বাবার সঙ্গে সহজভাবে কথা বলার সম্পর্ক তার না। তিতলী চাপা নিঃশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে রইল। মতিন সাহেব তাঁর শোবার ঘরের দিকে রওনা হলেন। টেবিলের ড্রয়ার থেকে মানিব্যাগ বের করবেন। তিতলীর প্রতীক্ষার অবসান হবে। তিতলী বাবার পেছনে পেছনে গেল। মতিন সাহেব ড্রয়ারের দিকে গেলেন না। খাটের ওপর বসতে বসতে বললেন, আজকের কাগজটা দিয়ে যা। আর তোর মাকে বল এক কাপ চা দিতে। চিনি দিয়ে যেন আবার শরবত না বানায়। এক কাপে এক পোয়া চিনি না দিয়ে তো সে আবার চা বানাতে পারে না।
আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে বাবা।
খবরের কাগজটা দিতে আর তোর মাকে চায়ের কথা বলতে কতক্ষণ লাগবে? কথা বলে তুই যে সময়টা নষ্ট করছিস তারচে’ কম সময়ে কাগজটা দিয়ে যেতে পারতি। মাকেও খবর দিতে পারতি।
তিতলী কাগজ এনে বাবার হাতে দিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। সুরাইয়া মেয়েকে দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, কী রে এখনো কলেজে যাস নি?
তিতলী বলল, বাবাকে এক কাপ চা দাও। আর আমাকেও এক কাপ চা দাও। আজ কলেজে যাব না।
যাবি না কেন?
যেতে ইচ্ছা করছে না।
সুরাইয়া কলেজ প্রসঙ্গে আর কিছু বললেন না। মনে হলো মেয়ে কলেজে না যাওয়ায় তিনি খুশিই হয়েছেন। তিতলী যেদিন কলেজে না যায় সেদিন মাকে নানান কাজে সাহায্য করে। দুপুরে রান্নার সময় বলে–মা তুমি একটা মোড়া এনে মোড়ায় চুপচাপ বসে থাক আমি তোমার রান্না করে দিচ্ছি। রোজ রোজ রান্না করতে তোমার নিশ্চয়ই বিরক্তি লাগে। আজ সব রান্না আমি রাধব তুমি শুধু বাবার ভাত রাঁধবে।
তিতলীর হাতে কোনো মন্ত্রটন্ত্র আছে–যাই রাধে খেতে ভালো হয়।
কলেজে যাবি না কেন?
বললাম তো ইচ্ছা করছে না।
অসুবিধা হবে না?
কোনো অসুবিধা হবে না। কলেজে পড়াশোনা কিছু হয় না মা। টিচাররাও আসেন না। যারা আসেন হড়বড় করে দু-এক কথা বলে যান। তারা কী বলেন–আমরা কেউ শুনিও না। আমরা নিজেদের মতো ফিসফিস করে গল্প করি। কাটাকুটি খেলা খেলি।
বলিস কী!
সত্যি কথা বললাম মা। আমরা কলেজে যাই গল্পগুজব হইচই করার জন্যে। পড়াশোনা যাদের করার তারা ঘরে বসে করে।
কলেজে তাহলে খুব খারাপ অবস্থা?
খারাপ হবে কেন ভালো অবস্থা।
সুরাইয়া চায়ের কাপে চা ঢাললেন। তিতলী কাপ হাতে বাবার ঘরের দিকে রওয়ানা হলো। চট করে বাবার কাপে একটা চুমুক দিয়ে দেখে নিল চিনি ঠিক আছে কি না। কাজটা ঠিক হলো না। চা এঁটো করে দেয়া হলো। তবে বাবা-মার চা এঁটো করা যায়।
মতিন সাহেব চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললেন, টেবিলের ওপর পেপারওয়েটে টাকা চাপা দেয়া আছে নিয়ে যা।
তিতলী টাকাটা নিল।
মতিন সাহেব বললেন, এদিক থেকে লালমাটিয়া কলেজে কোনো মেয়ে পড়ে না? তাহলে দুজনে শেয়ার করে যেতে পারতিস। খরচও বঁচিত। দুজন একসঙ্গে যাবার একটা সিকিউরিটিও আছে। কলেজের নোটিশ বোর্ডে একটা নোটিশ দিয়ে দিবি।
তিতলী অবাক হয়ে বলল, কী নোটিশ দেব?
সহযাত্রী চেয়ে বিজ্ঞপ্তি।
তিতলী বলল, আচ্ছা। টাকাটা যে সেভ হচ্ছে সেটা বড় কিছু না–সিকিউরিটিটা আসল। দিনকাল খুবই খারাপ। চারিদিকে সিকিউরিটি প্রবলেম।
তিতলী বাবার সামনে থেকে চলে গেল। বাবার বক্তৃতা মার্কা কথা শুনতে অসহ্য লাগছে। এরচে’ মার সঙ্গে গল্প করার অন্য আনন্দ। মা যত না গল্প করবেন তারচে’ বেশি গল্প শুনতে চাইবেন। সামান্য গল্পও মা মুগ্ধ হয়ে শোনেন। এই ধরনের মানুষকে গল্প শুনিয়ে খুব আনন্দ।
সুরাইয়া মেয়ের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে বললেন, নাদিয়ার কি হয়েছে তুই জানিস?
তিতলী বিস্মিত হয়ে বলল, না তো। ওর আবার কী হবে! সুরাইয়া বললেন, আমি নাশতা খাবার জন্যে ডাকতে গেলাম দেখি বই পড়ছে ঠিকই কিন্তু চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে–কিছু বলে না।
আমি জেনে আসছি কী ব্যাপার। মা শোন আজ দুপুরে আমি রাধব। কী রাধবি? ঘরে তো বাজারই নেই। বাবা বাজারে যাবে না? বাবাকে দিয়ে এক কেজি ভালো গরুর গোশত আনিয়ে দাও তো মা। আমি কাটা পেঁয়াজ দিয়ে একটা গোশত রান্না করব। প্রমীদের বাড়িতে একদিন খেয়েছিলাম। খেতে খুব ভালো। আমি প্রমীর আম্মার কাছে সব জেনে এসেছি। ঘরে কি সিরকা আছে মা? সিরকা লাগবে। সিরকা ছাড়া হবে না।
ঘরে তো সিরকা নেই।
সিরকা আনিয়ে দাও না মা। রান্নাটা একবার রাঁধতে না পারলে ভুলে যাব। একবার রাঁধলে আর ভুলব না।
সিরকা টিরকার কথা বললে তোর বাবা আবার রেগে যায় কি না কে জানে।
এটা আবার কী ধরনের কথা মা? বাবাকে তুমি ভয় পাও কেন? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হবে বন্ধুর মতো। তোমাদের এ রকম কেন? তোমাদের দেখে মনে হয় একজন গুরুমশাই আরেকজন প্ৰাইমারি ক্লাসের ছাত্রী।
তিতলী উঠে দাঁড়াল। তার চা শেষ হয় নি। খেতে ভালো লাগছে না। তিতলী জানে তার মা তার চায়ের কাপের চাটুকু এক সময় চুমুক দিয়ে খাবেন। তিনি অপচয় সহ্য করতে পারেন না।
নাদিয়া নিঃশব্দে পড়ছে। তিতলী ঘরে ঢুকতেই সে বই থেকে মাথা না সরিয়ে বলল, কলেজে যাও নি। আপা?
তিতলী বলল, আজ কলেজে যাব না। আজ আমার ছুটি।
নাদিয়া বই থেকে মুখ ঘুরিয়ে বড় বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার হাসিই বলে দিচ্ছে বড়। আপার কলেজে না যাওয়ার সংবাদে সে খুব আনন্দিত। যদিও তার আনন্দিত হবার কিছু নেই–সে বই রেখে আপার সঙ্গে গল্প করতে বসবে না। বিকেলে একবার কিছুক্ষণের জন্যে উঠবে। ছাদে হাঁটতে যাবে, তাও একা একা। ছাদ থেকে নেমে আবারো বই নিয়ে বসবে।
