সুরাইয়া বললেন, ওদের আগ্রহ আছে?
আগ্রহ অবশ্যই আছে। তবে ভালো ছেলে একটা হাতে থাকলে যা হয়–দুনিয়ার মেয়ে বাজিয়ে দেখে। তাই করছে–দুনিয়ার মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছে। কোনো মেয়েরই ভালো কিছু চোখে পড়ছে না। শুধু খুঁতগুলো চোখে পড়ছে।
নাদিয়া বলল, ভালো ছেলে আপনি কাকে বলেন ফুফু?
নাফিসা খানম পানের বাটা থেকে পান মুখে দিতে দিতে বললেন, আমার কাছে ভালো ছেলের হিসেব খুব সোজা। ছেলের ঢাকা শহরে নিজের বাড়ি থাকতে হবে। ভালো একটা চাকরি থাকতে হবে। পরিবারের ছোট বা মেজো ছেলে হতে হবে–বড় ছেলের ওপর সংসারের দায়-দায়িত্ব থাকে। বড় ছেলে চলবে না। গায়ের রঙ ফরসা হতে হবে। রঙ ময়লা হলে তার মেয়েগুলোর রং হবে ময়লা–মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে জান বের হয়ে যাবে। লম্বা হতে হবে। বাপ বাটু হলো–ছেলেমেয়ে সব নাটবলুন্টু হয়। তোর বাবাকে ডাক তো তাকে দুটা কথা বলে বিদেয় হব।
মতিন শুকনো মুখে এসে দাঁড়ালেন। নাফিসা খাতুন চায়ের কাপে পানের পিক ফেলতে ফেলতে বললেন, কলিংবেল পাওয়া গেছে?
না। পলিথিনের ব্যাগে করে খাটের নিচে এনে রেখেছিলাম।
ভালো করে ভেবে দেখ। কিনে হয়তো দোকানেই ফেলে এসেছিস।
সেটাও হতে পারে।
কিনেছিস কোথেকে?
নওয়াবপুর থেকে। কাল গিয়ে খোঁজ নিবি। পয়সা দিয়ে জিনিস কিনে দোকানে ফেলে আসা কোনো কাজের কথা না।
জ্বি বুবু।
আচ্ছা এখন যা।
মতিন হাঁপ ছাড়লেন। মনে হচ্ছে ঘাম দিয়ে তার জ্বর ছেড়েছে। নাফিসা বললেনতিতলী কাগজ আর কলম আন।। জিলাপির রেসিপি তোকে লিখে দিয়ে যাই। আমি মুখে মুখে বলি তুই লিখে নে। না নাদিয়া তুই লেখা। তোর হাতের লেখা ভালো।
নাদিয়া জিলাপির রেসিপি লিখছে। আজ তার অনেক সময় নষ্ট হলো। নষ্ট সময়টা কভার করার জন্যে অনেক রাত জগতে হবে।
সুন্দর করে লিখে রাখ উপকরণ–
ময়দা ১ কাপ
চিনি ১ কাপ
গোলাপজল ১ টেবিল চামচ
সয়াবিন তেল ১ কাপ।
ময়দা আধিকাপ পানিতে ভালো করে গুলে দুদিন ঢেকে রাখতে হবে…
রেসিপি দিয়ে নাফিস উঠলেন। সুরাইয়ার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিলেন। সামনের মাসের খরচ চার হাজার টাকা। টাকার খাম সুরাইয়া খুব লজ্জিত মুখে নিলেন। তার লজ অবশ্যি নাফিসা খানমের চোখে পড়ল না। তিনি কলিংবেল লাগানো হয়েছে কিনা দেখতে গেলেন। মিস্ত্ৰি কলিংবেল লাগিয়েছে। নাফিসা খানম দুবার বেল টিপলেন। বেলের আওয়াজে তেমন খুশি হলেন না। ক্যানক্যানে শব্দ। কানে লাগে।
নাদিয়া রাত একটা পর্যন্ত পড়ে। বড় ফুফুর জন্যে দেড় ঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। সেই সময় পুষিয়ে নেবার জন্যে সে আড়াইটা পর্যন্ত পড়ে ঘুমোতে গেল। দুটা খাটের একটাতে সে একা ঘুমোয় অন্যটাতে তিতলী নাতাশাকে নিয়ে শোয়। কেউ সঙ্গে শুলে নাদিয়ার ঘুম আসে না। এটা তার ছেলেবেলার অভ্যাস। একমাত্র ব্যতিক্রম বড় আপা। বড় আপা তার সঙ্গে ঘুমেলে কোনো সমস্যা হয় না। বরং ঘুমের আগে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করতে পেরে ভালো লাগে।
রাত আড়াইটার সময় কারো জেগে থাকার কথা না। নাদিয়া ঘুমোতে এসে দেখে তিতলী জেগে আছে। নাদিয়া বিস্মিত হয়ে বলল, এত রাত পর্যন্ত জেগে আছ কেন?
তিতলী হাই তুলতে তুলতে বলল, তোর জন্যে জেগে আছি। ঘুমের আগে খানিকক্ষণ গল্প না করলে ভালো লাগে না।
আপা থ্যাংক য়্যু।
আজ কী নিয়ে গল্প করবি?
আমি তো আপা গল্প করতে পারি না। তুমি গল্প করবে। আমি শুনব।
কী গল্প শুনতে চাস?
কলেজে কী মজাটজা কর সেই সব বল।
কলেজে কোনো মজাটজা করি না। মজা মজা ভাব করি।—এই পর্যন্তই।
তোমার মজা মজা ভাবের গল্প কর আমি শুনি। আমার নিজের কোনো মজা করতে ইচ্ছে করে না-অন্যের মজা শুনতে খুব ভালো লাগে। হাসান ভাইয়া হঠাৎ হঠাৎ যখন আসে তুমি মুখটুখ লাল করে তার সঙ্গে গল্প কর। আমার কী যে ভালো লাগে! কিন্তু আপা আমি কোনোদিনও এ রকম করতে পারব না। একটা ছেলের সঙ্গে আমি গল্প করছি।—ভাবতেই পারি না।
গল্প করায় সমস্যাটা কী?
কী গল্প করব৷—আমি তোমাকে ভালোবাসি, এইসব বলব। ভাবতেই তো গা শিরশির করছে।
একটা ছেলে আর মেয়ে যখন গল্প করে তখন কেউ কিন্তু বলে না–আমি তোমাকে ভালোবাসি।
বলে না কেন?
ভালোবাসার কথা বলার দরকার হয় না।
হাসান ভাই তোমার সঙ্গে কী নিয়ে গল্প করে?
ও কী গল্প করবে? ও চুপচাপ থাকে।
তুমি এক বকবক করে যাও?
হুঁ।
কী নিয়ে বকবক কর?
ভালো যন্ত্রণা হলো দেখি! আমি কি মুখস্থ করে রেখেছি নাকি?
হাসান ভাইয়ের কোন জিনিসটা তোমার সবচে’ ভালো লাগে আপা?
জানি না। এই নিয়ে ভাবি নি।
একজন ছেলের প্রেমে তুমি হাবুডুবু খাচ্ছ, আর তাকে কী জন্যে ভালোবাস তা জান না?
তুই হঠাৎ এমন বকবক শুরু করলি কেন?
নাদিয়া বলল, আর করব না।
আয় শুয়ে পড়ি।
নাদিয়া লজ্জিত গলায় বলল, ছাদে যাবে আপা?
তিতলী বিস্মিত গলায় বলল, রাত তিনটার সময় ছাদে যাবি মানে? তোর মাথায় আসলে ছিট টিট আছে।
নাদিয়া মাথা নিচু করে হাসছে।
তিতলী চিন্তিত গলায় বলল, শোন নাদিয়া আমার কেন জানি সন্দেহ হচ্ছে তুই রাত দুপুরে এ রকম একা একা ছাদে যাস। যাস নাকি?
নাদিয়া হাসছে। বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসছে।
এ রকম করে হাসছিস কেন?
আমি সহজভাবেই হাসছি তোমার কাছে অদ্ভুত লাগছে। চল না। আপা ছাদে যাই। দশ মিনিটের জন্যে।
বৃষ্টিতে ছাদ পিছল হয়ে আছে।
