খানিকক্ষণ বিরক্ত করি?
কর। কিন্তু আপা বেশিক্ষণ না।
দিনরাত যে এত পড়িস তোর ভালো লাগে?
হুঁ।
যে হারে পড়াশোনা করিসি সব বই তো তোর মুখস্থ হয়ে যাবার কথা।
নাদিয়া লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল, সব বই তো আমার মুখস্থই।
মুখস্থ! তাহলে আর পড়ার দরকার কী?
না পড়লে ভুলে যাব না?’
ভুলে গেলে ভুলে যাবি। সামান্য এস.এস.সি. পরীক্ষার জন্যে জীবনটা নষ্ট করে ফেলবি। তোকে দেখে মনে হয় তুই মানুষ না–একটা যন্ত্র।
নাদিয়া বলল, আপা তুমি অনেকক্ষণ বিরক্ত করে ফেলেছ। এখন যাও। তোমাকে আর সময় দেয়া যাবে না।
আসল কথা যা বলতে এসেছিলাম সেটা বলা হয় নি।
আসল কথা কী? মা সকালে নাশতা নিয়ে এসে দেখে তুই বই পড়তে পড়তে काछिन। दो श्शरछ?
কিছু হয় নি।
আমাকে বলতে কোনো অসুবিধা আছে?
না খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। আপা। এই জন্যে বলতে ইচ্ছে করছে না।
কাউকে কিছু বলবি না–আবার ফিঁচ, ফিঁচ করে কাঁদবি এটা কেমন কথা?
আর কাঁদব না।
আমরা তিন বোনের কেউ কাঁদলে মা মনে খুব কষ্ট পায়। কী জন্যে কাঁদছিস এ জন্যেই মাকে সেটা জানানো দরকার।
মাকে কিছু জানাতে হবে না। আপা–তোমাকে বলছি তুমি শুনে রাখ। ফুফুর বাসায় যে গিয়েছিলাম সেখানে জামান ভাইয়া আমাকে একটা চিঠি দিয়েছে। কুৎসিত একটা চিঠি। কেউ যে কাউকে এমন কুৎসিত চিঠি দিতে পারে তাই আমি জানতাম না।
কী লেখা চিঠিতে?
কী লেখা তোমাকে আমি বলতে পারব না।
চিঠিটা কি ফেলে দিয়েছিস?
না ফেলি নি রেখে দিয়েছি, কিন্তু তোমাকে চিঠিটা আমি কোনোদিন দেখাব না। দেখতে চেও না। চিঠিটা পড়লে তোমার শরীর অশুচি হয়ে যাবে। আপা এখন তুমি যাও।
তিতলী উঠে দাড়তে দাঁড়াতে বলল, চিঠিতে কি ভালোবাসার কথা লেখা?
নাদিয়া চাপা গলায় বলল, ভালোবাসার কথা লেখা থাকলে আমি রাগ করব কেন? ভালোবাসা টাসা না। আপা অতি কুৎসিত কিছু কথা। আপা শোন মাকে কিছু বলার দরকার নেই।
ফুফুকে কি ঘটনাটা বলব?
না ফুফু, উল্টা আমার ওপর রাগ করবে। কোনো মার কাছেই নিজের ছেলের দোষ ধরা পড়ে না। তাছাড়া এইসব ঘটনায় সবার আগে দোষী ভাবা হয় মেয়েটাকে। ফুফু, কী বলবে জান? ফুফু বলবে বাংলাদেশে তো মেয়ের অভাব ছিল না। এত মেয়ে থাকতে জামান তোকে কেন এই চিঠি লিখলি? এই রহস্যটার মানে কী? তুই নিশ্চয়ই এমন কিছু করেছিস যে তোকে এ ধরনের চিঠি লেখার সাহস পেয়েছে।
তিতলী বলল, ফুফুন এ রকম বলবে ঠিকই। তুই তো বেশ গুছিয়ে চিন্তা করা শিখে গেছিস।
আমি মোটেও গুছিয়ে চিন্তা করি না। আপা। যা মনে আসে বলে ফেলি। পড়তে পড়তেই সময় পাই না–এত চিন্তা করব কীভাবে।
নাদিয়া হাসল। এত সুন্দর করে হাসল যে তিতলীর তৎক্ষণাৎ ইচ্ছা করল বোনকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকতে। সেটা করতে গেলে নাদিয়া বিরক্ত হবে। আচ্ছা! নাদিয়া কি জানে যত দিন যাচ্ছে সে তত সুন্দর হচ্ছে! না, তা সে জানে না। আয়নায় সে। মনে হয় নিজেকে দেখেও না। তার সমস্ত জগৎ পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ। তিতলীর ধারণা সে যদি প্রেমে পড়ে তাহলে কোনো মানুষের প্রেমে পড়বে না, কোনো একটা পাঠ্যবইয়ের প্রেমে পড়বে। তিতলী উঠে পড়ল।
মতিন সাহেব গোশত বা সিরকা কোনোটাই আনেন নি। গোশত প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, গোশত শরীরের জন্যে অত্যন্ত ক্ষতিকর। সবচে’ খারাপ ধরনের প্রোটিন হলো এনিমেল প্রোটিন। সপ্তাহে একদিনের বেশি গোশত খাওয়া ঠিক না। এই সপ্তাহে এর মধ্যে দুদিন হয়ে গেছে–আর না। সিরকার প্রসঙ্গে বলেছেন-সিরাকাটা কোন কাজে লাগে? বাড়িটা তো কাবাব হাউস না যে সিরকা লাগবে, সয়াসস লাগবে।
সুরাইয়া স্বামীর সঙ্গে যুক্তিতর্কে যান নি। চুপ করে গেছেন। তাঁর মন একটু খারাপ হয়েছে। মেয়েটা শখ করে একটা জিনিস চেয়েছে।
মতিন সাহেব তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে রাগোরাগিও করেছেন। তিতলীর কলেজ বাদ দেয়া প্রসঙ্গে রাগারগি।
সকাল থেকে তো রিকশা ভাড়া রিকশা ভাড়া করে আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল দরজা ভেঙে বাথরুমে ঢুকে পড়বে। যখন ভাড়া দিলাম তখন আর কোথাও যায় না। এর মানে কী? আব্দর দিয়ে দিয়ে সব ক’টা মেয়ের মাথা যে তুমি খেয়েছ সেটা কি তুমি জান? মেয়েরা কিছু বললে তোমার ইশ থাকে না। মেয়েদের কেউ মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের করলে ওইটা নিয়েই থাক। মুখ দিয়ে সিরকা’ শব্দটা বের করেছে, তুমিও তসবি জপা শুরু করলে, সিরকা সিরকা।’ আদার এবং প্রশ্ৰয় কম দেবে। এর ফল আখেরে শুভ হবে।
মতিন সাহেব বাজার এনে দিয়ে কাগজ-কলম নিয়ে বসেছেন। তিতলীর কলেজের নোটিশ বোর্ডে ঝোলানোর জন্যে একটা বিজ্ঞাপন। তিনি নিজেই লিখবেন। কাল কলেজে যাবার সময় মেয়ের হাতে ধরিয়ে দেবেন। মেয়ে নিজের আগ্রহে এই কাজ করবে না। তেমন শিক্ষা তারা মার কাছ থেকে পায় নি। তাদের মা তাদের শুধু আদরই দিয়েছেশিক্ষা দেয় নি। মতিন সাহেব অনেক চিন্তা ভাবনা এবং পরিশ্রম করে জিনিসটা দাঁড় করলেন।
সহযাত্রীর জন্যে বিজ্ঞপ্তি
আমার বাসা কলাবাগানের অভ্যন্ততে। দেশের বর্তমান অশান্ত পরিবেশে রিকশাযোগে একা একা কলেজে অ্যাসবার সময় কিঞ্চিৎ ভীত থাকি। এমতাবস্থায় সহপাঠী বন্ধুদের জানাচ্ছি। তাহদের কেহ যদি কলাবাগান এলাকায় থাকেন এবং আমার সঙ্গে একত্রে রিকশায় আসা-যাওয়া করতে রাজি থাকেন তাহা হইলে আমার জন্যে অত্যন্ত শুভ হয়। রিকশা ভাড়া বাবদ যে অৰ্থ ব্যয় হয় তা সমান সমান ভাগাভাগি করা হইবে। ফলশ্রুতিতে অভিভাবকেরও অর্থনৈতিক সাশ্রয় হইবে।
যোগাযোগের ঠিকানা–
তিতলী বেগম
১২/১০ কলাবাগান। হলুদ কাঠের গেটওয়ালা বাড়ি।
