দুপুরে খেতে বসে নাদিয়া উৎফুল্ল গলায় বলল, নিশ্চয় আপা রোধেছে। রঙ দেখেই টের পাচ্ছি। আপার রান্না।
তিতলী লজ্জিত গলায় বলল, আহ্লাদী করিস না, খা। তুমি যাই রাধ তাই এমন অপূর্ব কেন হয় বল তো? তুমি একটা রান্নার স্কুল দিও তো। আপা। দেখবে দলে দলে তোমার স্কুলে ছাত্র ভর্তি হবে।
যথেষ্ট হয়েছে।
মোটেই যথেষ্ট হয় নি। আপা তুমি কি জান তুমি খুব অল্প বয়সে বিধবা হবে? সুরাইয়া তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, এটা কী ধরনের কথা? নাদিয়া বলল, আপা ভালো ভালো রান্না করবে। সেই রান্না খেয়ে খেয়ে দুলাভাই ফুলে ফেপে একাকার হবে। কোলেক্টরল হবে, হাই ব্লাডপ্রেসার হবে। তারপরেও খাওয়া ছাড়তে পারবে না। তারপর একদিন হার্ট অ্যাটাক।
সুরাইয়া বললেন, রসিকতা ভালো, এ ধরনের রসিকতা ভালো না। তওবা করি। বল তওবা।
নাদিয়া বলল, তওবা।
সুরাইয়া বললেন, তুই কথাবার্তা আরো সাবধানে বলবি। যা ইচ্ছা বলে ফেলিস।
তিতলী বলল, বক্তৃতা বন্ধ করা তো মা। বেচারি আরাম করে খাচ্ছে খাক।
সন্ধ্যাবেলা তিতলীর ফুফু নাফিসা খানম এলেন। পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি। কাঁধে গোলাপি চাদর। ছোটখাটো মহিলা, সরল ধরনের গোলগাল মুখ, কথা বলেন নিচু গলায়–কিন্তু তাঁর নিচু গলার প্রতিটি শব্দের গুরুত্ব অসীম।
নাফিসা খানম গাড়ি থেকে নেমেই ভুরু কোঁচকালেন। নষ্ট কলিংবেল এখনো বদলানো হয় নি। গত সপ্তাহে তিনি শক খেয়েছিলেন। মতিনকে বলে গেছেন ঠিক করতে। মতিন সেটা করে নি।
তিনি ড্রাইভারকে তৎক্ষণাৎ দোকানে পাঠালেন। ড্রাইভার ডিংডং শব্দ হয় এমন একটা কলিংবেল কিনবে, একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। তিনি থাকতে থাকতেই কলিংবেল ঠিক হবে।
নাফিস খানম কারো বাড়িতেই খালি হাতে যান না। এখানেও এক কেজি জিলাপি নিয়ে এসেছেন। জিলাপি দোকানের কেনা না–তার নিজের বানানো। এক ময়রার কাছ থেকে তিনি মিষ্টি বানানো শিখছেন। জিলাপি ভালো হয়েছে। তবে জিলাপির প্যাঁচ ঠিকমতো হয় নি। আড়াই প্যাঁচ হবার কথা–তার কোনো কোনোটিতে তিন প্যাঁচ হয়েছে কোনোটাতে এক প্যাঁচ।
মতিন এসে বড়বোনকে কদম বুসি করলেন। এটা নতুন না, সব সময় করেন। নাফিসা খানম এত ভক্তিতেও বিচলিত হলেন না। শুকনো গলায় বললেন, কী রে তোকে না বললাম, কলিংবেল ঠিক করাতে। ঠিক করাস নি কেন?
মতিন আমতা আমতা করে বললেন–বেল কিনিয়েছি। বেল, ইলেকট্রিক তার সব কেনা, মিন্ত্রি পাচ্ছি না।
মিস্ত্ৰি পাবি না কেন? মিস্ত্রিরা সব দল বেঁধে গেল। কই?
আমার পরিচিত একজন মিস্ত্ৰি আছে–ও গেছে দেশের বাড়িতে।
পয়সা দিয়ে কাজ করাবি তার আবার পরিচিত-অপরিচিত কী?
কাল-পরশুর মধ্যে লাগিয়ে ফেলব। আপা।
তিতলীকে ওযুর পানি দিতে বল-মাগরেবের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। জিলাপি নিয়ে এসেছি— খা। গরম গরম খা। ঠাণ্ডা হলে ভালো লাগবে না।
নাফিসা খানম ওযু করে নামায পড়তে বসলেন। মতিন সাহেব হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন যে কলিংবেল সমস্যা বেশিদূর গড়ায় নি।
সমস্যার এত সহজ সমাধান অবশ্যি হলো না। নামায শেষ করেই নাফিস খানম বললেন, মতিন তুই তোর কলিংবেল আর তারফার কী কিনেছিস আমাকে দেখা। আমি ড্রাইভারকে কিনতে পাঠিয়েছি যেটা ভালো সেটা লাগাব। বাকিটা তুলে রাখব।
মতিন মুখ শুকনো করে কলিংবেল খুঁজতে গেলেন। যে জিনিস কেনাই হয় নি। সে জিনিস খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মতিন সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গা খুঁজছেন। আর কিছুক্ষণ পর পর বলছেন, আশ্চর্য পলিথিনের একটা কালো ব্যাগে ছিল–খাটের নিচে রেখেছি গোল কোথায়? তাঁর স্বগতোক্তি নাফিসা খানম শুনেও না শোনার ভাব করছেন। এত কিছু শোনার সময়ও তাঁর নেই। তিনি এসেছেন জরুরি কাজে-তিতলীর বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্যে। ওই পাটি গা এলিয়ে দিয়েছিলো ফাইনাল কথা বলবে বলে ডেট দিয়ে আসে। নি। এখন আবার খানিকটা উৎসাহ দেখাচ্ছে। নতুন পরিস্থিতিতে স্ট্র্যাটেজি নিয়ে তিনি আলাপ করতে এসেছেন। আলাপ তিনি করছেন সুরাইয়ার সঙ্গে তবে তিনি চাচ্ছেন মেয়েরাও ব্যাপারটা শুনুক। মতামত দেবে না, শুধু শুনে যাবে। বিয়েটিয়ে বিষয়ক গল্প শুনতে নাদিয়ার একেবারেই ভালো লাগে না–তারপরেও তাকে গভীর আগ্রহ নিয়ে জন্ম হচ্ছে। ফু যতক্ষণ থাকবেন ততক্ষণ সবাই তাকে ঘিরে থাকবে এটাই অলিখিত নিয়ম।
নাফিস খাটে পা উঠিয়ে বসে আছেন। তার দুপাশে নদিয়া এবং তিতলী। নাতাশা ঠিক তার পেছনে হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাতাশার দায়িত্ব হচ্ছে ফুফুর চুল টেনে দেয়া। এই কাজটা নাকি নাতাশা খুব ভালো পারে।
ঘটনা। কী হলো শোন। রাত আটটা বাজে। তিতলীর ফুফার কাছে গেষ্ট এসেছে। আমি গেস্টদের চা আর নুডুলাস দিয়ে শোবার ঘরে এসেছি। খুবই মাথা ধরেছে। কাজের মেয়েটাকে বললাম চুল টেনে দিতে। সে চুল টানছে তখন টেলিফোন এল। খুবই নরম গলা–আপা কেমন আছেন? শরীর ভালো? এইসব ন্যাকামি টাইপ কথা। আমি গলা শুনেই বুঝেছি–কে। তারপরেও বললাম, চিনতে পারছি না তো কে বলছেন? বলল— আমি বুলা। আমি বললাম, ও আচ্ছা। বুলা হচ্ছে ছেলের মামি। পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে তো চর্বির ভাঁজে ভজে দুষ্টবুদ্ধি। আমাদের মতো সোজা সরল না। আমি বললাম কী ব্যাপার হঠাৎ টেলিফোন? সে বলে কী–আপা আপনার সঙ্গে একটু যে বসতে হয়। সোমবারে কি আপনার সময় হবে? আমি ঘললাম, না। এই সপ্তাহটা খুব ব্যস্ত থাকব। কোনোরকম আগ্ৰহ দেখলাম না। ভাবটা এ রকম করলাম যে আমার কোনো গরজ নেই। গরজ দেখালেই এরা মাথায় উঠে যায়। শুরুতে বেশি গরজ দেখানোর জন্যে। ওরা ঠাণ্ডা মেরে গিয়েছিল। যেই গরজ দেখানো বন্ধ ওমনি খোঁজ পড়েছে।
