অকারণে অজুহাত তৈরি করবে না তো আপা। তুমি যদি এখন আমার সঙ্গে ছাদে যাও তাহলে তোমাকে মন খুশি হয়ে যাবার মতো একটা কথা বলব।
তিতলী বোনের সঙ্গে ছাদে গেল। নিশিরাতের ছাদ গা কেমন জানি ছমছম করে। তিতলী বলল, তুই একা একা ছাদে এসে কী করিস?
কিছু করি না। আকাশের তারা দেখি।
আমাকে কী কথা বলবি বলেছিলি বলে ফেল। কী সে কথা যা শুনলে আমার মন ভালো হয়ে যাবে?
নাদিয়া হাসতে হাসতে বলল, কোনো কথা না আপা। তোমাকে ছাদে আনার জন্যে এটা হলো আমার একটা ট্রিকস। সরি।
ট্রিকস করার দরকার ছিল কি? আমাকে বললেই আমি আসতাম।
না। আসতে না। আচ্ছা। আপা আমার একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। তুমি যদি রাগ না কর তাহলে বলি।
রাগ করব না–বল।
আগে প্ৰতিজ্ঞা করা যে রাগ করবে না।
তোর এইসব প্রতিজ্ঞা ফ্ৰতিজ্ঞা ছেলেমানুষি আমার ভালো লাগে না— বললাম তো রাগ করব না। কথাটা কী?
নাদিয়া মুখ নিচু করে প্রায় ফিসফিস করে বলল, তুমি কি কখনো হাসান ভাইকে চুমু খেয়েছ আপা?
তিতলী স্তম্ভিত হয়ে গেল। নাদিয়ার মতো মেয়ে যে এ রকম অশালীন একটা কথা বলতে পারে তা তার কল্পনাতেও আসে নি। হতভম্ব ভাব সামলিয়ে তিতলী বলল, তুই এসব কী বলছিস! পড়াশোনা করতে করতে তোর মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে।
সরি আপা।
আমি খুব রাগ করেছি। অসম্ভব রাগ করেছি।
তুমি কিন্তু বলেছিলে রাগ করবে না।
আমি তো বুঝতে পারিনি তুই এ ধরনের কথা বলতে পারিস।
আর কোনোদিন বলবো না। আপা। তুমি কি খুব বেশি রাগ করেছ?
হ্যাঁ।
তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নটার জবাব দাও নি।
তারপরেও তুই জবাব চাচ্ছিস?
হ্যাঁ। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। আমি তো কল্পনাও করতে পারি না। আপা একটা মেয়ে কী করে একটা ছেলেকে চুমু খাবে।
তিতলীর ইচ্ছে করছে বোনের গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিতে। সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে কঠিন গলায় বলল, চল নিচে যাই।
আপা তোমার মনটা তো খুব বেশি খারাপ হয়েছে–এখন তোমার মন ভালো করে দিচ্ছি। তোমাকে আমি বলছিলাম না যে তোমার মন খুশি হবার মতো একটা কথা বলব। এটা কোনো ট্রিকস না–সত্যি। কথাটা হচ্ছে কাল তুমি যখন নিউমার্কেটে গিয়েছিলে তখন হাসান ভাই এসেছিলেন।
কখন, সকালে?
হুঁ।
কাল দিন গেল, আজকের দিন গেল তুই বলিস নি কেন?
তোমাকে চমকে দেবার জন্যে জমা করে রেখেছিলাম। হাসান ভাই যখন এলেন তখন বাবা বাসায় ছিলেন না। কাজেই আমি উনাকে যত্ন করে বসালাম। অনেক গল্প করলাম।
কী গল্প করলি?
উনি তো গল্প করতে পারেন না। আমি একাই গল্প করলাম।
তুই গল্প করতে পারিস নাকি?
মাঝে মাঝে আমি খুব মজা করে গল্প করতে পারি। হাসির কথা বলতে পারি। আমি মানুষের গলার স্বরও নকল করতে পারি।
সে কী!
আমি তোমার গলার স্বর নকল করে হাসান ভাইকে শুনিয়ে দিলাম–উনি হোসেছেন।
তোর যে এমন গোপন প্ৰতিভা আছে তা তো জানতাম না।
হাসান ভাই তোমার জন্যে একটা চিঠি আমার কাছে দিয়ে গেছেন। এই নাও চিঠি। খামে বন্ধ চিঠি–এই চিঠি দিতেও তার কী সংকোচ! আমি শেষ পর্যন্ত বললাম, হাসান ভাই ভয় নেই। আমি চিঠি পড়ব না। আমার ওপর রাগ কি তোমার একটু কমেছে আপা? মনে হচ্ছে কমেছে। চল নিচে যাই। তোমার নিশ্চয়ই চিঠি পড়ার জন্যে প্ৰাণ ছটফট করছে।
তিতলী নিজের ঘরে এসে চিঠি খুলল। একটু দূর থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে নাদিয়া বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। দুপাতার চিঠি। পুরো পাতাজুড়ে গুণ চিহ্ন আঁকা। তিতলী লজ্জা পেয়ে হাসল। এই গুণ চিহ্নের মানে শুধু তারা দুজনই জানে।
নাদিয়া বলল, এত লম্বা চিঠি এত তাড়াতাড়ি পড়া শেষ হয়ে গেল?
হুঁ।
এখন কী করবে? বাতি নিভিয়ে দেবে? শুয়ে পড়বে?
হুঁ।
বাতি নিভিয়ে নাদিয়া বোনের সঙ্গে ঘুমোতে এল। বোনের বুকে খানিকক্ষণ মাথা ঘষে আদুরে গলায় বলল, আপা গুণ চিহ্নের মানে কী? চুমু? বলেই নাদিয়া খিলখিল করে হাসল। হাসি থামলে চাপা গলায় বলল-সরি আপা, তোমার চিঠি আমি পড়েছি। লোভ সামলাতে পারি নি। তুমি যদি এখন শাস্তি হিসেবে ধাক্কা দিয়ে আমাকে খাট থেকে ফেলে দিতে চাও ফেলে দিতে পাের। আমি কিছু মনে করব না।
তিতলী বোনকে জড়িয়ে ধরে কাছে টানল।
সন্ধ্যা এখনো হয় নি
সন্ধ্যা এখনো হয় নি। কিন্তু ঘরের ভেতর অন্ধকার। দরজা-জানালা বন্ধ। ভেতরে বাতি জ্বালানো হয় নি। বাতাস ভারি হয়ে আছে। বাতাসে সিগারেটের কটু গন্ধ। সিগারেটের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে বমির গন্ধ। খালি পেটে হুইঙ্কি খাওয়ার ফল ফলেছে–সাখাওয়াত বমি করে ঘর ভাসিয়েছে। সাখাওয়াতের মদ্যপানের অভ্যাস নেই। গত কয়েক দিন খুব খাচ্ছে–আজ বেশি খেয়ে ফেলেছে। বমি করেও তার উৎসাহ কমে নি–হানড্রেড পাইপারের বোতল উঁচু করে বলল, আর মাত্র তিন আঙ্গুল আছে। আয় সবাই এক আঙ্গুল করে খেয়ে বোতল ফেলে দিই।
রকিব জবাব দিল না। সিগারেট ধরাল। তার প্যাকেটের শেষ সিগারেট। ঘরে আর কারো কাছেই সিগারেট নেই। রাত ন’টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কয়েক প্যাকেট সিগারেট এনে রাখা দরকার ছিল। এখন ঘর থেকে বের হয়ে সিগারেট আনা ঠিক হবে না। রাত ন’টায় এক সঙ্গে বের হতে হবে।
সাখাওয়াত চারটা গ্রাসে হুইঙ্কি ঢালছে। মাপমতো ঢালার চেষ্টা করছে। তার হাত কাঁপছে। বদরুল বলল, এই সাখাওয়াত তোর মুখে বমি লেগে আছে। মুখ ধুয়ে আয় না!
