কথা।
মোজাম্মেল কঠিন গলায় বলল, অকারণে কথা বলবেন না। চুপচাপ থাকেন। ন’টা বাজুক ছেড়ে দিব।
বাবারা একটু পিশাব করব।
পিশাব ন’টার পরে করবেন। বাড়িতে গিয়ে আরাম করে পিশাব করবেন। কমোডে বসে করবেন।
জ্বি আচ্ছা।
সাখাওয়াত বলল, হাজি সাহেবকে একটু মাল খাইয়ে দিব? আমি আর খেতে পারছি না।
কেউ কোনো জবাব দিল না। সাখাওয়াত উৎসাহের সঙ্গে বলল, কি হাজি সাহেব, হুইঙ্কি খাবেন?
বাবারা আপনারা বললে অবশ্যই খাব।
সাখাওয়াত আনন্দিত স্বরে বলল, হাজি সাহেব হুইস্কি খেতে চায়।
রকিব বলল, সাখাওয়াত তুই বাড়াবাড়ি করছিস।
সাখাওয়াত সাথে সাথে বলল, ঠাট্টা করছি রে দোস্ত। আমি কি আর সত্যি খাওয়াতাম! তোরা আমাকে ভাবিস কী?
ছড় ছড় শব্দ হচ্ছে।
সবাই হাজি সাহেবের দিকে তাকাল। হাজি সাহেব বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, পিশাব হয়ে গেছে। বাবারা। বয়স হয়েছে, ডায়াবেটিস আছে। বাবারা কিছু মনে করবেন না। আপনাদের দয়ার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। আমি খাস দিলে আপনাদের জন্যে দোয়া করি।
ঘ্যানঘ্যান করবেন না। চুপ থাকেন।
বাবারা একটু পানি খাব।
রকিব বলল, সাখাওয়াত দেখ তো পানি আছে কি না।
সাখাওয়াত অপ্ৰসন্ন মুখে উঠে দাঁড়াল। এটা সাখাওয়াতের বোনের বাড়ি। বোন মিডল ইষ্টে তার স্বামীর কাছে গিয়েছে। বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সাখাওয়াতের কাছে দেয়া। মাঝে মধ্যে সাখাওয়াত বন্ধুদের নিয়ে আসর বসােত। নিরিবিলিতে বাড়ি। রাতভর হইচই করে আডডা দিলেও কেউ কিছু বুঝবে না। দুদিন দু রাত হাজি সাহেবকে এ বাড়িতে রাখা হয়েছে। তাকে ছেড়ে দিলেও তিনি এই বাড়ি চিনে বের করতে পারবে না। তাকে আনা হয়েছে গভীর রাতে–কম্বল দিয়ে মুড়ে। তাকে ছাড়াও হবে এই ভাবে। সাখাওয়াত পানির বোতল এনে দিল। রকিব বলল, গ্লাস দে। হাত বাধা, পানি খাবে কীভাবে? হাতের বাঁধন খুলে দে।
হাজি সাহেব অনবরত নিচু গলায় বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। সাখাওয়াত বলল, বিড়বিড় করে কী বলেন?
বাবারা দুরুদ শরিফ পড়তেছি। আপনাদের ডিসটার্ব হলে পড়ব না।
পাকসাফ হয়ে দুরুদ পড়বেন। পেশাব করে ঘর ভাসিয়ে দুরুদ শরীফ।
বাবারা আমি খুবই শরমিন্দা। আমি পায়ে ধরে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই।
হাজি সাহেব রকিবের পায়ে ধরার জন্যে এগোলেন। রকিব কঠিন গলায় বলল, যেখানে বসে আছেন বসে থাকুন। খবরদার নড়বেন না।
জ্বি আচ্ছা বাবা।
সাখাওয়াত বাঁধন খুলতে পারছে না। সাহায্য করার জন্য বদরুল এগিয়ে গেল। সে বিরক্ত গলায় বলল, হাজি সাহেবর গা তো পুড়ে যাচ্ছে। হাজি সাহেব বললেন, সামান্য জ্বর হয়েছে বাবারা। বাড়িতে গেলে ইনশাল্লাহ আরোগ্য হব।
পুলিশের কাছে বা অন্য কারো কাছে আমাদের নাম বলবেন না তো?
জ্বি না বাবারা। পাক কোরআনের দোহাই, নবীজীর দোহাই, কাউরে কিছু বলব না। কোরআন মজিদ নিয়া আসেন কোরআন মজিদে হাত রেখে প্ৰতিজ্ঞা করব।
রকিব ঘড়ি দেখল। ছটা পয়ত্রিশ। মাত্র পয়ত্ৰিশ মিনিট পার হয়েছে। আরো দুই ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট পার করতে হবে। সর্বনাশ! এত সময় পার করবে। কীভাবে। সাখাওয়াত বলল, দোস্ত সিগারেট দে।
সিগারেট নাই।
সর্বনাশ! সিাগরেট ছাড়া চলবে কীভাবে? প্যাকেট খুলে দেখ না ফাঁকেফুকে থাকতেও পারে।
সাখাওয়াত তুই কথা বেশি বলছিস। চুপ থাক।
তুই ঝিম ধরে বসে আছিস কেন? তোর কী হয়েছে?
চুপ থাক।
শালা তুই চুপ থাক।
রকিব উঠে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড চড় কষাল। সাখাওয়াত উল্টে পড়ল তার নিজের বমিতে।
হাজি সাহেব বিড়বিড় করে আবারো দুরুদ শরীফ পড়ছেন। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। এরা কি তাকে সত্যি ছাড়বে?
রাত ন’টায় হাজি সাহেবকে বেবিট্যাক্সিতে তুলে দেয়া হলো। তিনি বসেছেন মাঝখানে, একপাশে বদরুল অন্য পাশে সাখাওয়াত। বদরুল হাজি সাহেবের মাথা চেপে ধরে আছে। যাতে তিনি কিছু দেখতে না পান। তারা কিছুদূর গিয়ে নেমে পড়বে। হাজি সাহেব এক এক যাবেন। হাজি সাহেব বিড়বিড় করে আবারো বললেন, বাবারা আপনাদের দয়ার কথা কোনোদিন ভুলব না। আমি আপনাদের জন্যে খাস দিলে দোয়া করি।
